অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো আছি। এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে আবার কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়ব ভেবে পা বাড়াতে সাহস হচ্ছে না।
ওদিকে গুলির শব্দ ও গর্জন বা আর্তনাদটা আবার থেমেছে। মনে হচ্ছে, কিষাণচাঁদ কিংবা সেই অজ্ঞাত দানবের লড়াই শেষ হয়েছে এতক্ষণে। কে জিতেছে কে জানে! আমি মনে জোর আনার চেষ্টা করতে থাকলুম।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলুম জানি না, হঠাৎ পিছন থেকে আমার গায়ে টর্চের আলো পড়ল। ঘুরেই রিভলভার বাগিয়ে গর্জে বললুম,–কে তুমি?
আলোর পিছন থেকে চাপা অট্টহাসি হাসল কেউ।–কী? বুড়ো ঘুঘুর বাচ্চা! তুমি কেমন করে শ্মশান-গুহার ছাইগাদায় এসে জুটলে হে? তোমার বুড়ো ঘুঘুটি কোথায়? তার সাঙ্গপাঙ্গ টিয়া-বুলবুলি আর সেই হুতুম প্যাচাটাই কোথায়?
–আর একটা কথা বললে গুলি ছুঁড়ব।
–তার আগে তোমার মুণ্ডু উড়ে যাবে। দেখতে পাচ্ছ না, এটা একটা স্টেনগান?
এবার লক্ষ করলুম, আলোর সামনে কালো একটা নল আমার দিকে তাক করে আছে। বললুম, –তুমি কি কিষাণচাঁদ?
–রিভলভার ফেলে দাও আগে। তারপর কথাবার্তা হবে।
–যদি না ফেলি।
–মুণ্ডটি হারাবে। রেডি–ওয়ান … টু … থ্রি ..
রিভলভার ফেলে দিলুম। ছাইগাদায় ডুবে গেল। কিষাণচাঁদ এসে পায়ে ছাই সরিয়ে সেটা তুলে নিল। দেখলুম, ওর জামাপ্যান্টে রক্ত লেগে আছে। রক্তগুলো ওর নিশ্চয় নয়। কারণ ওকে আহত বলে মনে হচ্ছে না।
সে আমার জামার কলার খামচে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। পায়ের ব্যথার কথা ভুলে গেলুম। নির্ঘাত শয়তানটা আমাকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে।
নিচু ছাদওয়ালা একটা করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে একটা প্রশস্ত ঘরে পৌঁছলুম। সেখানে দেখি, অনেক মাটির জালা রয়েছে। গুপ্তধন নাকি?
পরক্ষণে বুঝলুম, সব ছাইভর্তি অস্থিভস্ম। কত হাজার-হাজার লোকের অস্থিভস্ম কে জানে! মনে হল, একটু আগে যে ঘরে ঢুকে পড়েছিলুম-সে ঘরের জালাগুলো কেউ ভেঙে ফেলেছে। বলে ছাই ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে।
কিষাণচাঁদ এবার পকেট থেকে একটা মোম জ্বালল। একটা জালার মুখে রেখে টর্চ নেভাল। তারপর বাঁকা হেসে বলল,–এবার খবর বলো হে ক্ষুদে ঘুঘু!
বললুম,–খবর সাংঘাতিক। তোমার দলবলকে মিলিটারিরা গ্রেফতার করে চালান দিয়েছে। এবার তোমার সেই দশা হবে। চারদিক মিলিটারিরা ঘিরে রেখেছে।
কিষাণচাঁদ একটু ভড়কে গেল যেন। ভুরু কুঁচকে বলল,–তাই নাকি?
