বললুম—তাহলে পুরো দশাবতার হাতালেই পারত বনবিহারী। কেন শুধু নৃসিংহ মুর্তির অংশটা খুবলে তুলে নিয়েছে?
কর্নেল বললেন—আরেগোনা ধূর্ত। সে দশাবতার চেনে। পুরো ফলকটা দেখলে তার সন্দেহ হবে যে এটা সাধারণ একটা দশাবতার ফলক। নৃসিংহ মূর্তিটা আলাদা থাকলে অন্য অর্থ দাঁড়ায় না কি? তখন একটা নৃসিংহের পুরাতাত্ত্বিক তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। বুঝেছ?
বললুম—তাহলে প্রাচীন শল্য চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যাপারটা বনবিহারীর গুল?
কর্নেল জবাব দিলেন—স্রেফ গুল। পরমেশবাবু প্রাণীটাকে গরিলা বললেন। হ্যাঁ, আমার মনে পড়ছে, ওইরকম একটা প্রাণীর কথা আমি একটা বইয়ে পড়েছিলুম বটে।
কথা বলতে বলতে আমরা সেই নারকেল বনটার কাছে নেমে গেলুম। আর পথ চিনতে কোনও ভুল হল না।
ক্যাম্পে গিয়ে একেবারে সটান গড়িয়ে পড়লুম ক্যাম্পখাটের ওপর। শরীর ভীষণ ক্লান্ত।…
বনবিহারী বনাম আরেগোনা
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, তখন প্রায় দুটো বাজে, কর্নেল ও ডঃ গুটেনবার্গ ইয়া মোটা নাইলনের রশিটা গোছাতে শুরু করলেন। ব্যাপার কী? গরিলাটাকে বেঁধে ফেলা হবে বুঝি? কিন্তু আনা হবে কীভাবে, বুঝতে পারলুম না। পরমেশবাবু খুঁতখুঁতে গলায় বললেন—ওর গায়ে অসম্ভব জোর আছে।
কর্নেল বললেন—গায়ের জোরে কিছু হয় না, ডঃ পুরকায়স্থ! আপনি তো প্রাণী বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ। আপনি তো জানেন, আসল জোরটা মস্তিষ্কের। সেই জোর আছে বলেই মানুষ টিকে
থেকে সব জোরওয়ালা প্রাণীর ওপর প্রভুত্ব করছে।
কিন্তু ওকে আনবেন কেমন করে?
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—আষ্টেপৃষ্ঠে এই দড়ি জড়িয়ে ওকে মমির মতো লম্বা করে ফেলব এবং তার আগে একটা ঘুমের ইঞ্জেকশন অবশ্যই দেব।
তারপর? ওটার ওজন তো কমপক্ষে দুই কুইন্টালের কম নয়।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন—চারজনের ভাগে কত ওজন পড়বে? মাথা পিছু পঞ্চাশ কিলোগ্রাম। কি জয়ন্ত? খুব বেশি ওজন কি? তবে ভেব না। স্ট্রেচার বানিয়ে নেব। জঙ্গলে প্রচুর
কাঠ আছে।
পাহাড়ি ঢাল বেয়ে এই প্রকাণ্ড প্রাণী মড়ার মতো খাটে বয়ে আনার কথা ভেবে মোটেও স্বস্তি পেলুম না।
আমার মনের কথা যেন আঁচ করে কর্নেল আরও হেসে বললেন-জয়ন্ত! পাহাড়ে চড়ার চেয়ে নামা সোজা। ভাবনার কারণ নেই ডার্লিং। স্ট্রেচারে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নামানো অতি সরল ব্যাপার। না, না—সত্যি সত্যি তোমায় কাঁধে করে বইতে হবে না। টোরাদ্বীপের এটাই মজা।
একটু পরে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লুম আগের পথে। চড়াই ভেঙে পিঠে রোদ নিয়ে উঠতে কষ্ট যা হওয়ার হচ্ছিল। কিন্তু উপায় নেই। ক্যাম্পে আর একা থাকার সাহস আমার নেই—নইলে বরং একটা ঘুম দিয়ে নিতুম।
ফাঁদের গর্ত যেখানে, তার কাছাকাছি একটা পাথরের দেয়াল খাড়া উঠে গেছে।
দেয়ালের নিচে ঝোপ জঙ্গল ঘন হয়ে আছে। যেই সেখানে পৌঁছেছি, হঠাৎ ঝোপ থেকে চারটে বেঁটে মিলিটারি পোশাকপরা তোক সামনে লাফ দিয়ে দাঁড়াল।
প্রত্যেকের হাতে স্টেনগান বা রাইফেল। চোখে সানগ্লাস। মাথায় গোল টুপি। সেই লোকদুটোও রয়েছে ওদের মধ্যে যারা আমাকে হেনস্থা করেছিল।
আমাদের সঙ্গে রাইফেল আছে। কিন্তু কর্নেল সঙ্গে সঙ্গে চাপা গলায় বললেন—বাধা দিও না।
সেই বাইনোকুলারধারী একটু হেসে ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে বলল—ডঃ পরমেশ কে?
