কর্নেল হাত বাড়িয়ে তুলতে গিয়ে বললেন,–ওঁড়ো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে। ওঠানো যাবে না!
বললুম,–কী ও দুটো?
সম্ভবত ঘোড়ার চোয়াল। প্রিয় ঘোড়ার মৃত্যু হলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে তার দুটো চোয়াল যত্ন করে রাখা হত।
ডঃ করিম বললেন, তা হলে রাজা হেহয়ের ঘোড়ার চোয়াল!
–তা ছাড়া আর কী। … বলে কর্নেল হাত বাড়িয়ে কী একটা তুলে নিলেন। চোখের সামনে নাড়াচাড়া করে দেখে বললেন,–একটা ব্রোঞ্জের চাকতি। পরিষ্কার করে দেখতে হবে এই সীলমোহরটা কার।
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, তা হলে গুপ্তধন নেই?
–সেই তো দেখছি। মনে হচ্ছে, কে কবে হাতিয়ে নিয়ে গেছে। কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। কতকাল আগে নিয়ে গেছে, কে বলতে পারে! হয়তো দুহাজার বছর আগে–কিংবা তারও আগে! ভাই কামাল সায়েব! সব গুপ্তধনই এখন তাই নিছক কিংবদন্তিতে পরিণত।
আমরা গুহার মধ্যে হতবাক হয়ে বসে রইলুম। একটু পরে স্তব্ধতা ভেঙে ডঃ করিম বললেন, –গুপ্তধন কী ছিল, জানি না। কিন্তু এ একটা বড় আবিষ্কার নয় কি কর্নেল সরকার? ব্রহ্মবৰ্তরাজ হেহয়ের বাকি ইতিহাসটুকু পেয়ে গেলুম। এই পাথরের সিন্দুকই বিশ্বের পুরাতত্ত্বের ইতিহাসে সেরা একটি সম্পদ। আসলে এটাই একটা গুপ্তধন। দেশবিদেশে হিড়িক পড়ে যাবে। বিশেষ করে আপনাদের ভারতীয় পণ্ডিতরা এসেছেন। এই বিস্ময়কর আবিষ্কার দেখতে তাদের আমন্ত্রণ জানাব। ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায় এবার আলোকিত হয়ে উঠবে। ….
হঠাৎ আমাদের পিছনে থেকে কে জোরালো টর্চের আলো ফেলল। চোখ ধাঁধিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে চিৎকার করে বলল,–একটু নড়লেই গুলি করব। যে যেভাবে আছ চুপ করে বসে থাকো। আর টর্চ নেভাও।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতচকিত। আমাদের টর্চগুলো নিভে গেল।
তারপর কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ডঃ আলুওয়ালা! শুনে দুঃখিত হবেন যে গুপ্তধনের সিন্দুকটা একেবারে খালি। স্বচক্ষেই দেখুন। রাজা হেহয়ের ঘোড়ার চোয়াল দুটো ছাড়া আর কিছু নেই।
মিথ্যা কথা! তোমরা গুপ্তধন বাগিয়ে লুকিয়ে ফেলেছ!
–না ডঃ আলুওয়ালা! আমরা …
–চুপ! এখনও বলছি, গুপ্তধন বের করো। নয়তো গুলি করে মারব।
–গুপ্তধন যদি সত্যি আমরা বাগিয়ে থাকি এবং আপনাকে তা দিই, তাহলেও তো আপনি আমাদের খুন করবেন ডঃ আলুওয়ালা! কারণ, আমাদের বাঁচিয়ে রাখলে আপনিই বিপদে পড়বেন।
শুনে আমার আত্মা খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম। অথচ কর্নেল কী ঠাণ্ডা গলায় নির্বিকার মুখে কথা বললেন।
ডঃ আলুওয়ালা জোরালো আলোর পিছনে রয়েছেন বলে ওঁকে দেখতে পাচ্ছি না। এবার হা হা করে হেসে বললেন,–ঠিকই বুঝেছ! তা হলে রেডি। …
হঠাৎ ওঁর পিছনে কাল রাতে শোনা সেই বিদঘুঁটে হাসি অথবা ঘোড়ার ডাক শোনা গেল–হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ!
