কিন্তু তারপরই আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, সেপাইরা চাতালের তলায় গিয়ে ঢুকল। এবং ফকিরসাহেব দুহাতে বার কতক তালি বাজালেন। আকাশের দিকে মুখ।
তারপর সিন্ধুনদের দিকে ইশারা করে কিছু বললেন। সশস্ত্র লোকগুলো সেদিকে তাকিয়ে কী দেখতে থাকল। তখন সদ্য সূর্যাস্ত হয়েছে। সিন্ধুর জলে রক্তিম ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। দেখতে-দেখতে সেই সিঁদুর গোলা জলের রঙ বদলাতে থাকল। এমন বিচিত্র দৃশ্য আমি দেখিনি। সোনালি-রূপালী পাখনা মেলে যেন অসংখ্য পরী স্নান করতে নেমেছে।
ব্যাপারটা বিস্ময়কর এজন্যে যে শুধু একটা জায়গায় ওই রঙের খেলা দেখা যাচ্ছে। লোকগুলো নিশ্চয় তাজ্জব হয়ে দেখছে। ফকিরসাহেব এবার সোজা দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে প্রার্থনা করছেন।
তারপর দেখলুম, ফকিরসাহেব প্রার্থনা শেষ করে কয়েকবার তালি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পাথরের চাতালটার কিনারা থেকে মিলিটারি সেপাইরা আচমকা লাফিয়ে উঠল এবং লোকগুলোকে ঘিরে ফেলল।
লোকগুলো চমকে উঠেছিল। ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় প্রত্যেকে বন্দুক ফেলে দিয়ে দুহাত তুলে দাঁড়াল।
কর্নেল কামাল খাঁ দৌড়ে নেমে গেলেন। দুহাতে দুটো রিভলভার থেকে দুবার গুলি ছুঁড়তে ভুললেন না।
আমারও নীচে গিয়ে ব্যাপারটা মুখোমুখি দেখার ইচ্ছে করছিল। কিন্তু একটু নড়তেই কর্নেল চিমটি কেটে বসে থাকতে ইশারা করলেন।
কর্নেল কামাল খাঁ এবং তাঁর বাহিনী ডাকাতগুলোকে আগ্নেয়াস্ত্রের ডগায় রেখে চাতাল থেকে নামালেন। অপেক্ষাকৃত ঢালু পথটা দিয়ে ভেড়ার পালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে চললেন। ফকিরসাহেব এবার আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
কর্নেল বললেন,–চলুন, এবার যাওয়া যেতে পারে।
আমরা চারজনে নীচে নেমে গেলুম। নামাটা সহজ হল না অবশ্য। পাথরে সাবধানে পা রেখে নামতে হল।
কাছে গিয়েই ডঃ করিম বুকে জড়িয়ে ধরেছেন ফকিরসাহেবকে। কর্নেল এবং ডঃ তিড়কে করমর্দন করলেন ওর সঙ্গে। আর আমি ওঁর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকালুম। এই মানুষটি আমার প্রাণদাতা!
ফকিরসাহেব হাসতে হাসতে বললেন,–কেরামতিটা কেমন দেখালুম বলুন? সিন্ধুনদের ওই জায়গাটায় অদ্ভুত আলোর খেলা দেখা যায় সন্ধ্যার আগে। ন্যাচারাল ফেনোমেনা। ব্যাটাদের বললুম, ওই দ্যাখ–ওখানেই রাজা হেহয়ের গুপ্তধন পোঁতা আছে। ওরা বিশ্বাস করল। …
.
