কর্নেলের দিকে ঘুরে বললুম,–ওই ফকির কিন্তু বাঙালি এবং রীতিমতো শিক্ষিত লোক। কর্নেল বললেন,–জানি বৎস! তবে তুমি কি ওঁর আসল পরিচয় টের পেয়েছ?
-না তো। কে উনি?
-উনি এক প্রখ্যাত বাঙালি পুরাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ ফরিদ আমেদ! একসময় কলকাতার পুরাতত্ত্ব দফতরের অধিকর্তা ছিলেন। অজন্তা, ইলোরা এবং সিন্ধুসভ্যতার ওপর ওঁর মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থগুলো দেশ-বিদেশে এখনও সমাদৃত হয়। দেশভাগের পর উনি চলে যান প্রাক্তন পূর্বপাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশে। সেখানে রিটায়ার করার পর দিব্যি ছিলেন। হঠাৎ লন্ডনে একটা সেমিনারে আমন্ত্রিত হন এবং সেখানে গিয়ে জাদুঘরে একটা ব্রোঞ্জের ফলক দেখতে পান।
-রাজা হেহয়ের আসল ফলকটা তো?
-ঠিক বলেছ। ওই হল ওঁর কাল। অভিশপ্ত ফলক বলতে পার। ফিরে এসে ফলকের পাঠোদ্ধারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সে এক দীর্ঘ কাহিনি। সংক্ষেপেই বলছি। বর্ধমানের গ্রামে ডঃ ভট্টাচার্যের ছেলে সেই শিক্ষক ভদ্রলোকের কাছেও উনি অনেকবার যাতায়াত করেছিলেন। কারণ ডঃ ভট্টাচার্যের বইয়ে ফলকটার উল্লেখ ছিল। শেষপর্যন্ত ওঁর ডায়েরিটা দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ডঃ আমেদ। নিজের অনুবাদের সঙ্গে ডঃ ভট্টাচার্যের অনুবাদের মিল দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারেন নি। নাম ভাঁড়িয়ে ভারতের নাগরিক সেজেই উনি পাসপোর্ট-ভিসা জোগাড় করেন।
আবার একপ্রস্থ কফি এল। আমার ব্রেকফাস্টও এসে গেল। খেতে-খেতে বললুম,–তারপর কী হল বলুন?
কর্নেল বললেন,–ডঃ আমেদ একটা ভুল করলেন। ডঃ ভট্টাচার্যের ডায়েরিতে লারকানার স্টেশন মাস্টার মিঃ আলুওয়ালার উল্লেখ ছিল। তাঁর ছেলে ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে ডঃ আমেদের অল্প চেনাজানা ছিল। একা মোহেনজোদাড়ো অভিযানে যেতে সাহস করেন নি। ডঃ আলুওয়ালাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডাঃ আলুওয়ালা পণ্ডিত মানুষ হলে কী হবে? ভীষণ পাজি লোক। যাবার আগে ষড়যন্ত্র করেন যে গুপ্তধন পেলে ডঃ আমেদকে মেরে ফেলা হবে। তাই এক আন্তজাতিক ডাকতদলের সর্দার কিষাণাদের সাহায্য নিলেন। কিষাণচাঁদ পণ্ডিত সাজলো। নাম নিল ডঃ ব্রীজেশ সিং। ডঃ আমেদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে সঙ্গে নিতে বাধ্য হলেন। যাইহোক, ডঃ আমেদ একটা কাজ কিন্তু করেছিলেন, ফলকের প্রকৃত অনুবাদের কথা সঙ্গীদের জানান নি। এখানে এসে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেন তিনজনে। তারপর একরাতে তিনজনে কী একটা কথায় নাকি তুমুল ঝগড়া বেধে যায়। রাগের চোটে ডঃ আমেদ খাদের ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ডঃ আলুওয়ালাকে ফেলে দেন। কিষাণচাঁদ তাকে আক্রমণ করে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওই সময় একদন মিলিটারি টহলদার দূর থেকে সার্চলাইট ফেলেছিল। নেহাত রুটিন মাফিক ঘোরাঘুরি করছিল ওরা। এর ফলে কিষাণচাঁদ পালিয়ে যায়। ডঃ আমেদ লুকিয়ে পড়েন। সকালে খাদে নেমে একজায়গায় রক্ত দেখে ওঁর অনুতাপ জাগে। ভাবেন, নির্ঘাত ডঃ আলুওয়ালা এখানে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন এবং নেকড়েরা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলেছে। ধর্মভীরু ডঃ আমেদের অনুশোচনা তীব্র হয়ে ওঠে ক্রমশ। দিনের পর দিন পাপবোধে অস্থির হয়ে ওঠেন। তারপর ফকিরী অবলম্বন করেন। তারপর থেকে ওইভাবে থেকে গেছেন।
–এসব কথা কি উনিই বলেছেন আপনাকে?
আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন কর্নেল কামাল খাঁ। –মিঃ চৌধুরী, দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ফকিরসাহেব ওরফে ডঃ আমেদকে আমি গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছি। জেরার চোটে উনি সব কবুল করেছেন।
চমকে উঠলুম।–গ্রেফতার করেছেন? কেন?
–প্রথম কথা উনি নাম ভঁড়িয়ে ভিসা জোগাড় করেছিলেন। পরে আমার গোয়েন্দা দফতর সেটা টের পেয়ে ওঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এটা দুবছর আগের ঘটনা। দ্বিতীয় কথা, উনি বে-আইনিভাবে গুপ্তধন খোঁজাখুঁজি করছেন। আমরা কিষাণ সিং এবং ডঃ আলুওয়ালাকেও গ্রেফতার করার জন্যে প্রস্তুত ছিলুম। কিন্তু ব্যাপারটা টের পেয়েই দুজনে গা ঢাকা দিয়েছে।
কর্নেল সরকার বললেন,–কিষাণ সিং কে জানো? তুমি প্লেনে যে ভদ্রলোকের পাশে বসে এসেছ–সেই জাল ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী!
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন,–গা ঢাকা দিয়ে দুজনে দলবল নিয়ে ওই এলাকায় লুকিয়ে আছে। ওদের অস্ত্রশস্ত্র আছে প্রচুর। কিষাণ সিং-এর লোকেরা তো ওখানে বরাবর রয়ে গেছে। কোনো গুহায় আস্তানা গেড়েছে। খুঁজে বের করতেই হবে।
বললুম,–ফকিরসাহেব কোথায় এখন?
–আপাতত লারকানায় হাজতে পাঠিয়ে দিয়েছি।
শুনে খুব দুঃখ হল। কিন্তু এদেশে মিলিটারি আইন। কিছু করার নেই।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে কর্নেল কামাল খাঁ এবং ডঃ করিম চলে গেলেন। কর্নেলকে বললুম,–হ্যালো ওল্ড ম্যান। ফকিরসাহেবের কাছে কী শুনেছেন জানি না। আমার ব্যাপারটা এবার আপনার শোনা দরকার। আমি গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছি।
কর্নেল চমকে উঠলেন–সে কী? কোথায়? কীভাবে পেলে?
–বলব। একটা শর্ত।
–কী শর্ত?
–কথা দিন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা দফতরের অধিকর্তা এবং আপনার বন্ধু ওই কর্নেল কামাল খাকে বলে ফরিকসাহেবের মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–চেষ্টা করতে পারি।
–চেষ্টা নয়, করতেই হবে। কামাল খাঁর হাতে প্রচুর ক্ষমতা!
–ঠিক আছে। এবার বলো?
–ফকিরসাহেব যে গুহায় থাকেন এবং আমি যেখানে আশ্রয় পেয়েছিলুম, সেখানে একটা বেদি আছে। তার গায়ে অবিকল সেই ফলকের চিত্রলিপি খোদাই করা আছে।