তারপর কী একটা ঘটল। ডঃ আলুওয়ালার টর্চ ছিটকে পড়ল। হাতের রিভলভার থেকে গুহার। মধ্যে কান ফাটানো আওয়াজে গুলি বেরুল। কয়েক মুহূর্ত অন্ধকারে ধস্তাধস্তির শব্দ শোনা গেল। গুহার ভেতর ততক্ষণ উগ্র দুর্গন্ধে ভরে গেছে।
তারপর আমাদের টর্চগুলো জ্বলে উঠল। সেই আলোয় যা দেখলুম, গায়ের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। একটা কালো চামচিকের মতো মানুষ জাতীয় প্রাণী ডঃ আলুওয়ালার বুকের ওপর বসে দুহাতে গলা টিপে ধরেছে। ডঃ আলুওয়ালার জিভ বেরিয়ে গেছে।
কর্নেল কামাল খাঁ দুহাতের দুটো রিভলভারেরই ঘোড়া টিপে দিলেন। প্রাণীটা একটা বিদঘুঁটে আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেল।
আমরা হামাগুড়ি দিয়ে গেলুম। ডঃ আলুওয়ালাকে পরীক্ষা করে কর্নেল হতাশভাবে বললেন,–বেচারি মারা পড়েছেন। অতি লোভের পরিণাম!
প্রাণীটাকে কর্নেল কামাল খাঁ ও ডঃ করিম পরীক্ষা করেছিলেন। কর্নেল সরকার একটু ঝুঁকে দেখে নিয়ে বললেন,–এ কী! এ যে মানুষ! …
.
বিদায় সম্বর্ধনায় তুলকালাম
লারকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটি বিশাল সভাকক্ষে ভারতীয় পণ্ডিতদের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল পরদিন সকাল দশটায়। একের পর এক দু-দেশের পণ্ডিতরা বক্তৃতা দিয়ে উঠে মোহেনজোদাড়োতে নতুন এবং বিস্ময়কর প্রত্ন-আবিষ্কারের কথা বলছেন। প্রত্যেকেই কর্নেল বুড়ো এবং এই অধম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর প্রশংসা করছেন। ডঃ আলুওয়ালার জন্য দুঃখ প্রকাশও করছেন।
শুনে-শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। উসখুস করছি দেখে কর্নেল বললেন,–তোমাকেও বক্তৃতা দিতে হবে ডার্লিং। তৈরি হয়ে নাও।
–পাগল, না মাথাখারাপ! আমি ওতে নেই। এক্ষুনি কেটে পড়ছি।
উঠতে যাচ্ছি, ডঃ করিম ঘোষণা করলেন,–এবার ভারতীয় সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর মুখে এই রোমহর্ষক আবিষ্কারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনবেন আপনারা। মিঃ চৌধুরী কলকাতার প্রখ্যাত পত্রিকা দৈনিক সত্যসেবকের স্পেশাল রিপোর্টার।
কী আর করি, অগত্যা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দায়সারা কাহিনি শোনালুম। তারপর আসনের উদ্দেশে এগোলুম। মুহুর্মুহু করতালি চারদিকে। আমি তো একেবারে ঘাবড়ে গেছি।
গিয়ে দেখি, কর্নেলের আসন শূন্য। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁকে খুঁজলুম। তারপর দেখি, দরজার পাশে উঁকি মেরে চোখের ইশারায় আমাকে ডাকছেন।
কাছে যেতে-যেতে শুনি, সভাপতি ডঃ করিম ঘোষণা করছেন–এবার আমি প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে অনুরোধ করছি …