শ্মশানগুহার বিভীষিকা
ফকিরসাহেব ওরফে ডঃ আমেদের কাছে জানা গেল : কাল বিকেলে কর্নেল খাঁ ওঁকে মুক্তি দিয়েছিলেন। উনি তাঁর গুহার আড্ডায় ফেরার পথে কিষাণচাঁদের হাতে বন্দি হন। বুদ্ধিমানের মতো তিনি ওদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন। নইলে প্রচণ্ড নির্যাতন করে ওরা তাকে মেরে ফেলত। এখানে ওই খাড়িমতো জায়গায় উঁচু তিনশো ফুট যে পাথরের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে, তার গায়ে দুশো ফুট উঁচুতে একটা গর্ত আছে। এই গর্তটা একটা গুহার পথ। কিন্তু নীচে সিন্ধুনদের জল ওখানে সমুদরের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে। তাই ওখানে কোনো নৌকা নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। গেলেও খাড়া পাথরের দেওয়াল বেয়ে উঠে গর্তে পৌঁছানো দুঃসাধ্য। তাই কিষাণচাঁদকে উনি পরামর্শ দিলেন, যদি দেওয়ালটার ওপর থেকে দড়ি ঝুলিয়ে সেই দড়ি বেয়ে কেউ নামতে পারে তাহলে একশো ফুট নীচে গর্তটায় পৌঁছতে পারবে। এ কাজ দক্ষ পর্বতারোহীর। ওদের দলে তেমন কেউ নেই। তাই সেই দুপুর থেকে গর্ত খুঁড়ে ডিনামাইট ভরে দিয়েছিল কিষাণাদ। কিছুক্ষণ আগে আমরা সেই ডিনামাইটের বিস্ফোরণ টের পেয়েছি। দেওয়ালটা উড়ে গেছে। গুহার ছাদে ফাটল ধরেছে। সেই ফাটল দিয়ে কিষাণচাঁদ নেমে গেছে একা। সঙ্গীদের বলে গেছে, এক ঘণ্টার মধ্যে আমি না ফিরলে এই ফকিরকে জবাই করবে।
এখনও কিষাণচাঁদ ফেরেনি। এদিকে চাতালে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎ ফকিরসাহেবের চোখে পড়েছিল, একদল মিলিটারি সেপাই পাথরের আড়ালে বসে আছে। তখন তিনি শয়তানগুলোকে কথায় কথায় ভুলিয়ে রাখেন এবং ওই কেরামতি দেখান। সেই সঙ্গে সেপাইদের এগিয়ে আসতেও ইশারা করেন।
কর্নেল কামাল খাঁ বন্দিদের ট্রাকে তুলে চালান করে ফিরে এলেন। এখন আলো আর নেই। ধূসরতা ঘনিয়ে উঠেছে। উনি এসেই বললেন,–কিষাণচাঁদ তো নেই ওদের দলে!
ফকিরসাহেব বললেন,–চলুন, আপনাদের কিষাণাদের কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু তার আগে বলুন, আপনারা এভাবে এখানে হঠাৎ এসে পড়লেন কোন্ সূত্রে?
জবাব দিলেন ডঃ তিড়কে। সে ভারি অদ্ভুত যোগাযোগ বলতে পারেন। রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে যে ব্রোঞ্জের চাকতি ছিল, সেটা নিশ্চয় আপনি পাথরের সিন্দুকে দেখেছিলেন?
–হুঁ, দেখেছিলুম। কিন্তু আমি ও-নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইনি। ঈশ্বরের দিকে যে মন ফিরিয়েছে, তার কাছে আর ওসব জিনিসের কতটুকু মূল্য ডঃ তিড়কে?
–তা ঠিক। এবার ব্যাপারটা শুনুন তা হলে। ওই চাকতিটা একটা হিটাইট সীলমোহর। হিটাইট লিপি আছে ওতে।
–বলেন কী! ব্রহ্মবৰ্তরাজের ঘোড়ার সাজে হিটাইট লিপি।
–হ্যাঁ। যাই হোক, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গিয়েছিল, একটা হিটাইট ফলকে সিন্ধুনদ অঞ্চলের সূর্যপূজারী সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। তারা মৃতদেহের কবর দেয় এবং প্রতিটি কবরে পাথর পুঁতে খাড়া করে রাখে। তারা ঘোড়া আমদানি করে হিটাইট দেশ হাট্টি (বর্তমান সিরিয়া) থেকে। মোহেনজোদাড়োবাসীরা অবশ্য ঘোড়া তাদের কাছে দেখে থাকবে। কিন্তু ঘোড়া তারা যে কারণেই হোক, পছন্দ করেনি। হয়তো ঘোড়ার পিঠে চাপা পাপ ভাবত। লাঙল বা গাড়ি টানতে তো বলদই যথেষ্ট। আমি তাই ডঃ করিমকে জিজ্ঞেস করলুম সিন্ধুনদের তীরে তেমন কোনো গোরস্থান আছে নাকি। উনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। তখন ঠিক হল, আমরা সেখানে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করব। সেই সময় কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন, কিষাণদের দল দুহালায় রওনা হয়ে গেছে। ওর দলে সরকারি গোয়েন্দা আছে। সেই খবর দিয়েছে। তখন আমরা বুঝলুম, আমাদের অনুমান সঠিক। কিষাণচাঁদ কীভাবে এসব জানতে পেরেছিল, কে জানে।
