এবার যে চওড়া ঘরে ঢুকলুম, সেই ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠতে হল। একটা অক্টোপাসের গড়নের মতো জানোয়ার রক্তাক্ত শরীরে পড়ে আছে। বললুম,–ওটা কী প্রাণী? ওটার সঙ্গেই কি আপনি লড়াই করছিলেন তখন?
কিষাণচাঁদ খুশি হয়ে বলল,–হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছ, ওটার কী দশা হয়েছে।
–প্রাণীটার নাম কী ডঃ যোশী।
কিষাণচাঁদ আরও খুশি হয়ে বলল,–ওটা অধুনালুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জীব হেক্টোপাস।…
.
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
হেক্টোপাস নামে এই প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটির রক্তাক্ত শরীর থেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ বেরুচ্ছিল। এই ঘরেই যদি আমাকে বন্দি করে রাখে, তা হলে বমি করতে করতে নির্ঘাত মারা পড়ব। কিন্তু কিষাণচাঁদ আমাকে সেই ঘর থেকে আরেকটা ঘরে নিয়ে গেল।
এ ঘরের ছাদের ফাটল দিয়ে আকাশ দেখা গেল। তখন বুঝলুম, এই ঘরেরই ওপরটা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে ফেলেছে কিষাণচাঁদ। ফাটলটা অনেকটা চওড়া। মেঝেভর্তি পাথরের চাঁই পড়ে আছে। ভয় হল, এখনই ফাটলধরা ছাদটা ধসে পড়বে না তো?
কিষাণচাঁদ বলল,–এবার আমার কিছু হুকুম তামিল করো লক্ষ্মী ছেলের মতো।
–বলুন কী করতে হবে?
–এই টর্চটা ধরে থেকে আমাকে আলো দেখাবে।
–আমার হাত যে বাঁধা।
তাতে কোনো অসুবিধা হবে না সোনা! তোমার কব্জি দুটো পিছন থেকে বাঁধা আছে এই তো? আমি তোমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিচ্ছি। তুমি এদিকে পিঠ রেখে দাঁড়াও। ব্যস! কিন্তু খুব সাবধান। আলো ওপরে ফেলার চেষ্টা করবে না। তা করলেই দেখতে পাচ্ছ, স্টেনগান রেডি আছে।
–কী করতে চান ডঃ যোশী?
কিষাণচাঁদ চোখ নাচিয়ে বলল,–বাহাদুর ছোকরা দেখছি হে! অ্যাঁ? ডঃ যোশী বলে আমাকে গলাবার চেষ্টা করছ যে! উঁহু, ও চালাকি বারবার খাটবে না। নাও, টর্চ ধরে থাক। সাবধান।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। সে আমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিল। টর্চের মুখ দেওয়ালের দিকে। তারপর চোখের কোণা দিয়ে দেখলুম, সে একটা বড় পাথর ঠেলে এনে এক জায়গায় রাখল। সেই পাথরে তাকে উঠতে দেখে টের পেলুম সে কী করতে চায়।
আমাকে বেঁধে রাখা দড়ির ডগা সে নিজের কোমড়ে জড়িয়ে ভালোভাবে বাঁধল। তারপর ছাদের ফাটল আঁকড়ে ওপরে উঠে গেল। দড়িটা বেশি বড় নয়। টানটান হয়ে রইল। ওপর থেকে সে স্টেনগানের নল বের করে রাখতে ভুলল না। তারপর হুকুম দিল চাপা গলায়,আঙুল বাঁকা করে টর্চের স্যুইচ অফ করে দাও।
চেষ্টা করে বললুম,–পারছি না যে!
–পারতেই হবে। স্যুইচ তোমার তর্জনীর কাছেই রেখেছি টিপে নীচের দিকে ঠেলে দাও।
অনেক কষ্টে টর্চ নেভাতে পারলুম। তখন সে বলল,–সাবধান! তোমার সঙ্গে আমিও বাঁধা আছি। কাজেই অন্ধকারে পালাবার চেষ্টা কোরো না। এবার যা বলছি, করো। ওই পাথরে উঠে দাঁড়াও।
দু-হাত পেছনে বাঁধা আছে। কিছুতেই উঠতে পারছি না। কোনোভাবেই ওঠা সম্ভব নয়। অথচ সে বারবার ফিসফিস করে বলছে, কী হল? দেরি হচ্ছে কেন?
