আরেগোনা দ্রুত বলে উঠল—সেই কথাই আমার মাথায় এসেছিল। মেজর সাহেব আমাকে দশাবতার ফলকটা দেখিয়েছিলেন। তাই যখন বনবিহারি আমাকে নৃসিংহ মূর্তির ফোটো পাঠিয়ে দিল, আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল। তাই খোঁজখবর নিতে শুরু করলুম। পরে আমার কলকাতার এজেন্ট খবর দিল, মেজর সাহেব বেঁচে নেই। তাঁর ছেলেও বড় ডাক্তার। এবং দশাবতার ফলকটা চুরি গেছে ওদের বাড়ি থেকে। তখন এই বনবিহারীর ওপর সন্দেহ বেড়ে গেল। এই সময় জানতে পারলুম, টোরা আইল্যান্ডে নাকি নৃসিংহের হাতে কয়েজন ভারতীয় বিজ্ঞানী মারা পড়েছেন। তারপর বনবিহারীও লিখে পাঠাল যে টোরা আইল্যান্ডে সত্যি নৃসিংহ আছে এবং সে আমাকে স্বচক্ষে দেখাতে পারবে, তখন ভাবলুম, তাহলে বনবিহারী হয়তো কোনওভাবে টের পেয়েছে। নৃসিংহ মূর্তির গায়ে সাংকেতিক ভাষায় প্রাচীন শল্য চিকিৎসার ফরমুলা লেখা আছে। হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করে ফেললুম সব কিন্তু…।
বনবিহারী বলে উঠল—তাহলে আর অবিশ্বাসের কারণ কী? ওই তো নৃসিংহ পড়ে আছে আপনার সামনে। এই দ্বীপের লোকেরাই মানুষের মাথায় সিংহের মাথা কেটে বসিয়ে নৃসিংহ তৈরি করেছিল। তাই দশাবতার ফলক এখানেই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন পরমেশবাবুর বাবা।
আরে গোনা বলল—কিন্তু প্রাণীটাকে দেখে আমার যে সন্দেহ হচ্ছে ব্রাদার!
-কী সন্দেহ?
—ওটা কি সত্যি নৃসিংহ? নৃসিংহ মূর্তিটা বনবিহারী কোটের পকেট থেকে বের করে বলল—মিলিয়ে দেখুন।
—মিলছে না ব্রাদার। একটু গোলমাল ঠেকছে।
—হুবহু কীভাবে মিলবে? এটা কষ্টিপাথরের খোদাই করা মূর্তি, আর ওটা হল সত্যিকার নৃসিংহ। শিল্পীর হাতে কি অবিকল নকল সম্ভব? একটু আধটু খুঁত থাকবেই।
পরমেশবাবু এতক্ষণে বলে উঠলেন—ওটা আসলে একটা গরিলা।
আরেগোনা লাফিয়ে উঠে বলল—আলবৎ তাই! আমি মালয়েশিয়ার বাসিন্দা। আমি জানি, আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর আগেও মালয়ের জঙ্গলে গরিলা ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দ্বীপেও ছিল। ব্রাদার বনবিহারী! তাহলে এবার তৈরি হও। তুমি আমাকে প্রতারণা করে পাঁচ লাখ ডলার হাতাতে চেয়েছ—এ তো কম অপরাধ নয়।
. আমার বুক কাঁপল। হতভাগা বনবিহারীর কী পরিণতি ঘটবে কে জানে!
বনবিহারী গ্রাহ্য করল না। ফুঁসে উঠে বলল—ভুল বলছেন পরমেশবাবু!—উনি কি জানেন না! আলবাৎ এটা নৃসিংহ।
আরেগোনা বলল—বেশ। ধরে নিচ্ছি, এটা নৃসিংহ। কিন্তু তোমার ওই মূর্তির গায়ে ওগুলো সাংকেতিক ভাষায় লেখা ফরমুলা, তার প্রমাণ কী?
—প্রমাণ? এই দ্বীপে নৃসিংহ স্বচক্ষে দেখেও প্রমাণ চাই? বনবিহারী কুৎসিত হেসে উঠল।
–বাঃ! ওই ফরমুলা উদ্ধার করবে কে?
—আপনাকে তো বলেইছি, ডঃ হরিহর গড়গড়ি ওর পাঠোদ্ধার করতে পারবেন, তাঁকে ধরে নিয়ে আসুন। আমি সাহায্য করব।
আমি শিউরে উঠলুম। লোকটা কী শয়তান!
