তারপর সামনের দিকে ডান পাড় বরাবর লক্ষ করলুম। কিন্তু কোথায় গেল লাল পাথরটা? এ যে রীতিমতো রহস্যময় ব্যাপার! সামনে খাদ সোজা পুবে গিয়ে সিন্ধুনদে মিশেছে। পাথরের একটা প্রাকৃতিক বাঁধ দেখা যাচ্ছে শেষ সীমায়। তাই বর্ষায় এই নদের জল ঢোকার সুযোগ পায় না। তবে বৃষ্টির জল জমতে পারে। কিন্তু এই এলাকায় বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। তাই জল জমলেও তার পরিমাণ সামান্য হওয়াই সম্ভব। বুঝতে পারলুম, এজন্যেই গুহাটা নিরাপদ রয়েছে। নইলে বর্ষায় জল ঢুকে যেত। ফকির সাহেবের পক্ষে ওখানে বাস করা সম্ভবই হত না।
বাইনোকুলারে চোখ রেখেই একথা ভাবছিলুম, আমাদের কাছেই ডান পাড়ে একটা পাথরের আড়ালে কালো রঙের কী একটা বসেছিল, সরে গেল। বললুম,–কর্নেল! নেকড়ে বাঘ নিশ্চয় কালো হয় না। অথচ একটা কালো জন্তু দেখলুম যেন। এখানে কি ভাল্লুক আছে?
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন,–কোথায়, কোথায়?
–ওই যে ওখানে।
সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে উনি ওপর দিকটা তাক করে দুহাতের রিভলভার থেকে এক ঝক গুলি ছুঁড়ে বসলেন। প্রচণ্ড প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। তারপর তুলকালাম ঘটে গেল।
আমাদের বাঁদিকের পাড়ে সেই ত্রিকোণ মাঠ অন্তত একশ ফুট উঁচুতে রয়েছে। সেখানে থেকে পাঠান মিলিটারিরা গুলিবর্ষণ শুরু করে দিল। আমরা উপুড় হয়ে শুয়ে প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হলুম। কর্নেল কামাল খাঁ রেগে আগুন হয়ে গেলেন। দুর্বোধ্য ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে যখন উঠলেন, তখন সাদা বালিতে মিলিটারি পোশাক ভূতের পোশাক হয়ে উঠেছে। তারপর বিকট চিৎকার করে মাতৃভাষায় কী বললেন।
মুখ তুলে দেখি, পাড়ের উঁচুতে এক মিলিটারি পোশাক পরা মূর্তি দাঁত বের করে স্যালুট দিচ্ছে। পশ্চিম থেকে রোদ্দুর সোজা তার দাঁতে গিয়ে পড়েছে। সে এক দেখার জিনিস বটে!
বাকি তিনজন বালি ঝাড়তে ঝাড়তে উঠলুম। হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, জয়ন্ত জয়ন্ত! ওই তোমার লাল পাথর।
ঘুরে দেখে আমি হতবাক। আশ্চর্য কাণ্ড, এতক্ষণ ধরে খুঁজছি–কোথাও ছিল না। হঠাৎ যেন আলাদিনের-পিদিমের দৈত্যের মতো ওটা আমাদের নাকের ডগায় এসে ঠিক জায়গায় বসেছে। এই রহস্যের অর্থ কী?
কর্নেল গুম হয়ে যেন একথাই ভাবছিলেন। তারপর ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে ওঠার মতো বললেন,–বুঝেছি! বুঝেছি! ব্যাপারটা আর কিছু নয়–মোহেনজোদাড়োর কাক।
–কাক! তার মানে?
–ওই দেখ, কাকগুলো এখন তুমুল চাচাতে চাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওই কাকগুলো লাল পাথরটা জুড়ে বসেছিল। তাই এতক্ষণ লাল রং ঢেকে গিয়েছিল। গুলির শব্দে ভয় পেয়ে পালাতেই লাল পাথরটা বেরিয়ে পড়েছে। শুনেছিলুম বটে কাকের কথা। সিন্ধুপ্রদেশে নাকি অসংখ্য কাকের উপদ্রব আছে। বিশেষ করে নাকি মোহেজোদাড়োতে কাকের উপদ্রবটা বেশি। এবার স্বচক্ষে দেখলুম।
বললুম,–কিন্তু লাল পাথরের বিপরীত দিকের পাড়ে ফাটল থাকার কথা। কিন্তু ফাটল নেই যে!