-হ্যাঁ। আর তোমার পরামর্শদাতা মুরুব্বি লারকানা জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরকেও এতক্ষণ গ্রেফতার করা হয়েছে।
কিষাণচাঁদ কী যেন ভাবল! তারপর বলল,–সেদিন প্লেনে আসতে-আসতে তোমার প্রতি আমার স্নেহ জন্মে গিয়েছিল। নয়তো এতক্ষণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতুম না। তা ছাড়া তুমি সাংবাদিক। সাংবাদিক মারা আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা একই কথা। যাকগে, আমার এই ব্যবহারের বিনিময়ে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।
–আলবাত করছি। আমি কৃতজ্ঞ ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী! কিষাণচাঁদ বাঁকা হেসে বলল,–ডঃ অনিরুদ্ধ যোশীকে তোমার মনে ধরেছিল দেখছি। হুঁ, আমাকে কিন্তু অদ্ভুত মানিয়েছিল।
–দারুণ! আমি তো একটুও ধরতে পারিনি।
–কিষাণচাঁদ লাখে একটাই জন্মায় হে ছোকরা! যাকগে, এবার তোমাকে নিয়ে কী করব একটু ভাবা যাক। … বলে সে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। ভাবতে থাকল।
বললুম,–আমি আপনাকে ডঃ যোশী বললে কি রাগ হবে কিষাণভাই?
–তুমি আমাকে ভাই বলছ?
–কেন বলব না? আমাকে এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি কি অকৃতজ্ঞ?
–হুঁ, তুমি এবার পথে এসেছ দেখছি। তা আমাকে ডঃ যোশী বললে আপত্তি করব না। পুনার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক জানো? আমরা দুজনে স্কুল-কলেজে সহপাঠী ছিলুম। সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের দুজনের চেহারাতেও দারুণ মিল! যাকগে সেকথা। শোনো, তোমাকে আমি … হা মুক্তিই দেব। একটা শর্তে।
–বেশ, বলুন।
–হেহয়রাজার ঘোড়ার সেই ব্রোঞ্জের চাকতিটা আমার চাই।
–কিন্তু আমি কোথায় পাব? আমার কাছে তো ওটা নেই।
–তুমি এই কাগজে নিজের হাতে লেখ : ‘আমি বন্দি আছি। আমার মুক্তিপণ হিটাইট ব্রোঞ্জচাকতি। পত্রবাহকের হাতে না দিলে আগামীকাল ভোর ছটায় এরা আমাকে মেরে ফেলবে। নীচে নাম সই করে তারিখ দাও। আমার লোক এটা আজ রাতে তোমার কর্নেল সাহেবের কাছে পৌঁছে দেবে। চাকতি কোথায় কীভাবে পৌঁছে দিতে হবে সেসব আলাদা চিরকুটে লিখে দেব। বাকি যা করার, আমি করব। নাও, লেখ।
সে পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে কাগজ ছিঁড়ল এবং একটা ডটপেন দিল। আমি কথাগুলো লিখে সই করে দিলুম, তারিখও দিলুম।
এবার কিষাণচাঁদ জালার ওপর রাখা একটা হ্যাঁভারস্যাক থেকে মোটা নাইলনের রশারশি বের করল। বুঝলুম, দেওয়াল বেয়ে এই গুহায় ঢোকার জন্য দরকার হবে বলে দড়ি এনেছিল সে।
দড়িতে আমার হাতদুটোকে পিঠমোড়া করে বাঁধল। তারপর বলল,–চলো, তোমাকে ভালো জায়গায় রেখে আসি। এখানে থাকলে তো তোমার স্যাঙাতরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে ফেলবে।
একহাতে টর্চ আর আমার রিভলভার অন্য হাতে স্টেনগানের নল আমার পিঠে ঠেকিয়ে সে আমাকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে চলল। আবার একটা নিচু ছাদওয়ালা সংকীর্ণ করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে গেলুম। এতক্ষণে মনে হল অজস্র ঘর ও করিডোেরওয়ালা গুহাটা প্রাকৃতিক গুহা নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষরা বানিয়েছিল। এখানেই তারা সম্মানিত লোকেদের অস্থিভস্ম এনে জালায় রেখে দিত।
