ফকিরের এসব কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। বললুম,–এবার আপনার কথা বলুন।
–আমার কথা কী বলব বাবা? বললুমই তো, আমি সংসারত্যাগী মানুষ।
–কিন্তু আপনি বাঙালি বলেই আমার সব কিছু জানতে ইচ্ছে করছে।
–জেনে কী হবে? তার চেয়ে এখন তোমার বিশ্রাম জরুরি। এ গরিবের আখড়ায় তোমার খুব কষ্ট হবে, জানি। কিন্তু উপায় কী? অল্প কিছু ফল আছে। খেয়ে নাও। কুঁজোয় জল আছে। খেয়েদের শুয়ে পড়ো। কম্বলও পাবে।
–জায়গাটা কোথায় বলুন! আমি বরং ট্যুরিস্ট লজে ফিরে যাব তা হলে।
–সর্বনাশ! সর্বনাশ। খবর্দার বাবা, এখন গুহা থেকে বেরুলেই বিপদে পড়বে।
–কেন বলুন তো?
ফকির গম্ভীর হয়ে বললেন, সম্প্রতি কিছুকাল থেকে গুণ্ডাপ্রকৃতির কিছু লোক ওপরের দিকে একটা গুহায় আস্তানা গেড়েছে। তাদের কাছে প্রচুর গুলিবারুদ অস্ত্রশস্ত্রও আছে। মাঝে-মাঝে দেখি, তারা এখানে-ওখানে মাটি খোঁড়াখুড়ি করছে। পাথরের আড়াল থেকে ওদের গতিবিধি লক্ষ করেছি। আমার ধারণা, ওরা গুপ্তধন খুঁজছে। যদি বৈদাৎ ওদের পাল্লায় পড়ে যাও, খুন হয়ে যাবে। কারণ ওদের খরব কেউ জানুক, এটা ওরা চায় না। একদিন আমি তো গুলিতে মরতে-মরতে বেঁচে গেছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার এই আস্তানার খবর ওরা জানে না।
আজ সন্ধ্যায় যা ঘটেছে, ফকিরকে বলব ভাবলুম। পরে মনে হল, কী দরকার? ফকির হয়তো আরও ভয় পেয়ে যাবেন এবং আমাকে পাল্টা আরেকটা গুপ্তধন সন্ধানী দলের লোক ভেবে বসবেন।
বললুম,–অন্তত একটা কথার জবাব দিন। এই গুহাটা ট্যুরিস্ট লজ থেকে কত দূরে?
–তা মাইল পাঁচেকের বেশি তো হবেই। তবে গুহাটা খাদের ধারেই। একবার বেরিয়ে গেলে কিন্তু আর খুঁজে এখানে ঢোকা মুশকিল। এটাই এ গুহার মজা!
–কেন?
–সে স্বচক্ষে সকালে দেখবে’খন। এটা একটা গোলকধাঁধার মতো। খাদের পাশে দেওয়ালের মতো এবড়োখেবড়ো পাথরে অজস্র ফাটল আছে। কোন ফাটল দিয়ে ঢুকলে এ গুহায় পৌঁছানো যাবে, বোঝা মুশকিল। আমারও মাঝে-মাঝে গণ্ডগোল হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা। ভুল ফাটলের মধ্যে ঢুকে হয়রান হই। প্রত্যেকটা ফাটলই তলায়-তলায় সুড়ঙ্গের মতো গলিখুঁজি ঘরে গিয়ে শেষ হয়েছে। শুধু একটা ফাটলের পথ এ গুহায় পৌঁছেছে। সেই ফাটলে অবশ্য একটা চিহ্ন দিয়ে রেখেছি। অন্যের চোখে পড়া মুশকিল। ওটা শুধু আমিই চিনতে পারি।… বলে ফকির বেদির ওপর রাখা একটা ঝোলা থেকে দুটো আপেল বের করলেন। তারপর বললেন,–নাও। খেয়ে ফেলল। অনেক রাত হয়েছে। আমার এখন ধ্যানে বসার সময়। দয়া করে আর আমাকে ডাকাডাকি কোরো না। আর এই কম্বলটা রইল। গুহার মধ্যে শীত তত টের পাবে না। শুয়ে পড়বে চুপচাপ।
