কর্নেল কামাল খাঁ বললেন,–লারকানা জাদুঘরের সহকারি ডিরেক্টর আরশাদ হুসেন কিষাণচাঁদের পরামর্শদাতা। ফিরে গিয়েই ওকে আমি গ্রেফতার করব। এবার চলুন ফকিরসাহেব।
অন্ধকার হয়ে এল যে!
ফকিরসাহেব পা বাড়িয়ে বললেন,–চলুন। কিন্তু সাবধান। আলো জ্বালাবেন না। আমি গোপনে একটা পথে আপনাদের ওই গুহায় নিয়ে যাব। শুধু মনে রাখবেন কিষাণচাঁদ খুব ধূর্ত এবং ভীষণ হিংস্র।
ফকিরসাহেব আগে, তাঁর পিছনে কর্নেল কামাল খাঁ, তার পিছনে ডঃ করিম, তারপর একে-একে ডঃ তিড়কে, কর্নেল সরকার এবং আমি। আমি সবার পিছনে। অন্ধকার খুব একটা ঘন হয়নি। তাছাড়া আজ চতুর্থী, চাঁদের জ্যোৎস্না ফুটেছে। অসুবিধে হচ্ছিল না।
ওপরে উঠে সমতল একটা জায়গা পাওয়া গেল। ততক্ষণে চাঁদের আলো বেশ পরিষ্কার হয়েছে। এক ফাঁকে ফিসফিস করে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলুম,–ব্রোঞ্জের চাকতিতে কি সত্যি গুপ্তধনের খোঁজ আছে?
কর্নেল ফিসফিস করে বললেন,–ভাগ চাই নাকি তোমার? পাবে, কথা দিচ্ছি।
রাগে মুখ দিয়ে কথা বেরুল না। আমি কি গুপ্তধনের লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছি এঁদের সঙ্গে? অদ্ভুত বললেন তো!
কাটাঝোঁপগুলো এড়িয়ে সাবধানে অনেকখানি যাওয়ার পর ফকিরসাহেব দাঁড়ালেন। সামনে আবার একটা প্রাগৈতিহাসিক কবরখানা মনে হল। সার সার চ্যাপ্টা উঁচু পাথরের চাঁই পোঁতা আছে! ফিকে জ্যোৎস্নায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো। আগে না দেখা থাকলে ভয়ে ভিরমি খেতুম।
ফকিরসাহেব ইশারায় সেই কবরখানায় ঢুকতে বলে এগিয়ে গেলেন। মাঝামাঝি গিয়ে একখানে একটা পাথরের সামনে দাঁড়ালেন। ফিসফিস করে বললেন, এখানেই। তারপর পাথরের চাঁইটা অক্লেশে দুহাতে উপড়ে ফেললেন। এ যে দৈত্যদানবের কীর্তি! আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে গেছি। কেউ কেউ অস্ফুটস্বরে বিস্ময়সূচক শব্দও করেছেন। তাই ফকিরসাহেব বললেন,–এই পাথরগুলো কাঠের তক্তার মতো হাল্কা। এক বিশেষ ধরনের পাথর! অথচ ভারি মজবুত। দুহালা এলাকার লোকেরা বলে চাঁদের পাথর। সূর্যদের পুজোয় খুশি হয়ে নাকি ওদের পূর্বপুরুষদের এইসব পাথর চাঁদ থেকে পাঠিয়ে দিতেন। পরীরা বয়ে আনত। অবশ্য কেউ মারা গেলে, তবেই। যাকগে, নীচের এই বেদিটার তলায় সুড়ঙ্গপথ আছে।
বলে উনি বেদির মতো চারকোণা একটা হাল্কাপাথর একইভাবে তুলে পাশে রাখলেন। বেদির মধ্যে পাথরের চাঁই বসানোর গর্ত রয়েছে।
ফকিরসাহেব বললেন,–সাবধান, আলো জ্বালবেন না কেউ। ভেতরে কিষাণচাঁদ কোথায় আছে আমরা জানি না। সিঁড়ি বেয়ে নামবেন একে-একে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের পিঠে হাত রাখবেন।
গর্তটা কোনোমতে একজন ঢোকার মতো। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, “জয়ন্ত, ইচ্ছে না করলে তুমি অপেক্ষা করতে পার এখানে।