আরেগোনা বলল-বেশ। ফরমুলা উদ্ধার হল। তারপর সেটা কাজে পরিণত করবে কে?
কেন? ওই তো পরমেশবাবু আছে। ওকে আটকে রাখুন।
পরমেশ রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন—মুখ সামলে কথা বলবে বনবিহারী!
আরেগোনার মুখের ভাব দেখে তার মতলব আঁচ করা কঠিন কিন্তু সে হেসে উঠল। বলল-বনবিহারী, ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি। আমার সঙ্গে ধূর্তামি করে পার পাবে না ব্রাদার। বিশেষ করে আমার এক পুরনো বন্ধু মেজর সাহেবের পাওয়া ফলক চুরি করে আমার সঙ্গে তঞ্চকতা করেছ—তোমার শাস্তি পাওনা হয়েছে। বোঙা! এদিকে আয় তো!
কয়েকটা জ্বলন্ত টর্চের আড়াল থেকে হিংস্র চেহারার একটা লোক সামনে এসে দাঁড়াল।
—এই শয়তানটাকে পুবের পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের খাড়িতে ছুড়ে ফেলে দিবি। এই বদমাশ আমাকে হাজার কাজ পণ্ড করে নৃসিংহ দেখাবে বলে, গরিলা দেখিয়ে আমার মাথা খারাপ করেছে। যা নিয়ে যা!
আমরা চারজনে গা ঘেঁষাঘষি করে দাঁড়িয়ে আছি একপাশে অন্যপাশে টংকু আরেগোনা। সামনে কিছুটা তফাতে বনবিহারী। আর যে সুড়ঙ্গপথে এসেছি, সেখানে চারজোড়া টর্চ জ্বলে দাঁড়িয়ে আছে আরেগোনার সশস্ত্র লোকেরা।
বোঙা যেই বনবিহারীর দিকে এগিয়েছে, অমনি বনবিহারী বিদঘুটে হেসে বলে উঠল—ওরে খাদা শয়তান! আমায় শাস্তি দিবি—এত বুকের পাটা তোর?
তারপর এক ধুন্ধুমার ঘটে গেল আচম্বিতে।
প্রচণ্ড আওয়াজে গর্তের মধ্যে যেন বোমা ফাটল। তারপরই জন্তুটার ভয়ঙ্কর গর্জন শোনা গেল। কটু বারুদের গন্ধে নিঃশ্বাস আটকে গেল। জানলুম, বনবিহারী গ্রেনেড ছুড়ছে বারবার।
তারপর কর্নেলের চিৎকার শুনলাম—এদিকে! এদিকে!
মনে হল কর্নেল আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিয়ে এলেন।
আবার কর্নেলের গলা শুনলুম—এই পথে এস! আমাকে ছুঁয়ে থাক সবাই!
একটু পরে বুঝলুম, দুপুরের সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে আমরা দৌড়ে যাচ্ছি। কর্নেল পিছন থেকে আমাদের ঠেলে নিয়ে চলেছেন।
পিছনে সেই গর্তের মধ্যে মুহুর্মুহু বোমা ফাটার আওয়াজ আর গরিলাটার হুংকার শোনা যাচ্ছে।
***
নারকেল বনের শেষে বালির বিচে গিয়ে কর্নেল বললেন-সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। সন্ধ্যায় আমরা আলো জ্বেলে সাংকেতিক চিহ্ন দেখালে শার্ক থেকে বোট আসবে। ততক্ষণ ওপাশে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকি।
রহস্যময় টোরাদ্বীপের মাথার দিকে ঘন জঙ্গল শেষবেলার রোদে ম্লান দেখাচ্ছে। ধোঁয়া উড়তেও দেখলুম। কী পোড়াচ্ছে ওরা? বনবিহারী, না আরোগানার মড়া? নাকি গরিলাটার?
আমি মনে মনে কামনা করলুম—ওই বদমাশগুলো মারা পড়ুক। কিন্তু গরিলাটা যেন বেঁচে থাকে।
১.১৩ হাট্টিম রহস্য
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার খুব মন দিয়ে একটা চিঠি পড়ছিলেন। পড়া শেষ হলে আমার দিকে ঘুরে মৃদু হেসে এই ছড়াটা খুব ধীরে আওড়ালেন?
