তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
ফকিরের ডাকে ঘুম ভাঙলে তাকিয়ে দেখি মাথার ওপর একটা ফাটল দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে গুহায় ঢুকেছে। গুহার ভেতর অন্ধকার নেই।
উঠতে গিয়ে টের পেলুম, এবার হেঁটে অতখানি পথ যাওয়া ভারি কষ্টকর হবে। কিন্তু উপায় নেই।
ফকির সস্নেহে জিজ্ঞেস করলেন,–শরীর কেমন বাবা? হেঁটে যেতে পারবে তো?
একটু হেসে বললুম,–দেখা যাক।
–যদি না পার, থেকে যাও। তোমার সেবাযত্নের ত্রুটি হবে না।
–না ফকিরসায়েব, আমাকে যেতেই হবে।
–তা হলে এসো।
ফকিরের সাহায্যে আস্তে-আস্তে উঠে বসলুম। নিচু খাদ। ফকির আগে, আমি পেছনে সাবধানে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকলুম।
সত্যি এ একটা গোলকধাঁধা। ঘুরে-ঘুরে পথটা অন্ধকারে এগিয়েছে। আমি বাঁকগুলো গুনতে থাকলুম। নটা বাঁকের পর অন্ধকার ঘুচল। কিন্তু টের পেয়ে গেছি, এই সুড়ঙ্গ পথের আরও অনেক শাখাপথ আছে। তবে সেই পথগুলো আরও ঘুপটি। কাজেই ভুল হবার চান্স নেই।
আবছা আলোর মধ্যে চলার সময় হাত বাড়িয়ে ফকিরের অজান্তে একটুকরো পাথর কুড়িয়ে নিলুম। কিছুক্ষণ পরে ফাটলের মুখে পৌঁছনো গেল। ফকির বেরিয়ে গিয়ে ডাকলেন–এসো বাবা!
সেই সময় দ্রুত পাথরের টুকরোটা দিয়ে ফাটলের নীচে একটা বর্গমূল নির্ণয়ের চিহ্নের মতো চিহ্ন দিলুম।
ফাটলটা মোটে ফুট দেড়েক চওড়া, কিন্তু অনেকখানি লম্বা। অতিকষ্টে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, সেই খাদে পৌঁছেছি। খাদটা বালি আর পাথরে ভর্তি। দুধারে খাড়া পাথরের দেওয়াল। ফকির ফের জিজ্ঞেস করলেন,–কষ্ট হচ্ছে কি হাঁটতে?
বললুম,–না।
–আমি কিন্তু বেশি দূর যেতে পারব না। তোমাকে মোহেনজোদাড়ের প্রটেক্টেড এরিয়ার কাছে পোঁছে দিয়ে আসব।
ফকিরের মুখে ইংরেজি শব্দটা শুনে চমকে উঠলাম। উচ্চারণও নিখুঁত। তা হলে কে এই ফকির? বললুম,–আপনি নিজের কোনো পরিচয়ই দিলেন না ফকিরসায়েব।
ফকির একটু হেসে বললেন,–কী হবে পরিচয় জেনে? পরিচয় বলতে আজ আর কি আছে আমার? ঈশ্বরের ধ্যানে কাটাচ্ছি। যেকটা দিন বাঁচব ঈশ্বরের ধ্যানেই কাটাব। বাবা, আমার মতো পাপী আর কে আছে? এ সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত!
–পাপী কেন বলছেন আপনি?
–হ্যাঁ বাবা, আমি মহাপাপী। একদিন আমিও মোহেনজোদাড়োর গুপ্তধনের লোভে পাগল হয়ে উঠেছিলুম। গুপ্তধনের লোভ বড় সাংঘাতিক বাবা! এই লোভেই আমার এক প্রাণের বন্ধুকে খুন করেছিলুম!
বলে ফকির দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আমি হতবাক।
পরক্ষণেই উনি সংযত হয়ে চোখ মুছলেন জোব্বায়। তারপর বললেন,–চলো বাবা! এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।
বাকি পথ আমরা দুজনেই চুপচাপ এলুম। মাইলখানেক চলার পর দেখা গেল, একখানে খাদের দুধারেই ঝোঁপঝাঁপ গাছপালা দেখা যাচ্ছে। পাথরও বিশেষ নেই। দুধারে পাড় অনেক ঢালু। ফকির বললেন,–বাঁ পাড়ে উঠে গেলেই আশা করি চিনতে পারবে।
আমি কৃতজ্ঞতায় ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে এগিয়ে গেলুম। এক সময় পাড়ে উঠে পিছু ফিরে দেখি ফকির দ্রুত চলেছেন খাদের পথে। একবারও ওঁকে পিছু ফিরতে দেখলুম। না। কিন্তু কে এই ফকির? …
.
