বাইরে গিয়ে কর্নেল বললেন,–এসো, কেটে পড়া যাক।
বললুম,–আপনি অদ্ভুত মানুষ তো! এটা অভদ্রতা হচ্ছে না? আপনাকে তারা বক্তৃতা দিতে ডাকছেন আর আপনি কেটে পড়ছেন?
কর্নেল জবাব না দিয়ে হনহন করে লন পেরিয়ে চললেন। আমার খুব রাগ হল। মাঝে-মাঝে বুড়োর মাথায় যেন ভূত চাপে। এমন একটা জ্ঞানীগুণীর সমাবেশ ছেড়ে এবং রীতিমতো অভদ্রতা দেখিয়ে চলে গেলেন! এতে ভারতেরই মাথা কি হেট হচ্ছে না? কারণ উনি একজন ভারতীয় প্রতিনিধি!
দেশের সম্মান বাঁচাতে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। এখনই সভামঞ্চে গিয়ে জানিয়ে দেব, কর্নেল সরকার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি ভাষণ দিতে পারছেন না।
কিন্তু হলে ঢুকেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
মঞ্চে অবিকল কর্নেল মতোই দাড়ি ও টাকওয়ালা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক সবে মাইকের সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং সবিনয়ে ঘোষণা করছেন,–অধমের নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার …
আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আসল কর্নেল থাকতে নকল কর্নেল কেন রে বাবা?
ডঃ করিম এবং আরও অনেকে তো আসল কর্নেলকে চেনেন। এমনকি এই দু-তিনদিন ধরে ওঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেন। অথচ একজন উটকো লোক উঠে গিয়ে কর্নেল সেজে মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছে।
আমি হতভম্ব হয়ে সামনের দিকে সাংবাদিকদের জায়গায় আমার নির্দিষ্ট আসনে বসতে গেছি, সেই সময় আচম্বিতে একটা তুলকালাম শুরু হয়ে গেল।
প্রথমে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল। তারপর দেখলুম নকল কর্নেল মাইকের সামনে উঁচু ডেস্কটার তলায় ঢুকে পড়লেন।
তারপর চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি তাণ্ডব চলতে থাকল। মিলিটারি সেপাইদের মঞ্চ ঘিরে ফেলতে দেখলুম। ওরে বাবা! পাকিস্তানে কি আবার মিলিটারি বিপ্লব হচ্ছে তাহলে?
মঞ্চে কর্নেল কামাল খাঁকে দেখলুম। দুহাতে দুটো রিভলভার নিয়ে হেঁড়ে গলায় গর্জন করলেন,–যে-যেখানে আছেন, চুপচাপ বসে পড়ুন! আমরা আততায়ীকে পাকড়াও করেছি।
এই সময় আমার বাঁদিকের দরজার কাছে দেখতে পেলুম, সেপাইরা একটা লোককে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে আমার চেনা মনে হল। ওঃ হো! একেই তো সেদিন পার্কে ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলুম। সভা এবার অনেকটা শান্ত হয়েছে। যারা হুড়মুড় করে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেকে ফিরে এসে আসনে বসছে। বুঝলুম, এ দেশে এমন কাণ্ড যেন লোকের গা সওয়া।
কিন্তু ততক্ষণে আমি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি।
গোয়েন্দা দফতর আগেভাগে টের পেয়েছিল, কর্নেল মঞ্চে উঠলেই গুপ্তঘাতকের পাল্লায় পড়বেন। তাই নকল কর্নেল সাজিয়ে গোপনসূত্রে পাওয়া খবরের সত্যতা যাচাই করতে চেয়েছিল। বলাই বাহুল্য, সত্যিকার কর্নেলকে মঞ্চে হাজির করে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু বলিহারি সাহস ওই নকল কর্নেল ভদ্রলোকের! যদি গুলিটা লাগত!