কর্নেল বললেন,–হুম! ওই তো ফাটল। একটা কেন? সারি সারি কয়েক গজ অন্তর অজস্র ফাটল দেখতে পাচ্ছি।
এতক্ষণে গোলমালটা টের পেলুম। সকালে সূর্যের আলো পড়েছিল। পশ্চিমের পাড়ে। এই পুব পাড়টা ছিল ছায়ায় ঢাকা। তাকালে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ফাটলগুলো। কিন্তু সূর্য এখন পশ্চিমে রয়েছে। তার উজ্জ্বল কিরণ এসে পড়েছে পুব পাড়ের দেওয়ালে। সোনালি রঙের পাথরে সেই আলো ঠিকরে গিয়ে বিভ্রম সৃষ্টি করেছে। দেওয়ালটা মসৃণ বলেই রোদের প্রতিফলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
এবার খুঁটিয়ে প্রতিটি ফাটলের তলার দিকে আমার এঁকে রাখা সেই বর্গমূল চিহ্ন খুঁজতে শুরু করলুম। সাতটা ফাটলের পর যে ফাটলটা দেখলুম, তার তলায় চিহ্নটা দেখা গেল এবং আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলুম,–পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে।
প্রথমে ঢুকলুম আমি। তার পিছনে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তার পিছনে ডঃ করিম। শেষে কর্নেল কামাল খাঁ।
কর্নেল টর্চ জ্বেলে আমার কাঁধের ওপর ধরে রেখেছেন। গোলকধাঁধার পথ এটা। বাঁকে বাঁকে নটা সরু ফাটল দেখে গেছি। সেগুলো এড়িয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে গুহার মুখে পৌঁছনো গেল।
ভেতরে সকালের মতো আলো নেই। যদিও ফাটল দিয়ে ওপরের আলো টের পাওয়া যাচ্ছে। কারণ সকালে সূর্য ছিল ওদিকেই। সোজা আলো এসে ঢুকছিল। এখন সূর্য পশ্চিমে চলে গেছে।
বেদিতে পিদিম জ্বলছে না। দেখে কেমন খারাপ লাগল। ফকির সাহেবের কম্বলটা ভাজ করে রাখা আছে। ওঁর ঝোলাটাও আছে। কর্নেল কামাল খাও দুটো নিলেন। ডঃ করিম টর্চের আলোয় লিপিগুলো পরীক্ষা করে বললেন,–এই তা হলে সেই গুপ্তধন!
কর্নেল সরকার বললেন,–বেদিটা ভাঙা উচিত নয়। সেটা একটা জঘন্য অপরাধই হবে। বরং পরীক্ষা করে দেখা যাক আগে।
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, আমার কাছে ট্রেঞ্চ খোঁড়ার ছোট্ট গাইতি আছে। দরকার হবে বলে এনেছি।
–দেখছি। বলে কর্নেল সরকার বেদির চারদিক খুঁচিয়ে দেখতে থাকলেন। তারপর ওপাশে গিয়ে দুহাতে সিন্দুকের ডালা খোলার মতো হ্যাঁচকা টান দিলেন। বেদির ওপরটা নড়ে উঠল।
ডঃ করিম বললেন,–এ কী! এ যে দেখছি একটা পাথরের সিন্দুক!
সবাই মিলে হাত লাগিয়ে পাথরের ডালাটা সরানো হল। ভেতরে আলো ফেলতে দেখা গেল, কোণার দিকে দুটো বাঁকা ধূসর রঙের আট-ন-ইঞ্চি মাপের চ্যাপ্টা কী জিনিস ছাড়া আর কিছু নেই।