ঘোড়াভূত ও ডঃ আলুওয়ালা
টুরিস্ট ম্যানেজার ইকবাল খাঁ আমাকে দেখেই দৌড়ে এলেন। বললেন,–কী ব্যাপার মিঃ চৌধুরী? আপনার এ দশা কেন? কোথায় ছিলেন সারারাত? আমরা তো ভেবেই অস্থির। আপনার কর্নেল সাহেব আবার সকালে আপনাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। ডঃ করিম আর কর্নেল কামালও গেছেন একদল মিলিটারি নিয়ে।
–মিলিটারি নিয়ে? সে কী?
ইকবাল খাঁ হাসলেন। এ দেশে মিলিটারি ছাড়া দুশমনদের জব্দ করা যায় না মিঃ চৌধুরী। আমরা কথায় কথায় মিলিটারির সাহায্য নিই। যাকগে, ঝটপট পোশাক বদলান। আমি খবর পাঠাই ওঁদের।
আমাদের ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি ওঁর কাছে রয়েছে। দরজা খুলে দিলেন। বেয়ারা হুকুমের অপেক্ষায় সেলাম দিয়ে দাঁড়ালে বললুম,–আপাতত এককাপ কড়া কফি ছাড়া আর কিছু দরকার হবে না।
–ব্রেকফাস্ট খাবেন না স্যার?
–ওঁরা ফিরে আসুন, তারপর।
বেয়ারা চলে গেল। একটা এনার্জি ট্যাবলেট বের করে খেয়ে ফেললুম। তারপর বাথরুমে পোশাক ছাড়লুম। স্নান করে এসে দেখি, কফি রেডি।
জানালার কাছে বসে কফি খেতে খেতে মোহেনজোদাড়ো শহরের দিকে তাকিয়ে রইলুম। কী বিচিত্র মানুষের অতীত ইতিহাস!
অনেকক্ষণ পরে বাইরে জিপের শব্দ হল। তারপর দুমদাম জুতোর শব্দ শোনা গেল বারান্দায়। প্রথমে ঢুকলেন কর্নেল কামাল খাঁ। দৈত্যাকৃতি পাঠান ভদ্রলোক এক লাফে এগিয়ে আমাকে প্রায় শুন্যে তুলে ফেললেন। মুখে শুধু-হ্যাল্লো, হ্যাল্লো!
ডঃ করিম বললেন,–তবিয়ত ঠিক আছে তো জয়ন্তবাবু?
বললুম,–হাঁ, ঠিক আছে।
আমার বৃদ্ধ বন্ধু টাকে হাত বুলোচ্ছেন এবং মিটমিট হাসছেন। টুপিটা বগলদাবা। গলায় বাইনোকুলার ও ক্যামেরা যথারীতি ঝুলছে। বললেন,আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে ডার্লিং! হবারই কথা। ফকিরসাহেব অতি দয়ালু এবং স্নেহপ্রবণ মানুষ।
চমকে উঠে বললুম,ফকিরসাহেবের কথা আপনি কীভাবে জানলেন?
তিনজনেই অট্টহাস্য করে উঠলেন। তারপর কর্নেল বললেন, এটা কোনো অলৌকিক উপায়ে অবগত হইনি আমরা। কারণ আমরা ফকির নই। সাধারণ মানুষ মাত্র।
বিরক্ত হয়ে বললুম, হেঁয়ালি করার দরকার কী?
ডঃ করিম বললেন,–একটা হেঁয়ালি বোধহয় আছে জয়ন্তবাবু। আপনাকে রাতে বিশেষ খোঁজাখুঁজি করতে পারিনি, সেজন্য ক্ষমা করবেন। অন্ধকার ওই এলাকায় গেলে আবার দুশমনগুলোর সঙ্গে অকারণ গুলি ছোঁড়াছুড়ি করতে হত। তাই সকালে বেরিয়ে পড়েছিলুম। খাদ বরাবর সিন্ধুনদ পর্যন্ত এগিয়ে ব্যর্থ হয়ে যখন ফিরে আসছি, একস্থানে আপনার বন্ধু বালিতে আপনার জুতোর ছাপ আবিষ্কার করলেন। ছাপ ক্রমশ উত্তর-পশ্চিমে এগিয়েছে। তার মানে, বোঝ গেল আপনি ফিরে চলেছেন। একটা বাঁক পেরিয়ে দেখি একজন ফকির হন্তদন্ত হয়ে আসছেন। আমাদের তিনি দেখেই পাড়ের দেওয়ালের খাঁজে লুকিয়ে পড়লেন। কর্নেল কামাল খাঁ তার বাহিনী নিয়ে দৌড়ে গিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেললেন। গুলি ছোঁড়ার ভয় দেখালে ফকিরসাহেব বেরিয়ে এলেন। তার মুখেই আপনার খবর পাওয়া গেল।