আমি আর বসে থাকতে পারলুম না। তখুনি ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। বাইরে কোথাও কর্নেলকে দেখতে পেলুম না।
তখন একটা ট্যাক্সি ডেকে সটান হোটেলে চলে গেলুম। ইন্টারলকিং সিস্টেমের দরজা লক করা আছে। চাবি দিয়ে খুললুম। হ্যাঁ, বুড়ো ঘরেই আছেন। তবে চুপচাপ বসে নেই। টেবিলে সেই গুহার সিন্দুকে পাওয়া চাকতিটা ঘষামাজা করছেন। দুটো ছোট শিশিতে সাদা ও রঙিন তরল পদার্থ রয়েছে। একটা ছোট্ট ব্রাশ দিয়ে ব্রোঞ্জের চাকতিটা পরিষ্কার করছেন কর্নেল।
.
হিটাইট সীলমোহর
ঘরে ঢুকেই রুদ্ধশ্বাসে যা ঘটেছে বললুম। শুনে কর্নেল একটু হাসলেন। বললেন,–কিষাণচাঁদ ওরফে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী সহজে ছাড়বে না। এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে।
অবাক হয়ে বললুম,–কেন? গুপ্তধনের সিন্দুক তো খালি! মিছিমিছি আর কেন সে ঝামেলা করতে চাইছে?
কর্নেল চাকতিটা দেখিয়ে বললেন,–জয়ন্ত, ভেবেছিলুম রাজা হেহয়ের গুপ্তধন রহস্যের পর্দা এতদিন খুলতে পেরেছি। কিন্তু তার বদলে দেখছি, রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।
-বলেন কী!
–এই চাকতিটা লক্ষ করো। একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ। তাই না? আমার ধারণা, ব্রোঞ্জের এই চাকতি বা সীলমোহরটা রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে ঝোলানো ছিল। চাকতির হরফগুলোর পাঠোদ্ধার করা পণ্ডিতদের কাজ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ব্রোঞ্জের ফলকটা বা পাথরের সিন্দুকের গায়ে যে-চিত্রলিপি আমরা দেখেছি, এগুলো সেই ঢঙের চিত্রলিপি নয়। তুমি এই আতস কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখতে পার এ কিছুতেই সিন্ধুসভ্যতার চিত্রলিপি নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের।
আতস কাঁচের সাহায্যে ব্রোঞ্জের চাকতিটা দেখতে থাকলুম। হ্যাঁ, কর্নেল যা বলছেন তাই বটে।
-এই চাকতির মধ্যে দণ্ডধারী পুরুষটি নিশ্চয় রাজা। ব্রহ্মাবর্তের রাজা হেহয়। কী বলেন কর্নেল?

কর্নেল হেসে বললেন,–ব্যস! তা হলে তুমি তো পাঠোদ্ধার করেই ফেলেছ দেখছি। তোমাকে পণ্ডিতরা এবার বিদ্যাদিগগজ বাচস্পতি উপাধি দেবেন, জয়ন্ত! নাকি বিদ্যার্ণব–বিদ্যাবাগীশ, গোছের কিছু চাই তোমার?
ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম,–এটা একটা রামছাগলকে দেখান। বলবে, এই মূর্তিটা একজন রাজার। রাজার হাতে রাজদণ্ড থাকে না?
কে জানে।–বলে কর্নেল অন্যমনস্কভাবে ঘড়ি দেখলেন। তারপর হাই তুলে বললেন,– ডঃ করিম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা। তারপর বেরুব।
–কোথায় বেরুবেন? আবার ওই ঘোড়াভূতের আড্ডায় নাকি?
–হুম। কিন্তু তুমি ওকে এখনও ঘোড়াভূত বলছ কেন জয়ন্ত? বেচারী আসলে তো একজন মানুষ। রাজা হেহয়ের গুপ্তধনের লোভে এ পর্যন্ত কত মানুষ যে অমনি পাগল হয়ে গেছে, তার সংখ্যা নেই। এই হতভাগ্যের পরিচয় আর জানা সম্ভব নয়। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, সে পাগল হয়ে যাবার পর ওই এলাকার কোনো একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করছিল। আর শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ভেবেছিল, রাজা হেহয়ের সেই ঘোড়া!