কী আর করি, একটা আপেলে কামড় বসালুম। খিদেয় পেট চোর্চো করছে। মাটির কুঁজো থেকে জলও খেলুম। তারপর নগ্ন পাথরের মেঝেয় শুয়ে পড়লুম। কম্বলটা দরকার হল না। ওই একটা মোটা কম্বল। ফকিরের কম্বলে আর ভাগ বসাই কেন? ফকির আবার চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়েছেন ততক্ষণে।
যাক গে, রাতের আশ্রয় পেয়েছি এবং মামদো ভূতের–উঁহু, ঘোড়াভূতের হাত থেকে বেঁচে গেছি, এই পরম সৌভাগ্য।
হঠাৎ মনে পড়ল, কর্নেল বলেছিলেন মোহেনজোদাড়োর ঘোড়াভূতের কথা। তা হলে তো এই সেই ঘোড়াভূত! ওর বিকট হাসির মতো হি হি করে ওঠাটা এখনও কানে ভাসছে।
কিন্তু কে ও? বেঁচেবর্তে ট্যুরিস্ট লজে ফিরতে পারলে কর্নেলকে সব জানাতে হবে। তারপর এই রহস্যের কিনারা করতেই হবে।
এইসব ভাবতে-ভাবতে আর ঘুমই এল না। তার ওপর সারা শরীরে ব্যথা। কেটে ছড়ে গেছে অনেক জায়গায়। জ্বরজ্বালা না এলে বাঁচি। একটু পরে পাশ ফিরে দেখলুম ফকির একইভাবে ধ্যানস্থ। পাশ দিয়ে বেদিটা দেখা যাচ্ছে।
বেদিটার কিছু অংশে আলো পড়েছে। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলুম বেদির গায়ে অজস্র খোদাই করা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। অবিকল সিন্ধুলিপির মতো।
মতোই বা বলছি কেন? এখানে সিন্ধুলিপিই তো স্বাভাবিক। তা হলে এই বেদিটা নিশ্চয় সিন্ধুসভ্যতার সমকালীন।
চঞ্চল হয়ে উঠলুম। তা হলে তো আমি এযাবৎ অনাবিষ্কৃত একটা প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করে ফেলেছি?
কিন্তু ওই বেদিটা কীসের? নিছক পুজো-আচ্চার বেদি-নাকি ওটা একটা কবর? সিন্ধুসভ্যতার কবরও পাওয়া গেছে অনেকগুলো। তখন যেমন মড়া পোড়ানো হত, তেমনি কবরও দেওয়া হত। হরপ্পাতে কয়েকটা কঙ্কালও পাওয়া গেছে। মাটির জালায় সেগুলো ঠেসে ভরা ছিল। কর্নেলের কাছেই তো শুনেছি এসব কথা।
সাবধানে মুখটা একটু বাড়িয়ে লিপিগুলো ভালো করে দেখার চেষ্টা করলুম। তারপর আবার চমকে উঠলুম।
এ কী দেখছি? ডঃ আলুওয়ালার যে ফলকের স্কেচ কর্নেল হাতিয়ে ছিলেন এবং ডঃ ভট্টাচার্য যে ফলকের পাঠোদ্ধার করেছিলেন, তার সঙ্গে বেদির গায়ের খোদাই করা লিপিগুলোর হুবহু মিল রয়েছে।
সেই ফলকের চিত্রলিপিগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম। না। অবিকল সেই বলদ অথবা হনুমান অথবা ঘোড়া এবং মানুষটাও রয়েছে যে!
তা হলে কি এই বেদির তলায় …
আর ভাবতে পারলুম না। আনন্দে উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠলুম। যেভাবেই হোক, এই গুহায় ঢোকার পথটা সকালে যাবার সময় ফকিরের অজান্তে চিহ্নিত করে রাখব।
তারপর আর সময় কাটতেই চায় না। ফকির ধ্যানমগ্ন। নিস্তব্ধ গুহা ছমছম করছে।