বললুম,–অসম্ভব। হাত বাঁধা মানুষ পাথরে চাপবে কী ভাবে?
–লাফ দাও না।
–অন্ধকারে লাভ দিয়ে হাড়গোড় ভাঙবে না? তা ছাড়া পাথরটা যে আড়াই ফুটের বেশি উঁচু মনে হচ্ছে।
–অপদার্থ! মুরগির যেটুকু জোর আছে তোমার নেই। আবার ঘুঘুগিরি করতে এসেছ! ঠিক আছে, তোমাকে ওঠাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা ভারি কষ্টদায়ক হবে তোমার কাছে।
অসহ্য লাগছিল। পা-মচকানো ব্যথা, তার ওপর বেঁধে রাখার ফলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে কব্জির ওখানটা ফুলে ঢোল হচ্ছে বুঝতে পারছি। খুব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। তার ওপরে সেই অবস্থায় টর্চ ধরে আছি। দাঁতে দাঁত চেপে বললুম,–যা হয়, করুন। আর পারছি না।
আমাকে ওপর থেকে হ্যাঁচকা টানে শূন্যে ঝোলাল। আর্তনাদ করে উঠলুম। দুই বাহু ভেঙে গেল মনে হল। কিন্তু সে চাপা গর্জে বলল,–চুপ!
দ্বিতীয়বার হ্যাঁচকা টানে আমাকে শয়তানটা ফাটলের কাছে তুলে ফেলল। ওর গায়ে দানবের শক্তি যেন।
কিন্তু আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলুম না! অজ্ঞান হয়ে গেলুম।
কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলুম জানি না, যখন জ্ঞান হল দেখি মুখের ওপর বিশাল নক্ষত্রভরা আকাশ ঝলমল করছে। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। তারপর টের পেলুম, আমি বালির ওপর শুয়ে আছি। আমার বাঁধনটা আর নেই। কিন্তু উঠে বসার ক্ষমতাও নেই। এদিকে প্রচণ্ড কনকনে ঠাণ্ডা। যন্ত্রণা ও ঠাণ্ডার চোটে কাতর হয়ে রইলুম।
আমার মাথা, কাঁধ, মুখ ও জামার ওপরটা ভিজে মনে হচ্ছিল। আমি অতিকষ্টে বললুম-কে আছ এখানে?
সঙ্গে সঙ্গে মাথার কাছ থেকে কিষাণাদের সাড়া এল–এই যে সোনা! ঘুম ভেঙেছে দেখছি। অনেক কষ্ট দিলে হে। কিষাণচাঁদ জীবনে যা করেনি, তাকে দিয়ে তাই করালে। তোমার মতো একটা ক্ষুদে বিচ্ছুর সেবাও করতে হল।
-–আমি কৃতজ্ঞ ডঃ যোশী।
–চুপ। বাঁদরামি করলে মুখ ভেঙে দেব।
বুঝলুম, কিষাণচাঁদ খামখেয়ালি প্রকৃতির লোক। এখন একরকম, তখন একরকম হয়ে ওঠে। ওর রাগ হয়, এমন কিছু করা উচিত হবে না। বললুম,–দাদা বললে কি আপত্তি করবেন কিষাণচাঁদজি?
–আমি কারুর দাদা নই।
–আমার সেবা করেছেন যে! দাদা ছাড়া ছোটভায়ের সেবা কেউ করে?
–করেছি নিজের স্বার্থে। চাকতিটা না পাওয়া পর্যন্ত যেভাবেই হোক তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
–তারপর বুঝি মেরে ফেলবেন?
–চাকতি পেলে দেখা যাবে।
–আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন, চাকতি পেলে আমাকে ছেড়ে দেবেন। কিষাণচাঁদ কোনো কথা বলল না। মনে মনে শিউরে উঠলুম। তা হলে কি সে আমাকে মেরে ফেলবে চাকতি পেলেও?