পরমেশ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন—আমি।
লোকটা এগিয়ে এসে বলল—আমরা বন্ধু। কারও কোন ক্ষতি করতে চাইনে। আপনারা অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে আসুন। দলপতি আপনাদের সাক্ষাৎপ্রার্থী। বিশেষ করে ডঃ পরমেশের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান।
আমরা ওকে অনুসরণ করলুম। পিছনে তিনজন অস্ত্র তাক করে আসতে থাকল। খুব অপমানজনক অবস্থা। কিন্তু এখন লড়াই করা মানে অকারণ প্রাণটি খোয়ানো।
কিছুটা যাওয়ার পর একটা সুড়ঙ্গপথে আমাদের ঢুকতে হল। ঘন অন্ধকার। ওরা সামনে ও পেছনে টর্চ জ্বেলে আমাদের নিয়ে চলল।
এই সময় অবাক হয়ে দেখলুম, আমরা একটা সুড়ঙ্গপথে সেই ফাঁদের গর্তের তলায় এসে গেছি। ফাঁদে আটকানো গরিলাটা এখনও তেমনি ঘুমিয়ে আছে।
আর একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা মোটা গা-গোব্দা লোক। তার চুল সাদা। কিন্তু মুখে দাড়ি গোঁফ নেই। থ্যাবড়া নাক। সে আমাদের দেখে চমৎকার হিন্দিতে বলে উঠল আইয়ে, আইয়ে! হাম আপলোগোঁকা ইন্তেজার কর রাহা। লেকিন হেঁয়াপর বইঠনেকা জায়গা নেহি হ্যায়। মাপ কিজিয়ে!
অন্য পাশে কাঁচুমাচু মুখে বসে আছে সেই জাল ডঃ গড়গড়ি—ওরফে বনবিহারী।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে বললেন—হ্যালো মিঃ টংকু আরেগোনা!
আরেগোনা হঠাৎ লাফিয়ে উঠে হাত বাড়াল-হ্যালো কর্নেল-সাহাব! কেতনা বরষ বাদ আপকা সাথ মিত্তা হ্যায়।
কিছুক্ষণ এইসব সম্ভাষণ ও আলাপ হল। তারপর আরেগোনা বলল- ডঃ পরমেশ কে?
পরমেশবাবু বললেন—আমি।
আরেগোনা তাঁকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল—আরে পুরকায়স্থ সাহেব। আপনার বাবা মেজর সাহেবের সঙ্গে আমার দোস্তি ছিল। উনি যখন সিঙ্গাপুরে ছিলেন, তখন খুব ভাব ছিল আমাদের। তো এবার কাজের কথাটা সেরে নিই।
বলে আরেগোনা বনবিহারীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে শুরু করল—এই লোকটা আমাকে ধাপ্পা দিচ্ছে, না সত্যি কথা বলছে আমি এখনও জানি না। ও আমাকে একটা পাঁচ হাজার বছরের পুরনো মূর্তি বেচতে চায়। সেই মূর্তির গায়ে নাকি সাংকেতিক ভাষায় লেখা আছে…
পরমেশবাবু বাধা দিয়ে বললেন-স্রেফ মিথ্যে কথা। ওটা একটা দশাবতার ফলক থেকে খুবলে নেওয়া মূর্তি। আমার বাবা ফলকটা এই দ্বীপে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।
