কর্নেল অবাক হয়ে বললেন,–বলো কী জয়ন্ত!
–হ্যাঁ। গুহার পথ খুঁজে বের করা কঠিন। তাই গোপনে একটা চিহ্ন দিয়ে এসেছি। কর্নেল গম্ভীর মুখে কিছু ভাবলেন তারপর বললেন, তা হলে তো ফকিরসাহেব অর্থাৎ ডঃ আমেদ গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েই গিয়েছিলেন! অথচ … আশ্চর্য তো!
–কী আশ্চর্য!
–তবু উনি গুপ্তধন উদ্ধার করেননি কেন?
–হয়তো সংসারত্যাগী ফকির হয়েছেন এবং ডঃ আলুওয়ালাকে মেরে ফেলায় পাপ হয়েছে। ভেবেই নির্লোভ থাকার সাধনা করেছেন। বলেছিলেন, প্রায়শ্চিত্ত করছি।
–হুম! তোমার এ কথায় যুক্তি আছে।
–সেই স্বাভাবিক। তাই বেদির সামনে ওঁকে ধ্যানমগ্ন দেখেছি।
–ঠিক, ঠিক … বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একটু পায়চারি করে বললেন,–জয়ন্ত, আমি আসছি।
বেরিয়ে গেলেন কর্নেল। আমার শরীরের ব্যথাটা যায়নি। একটা পেনকিলার ট্যাবলেট খেয়ে নিলুম এবং শুয়ে পড়লুম। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল।…
দুপুরে লাঞ্চের সময় কর্নেল এসে আমাকে জাগালেন। তখন শরীর অনেকটা হাল্কা হয়েছে আমার।
খাওয়া-দাওয়া সেরে কর্নেল বললেন,এখনই ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁ এসে পড়বেন। ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে সেই লারকানা যেতে হয়েছিল। তোমার কথামতো কর্নেল কামালকে অনুরোধ করেছি। সম্ভবত ফকিরসাহেব মুক্তি পাবেন। তুমি চিন্তা করো না। তৈরি হয়ে নাও।
পোশাক পরে ফেললুম ঝটপট। এবার গুলিভরা রিভলভারটা নিতে ভুল করলুম না। বললুম।–দিনের আলো থাকতে-থাকতে পৌঁছানো দরকার। নইলে ফাটলের চিহ্নটা খুঁজেই পাব না।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–বোধ করি, তোমার চিহ্নের আর দরকার হবে না। কারণ ফকিরসাহেবকে কর্নেল কামাল সঙ্গে আনার চেষ্টা করবেন। নিজের গোপন আস্তানা চিনতে ওঁর ভুল হবে না আশা করি।
আমার মনে যেটুকু গর্ব ছিল, মিইয়ে গেল। মনে মনে কামনা করলুম, ফকিরসাহেব যেন কিছুতেই না আসেন। তা হলে আমাকেই সাধাসাধি করিয়ে ছাড়বে। এতকাল কর্নেল সব রহস্যে চাবিকাঠিটি নিজের হাতে রেখেছেন। এবার চাবিকাঠি আমি ভাগক্রমে হাতিয়েছি। এমন মওকা ছাড়ব কেন?
কিছুক্ষণ পরে জিপের শব্দ হল বাইরে। আমরা বেরিয়ে গেলুম।..