বললুম,–পাগল! একা এই ভূতের রাজ্যে বসে থাকার চেয়ে পাতালে আপনাদের সঙ্গে গিয়ে মরা ঢের ভালো।
একে-একে সবাই অদৃশ্য হলেন। তারপর কর্নেলের পিছনে আমিও নেমে গেলুম। কেমন একটা বাসি ধূপ-ধুনোর গন্ধ যেন। কুয়োর মতো সুড়ঙ্গের সিঁড়ি বেয়ে নামছি তো নামছি। ঠাসা অন্ধকার। সংকীর্ণ জায়গা। দম আটকে যাচ্ছিল।
কতক্ষণ পরে টের পেলুম, মেঝের মতো মসৃণ চওড়া একটা জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
হঠাৎ সামনে দূরে কোথাও একঝলক আলো জ্বলেই নিভে গেল। ফকিরসাহেব ফিসফিস করে বললেন,–আবার সবাই সবাইকে ছুঁয়ে পা বাড়ান। আমি আগে থাকছি।
এবার মেঝের মতো সমতল জায়গায় হেঁটে চলেছি পরস্পরকে ছুঁয়ে। কখনও ডাইনে, কখনও বাঁয়ে ঘুরে-ঘুরে অনেকখানি যাওয়ার পর সবাই দাঁড়ালাম। কোথায় খসখস শব্দ হচ্ছে। শব্দটা বাড়তে থাকল। তারপর উপর্যুপরি বন্দুকের আওয়াজে গুহার স্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল।
তারপর একটা অমানুষিক আর্তনাদ অথবা গর্জন শোনা গেল। আঁআঁ–আঁআঁ! ওটা যে মানুষের গলার নয়, তা ঠিকই। কিন্তু অমন কানে তালাধরানো ভয়ঙ্কর চিৎকার কোন প্রাণীর?
অমনি ফকিরসাহেব চাপা গলায় বলে উঠলেন–সর্বনাশ! শ্মশান-গুহার দানবটা জেগে গেছে। পালিয়ে আসুন পালিয়ে আসুন। যেপথে এসেছি, সেই পথে।
একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। বেঁকের মাথায় কর্নেল কামাল খাঁ টর্চ জ্বাললেন। ফকিরসাহেব বললেন,–আলো নয়। আলো নয়! আমার পিছু পিছু সেইভাবে চলে আসুন সবাই।
আমি সবার পিছনে। হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলুম। তারপর গড়াতে গড়াতে আবার মেঝেয়। কর্নেল কি টের পেলেন না? পায়ের শব্দ ওপরের দিকে মিলিয়ে গেল দ্রুত। সেদিনকার চোটখাওয়া জায়গাতেই আবার চোট পেয়েছি। গোড়ালি দুমড়ে গেছে। উঠতে দেরি হল।
তারপর আর কিছুতেই সিঁড়িটা খুঁজে পেলুম না। যেদিকে যাই দেয়ালে বাধা পাই। শেষে একজায়গায় ফাঁক পেয়ে পা বাড়ালুম, কিন্তু সেখানে সিঁড়ি নেই। এদিকে পিছনে আবার বন্দুকের প্রচণ্ড আওয়াজ আর সেই অমানুষিক গর্জন বা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে–আঁ-আঁ-আঁ-আঁ।
পাগলের মতো খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চললুম। কিছুটা যাওয়ার পর মনে হল ধূলোবালির মধ্যে হাঁটছি। গলা শুকিয়ে গেছে। আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছি। শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে রিভলভার বের করলুম। এবং দেশলাই বের করে জ্বালাতেই দেখি, আমি কালো ছাই গাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছি!
তা হলে এই সেই মামদো-ভূতের আড্ডা শ্মশানগুহা! এখান থেকে বেরুতে পারলে আমাকেও সবাই মামদোভূত ভেবে বসবে, তাতে কোনো ভুল নেই।