জিপে যেতে-যেতে ওঁদের যে আলোচনা হল, তাতে বুঝলুম কর্নেল কামাল খায়ের বাহিনীটি বেশ বড়। একদল দুপুরে গিয়েই সেই শুকনো খাদের মাথায় ত্রিকোণ মাঠটা ঘিরে রেখেছে। পাথরের আড়ালে ওৎ পেতে সৈনিকেরা লক্ষও রেখেছে। সৈনিকগুলো নাকি একেবারে কসাই। কিষাণচাঁদের দলের লোকেদের পেলেই গলায় ছুরি চালিয়ে কোতল করবে। বেছে-বেছে কাঠখোট্টা ধরনের হিংস্র পাঠানদেরই মোতায়েন করা হয়েছে। কাজেই কিষাণচাঁদ আর সুবিধে করতে পারবে না আজ। একেই বলে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। আগের দিন যেখানে জিপ রেখে আমরা খাদে নেমেছিলুম, সেইখানেই নামলুম। যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল, খাদের ওপরে উঁচুতে পাথরের আড়ালে মিলিটারি পাঠান সাবমেশিনগান বাগিয়ে বসে আছে। এ যে প্রায় যুদ্ধের আয়োজন।
বুঝলুম, কর্নেল কামাল খাঁ কাল সন্ধ্যায় কিষাণচাঁদের দলের হাতে ইটটি খেয়ে ভারি রেগে গেছেন এবং তার শোধটা ভালোমতো তুলবেন।
বেচারি মিঃ আলুওয়ালার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছিল। অধ্যাপক এবং পণ্ডিত মানুষ। অথচ গুপ্তধনের নেশায় পড়ে এমন সর্বনাশের পথে ছুটে বেড়াচ্ছেন কতদিন থেকে!
ব্রহ্মবৰ্তরাজ হেহয়ের গুপ্তধন যে অভিশপ্ত তাতে কোনো ভুল নেই। সেই অভিশাপের জন্যেই মানুষ হয়ে পড়েছে ষড়যন্ত্রী শয়তান।
যাচ্ছি তো যাচ্ছি, খাদের যেন শেষ নেই। বাঁক ঘুরে পুবে এগিয়ে সেই গুহা। কিন্তু অবাক কাণ্ড, ঠিক সেই জায়গাটা আমি চিনতে পারছিনে কেন? কর্নেল বারবার জিজ্ঞেস করছেন। আমি বাঁদিকে খাড়া দেওয়ালের মতো পাড়ে ফাটল খুঁজছি। এখানে কোথাও ফাটল নেই। তা হলে কি বেশি এগিয়ে এসেছি?
মনে পড়ছে, বাঁকের পরই বাঁদিকে ফাটল শুরু হবার কথা। অজস্র ফাটল পাথুরে পাড়ে তখন লক্ষ করেছিলুম। কিন্তু কই সেগুলো?
এবার কর্নেল মুচকি হেসে বললেন,–জয়ন্ত সব গুলিয়ে ফেলেছে। তা হলে এবার আমরা নিজেদের বুদ্ধির ওপর ভরসা করে খুঁজি। কী বলেন ডঃ করিম?
ডঃ করিম বললেন,–অগত্যা তাই।
কর্নেল কামাল খাঁ আমাদের দেহরক্ষীর মতো দুহাতে দুটো রিভলভার বাড়িয়ে সাবধানে চারিদিকে দেখতে দেখতে পিছনে আসছিলেন। বললেন,–কী হল?
কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত পথ হারিয়েছে।
একেই বলে পিলে চমকানো হাসি। এক কর্নেলের কথা শুনে আরেক কর্নেল যা একখানা হাসলেন, এই খাদের মধ্যে যেন মেঘ ডাকল।
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ও ডঃ করিম বালির দিকে ঝুঁকে বোধকরি আমারই সকালবেলার জুতোর ছাপগুলো খুঁজছেন। কিন্তু খাদের মধ্যে প্রবলবেগে বাতাস বইছে। শুকনো বালি উড়ছে। ছাপ ঢেকে গেছে সম্ভবত।
হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, গুহার ফাটল দিয়ে বেরিয়ে খাদের ওপারে প্রথমেই চোখে পড়েছিল একটা বিরাট লাল পাথর। এখানে কোথাও অমন লাল পাথর না থাকায় ওটা চোখে না পড়ে পারে না। কথাটা বললুম ওঁদের। ওঁরা খুঁজতে ব্যস্ত হলেন।
আমি ডানদিকের পাড়ে পাথরগুলো ভালো করে দেখার জন্যে কর্নেলের কাছে বাইনোকুলার নিলুম। প্রথমে পিছনের দিকে অর্থাৎ যেদিক থেকে এসেছি,সেদিকে ডান পাড়টা খুঁটিয়ে দেখলুম। কোনো লাল পাথর নেই কোথাও। অন্তত মাইলখানেক দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
