গুলি ছোঁড়া বন্ধ করল ওরা। কতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মুখ তুলে দেখি, অন্ধকার ঘন হয়েছে। কারুর কোনো সাড়া নেই। চেঁচিয়ে কর্নেলকে ডাকব ভাবলুম। কিন্তু আবার যদি ওরা গুলি ছোঁড়ে, সেই ভয়ে চুপ করে গেলুম।
কিন্তু ওরা কারা? যারাই হোক, অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি এখানে আমাদের এসে পড়াটা ওদের পছন্দ হয়নি।
ঘাড় ঘুরিয়ে এ সময় চোখে পড়ল, পিছনে দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশের দিগন্তে একফালি ক্ষীণ চাঁদ জেগে আছে। এখনই ওই চাঁদ অস্ত যাবে। পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে ঠিক এই সময়ে যে নাটক শুরু হয়েছিল, আজ এতকাল পরে কি তারই শেষ দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে?
কিন্তু আর এভাবে থাকা যায় না। আস্তে আস্তে গিরগিটির মতো লম্বা হয়ে পিছিয়ে গেলুম। যে ভাবেই হোক, খাদে গিয়ে নামতে হবে। সম্ভবত দুই কর্নেল এবং ডঃ করিম খাদেই নেমে গেছেন এবং আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। একবার নীচে থেকে আবছা ডাকও যেন শুনলুম।
কতক্ষণ ওইভাবে পিছু হটে এগিয়েছি হিসাব নেই। এক সময় দেখি, উঁচু উঁচু পাথরের মধ্যে এসে পৌঁছেছি। মনে পড়ল, খাদের কিনারায় এমনি উঁচু পাথরের সারি ছিল বটে। এবার হামাগুড়ি দিয়ে সোজা এগোলুম। কিন্তু হঠাৎ পা পিছলে গেল এবং গড়াতে গড়াতে নীচের দিকে পড়তে থাকলুম।
ক্রমাগত পাথরে ধাক্কা খেতে-খেতে হাড়গোড় ভেঙে যাবার দাখিল। আঁকড়ে ধরার মতো কিছু পাচ্ছি না। শুধু মসৃণ পাথর। তারপর গিয়ে পড়লুম বালির গাদায়। আঘাতটা জোর হল না। বুঝলুম, খাদের তলায় বালির চড়ায় এসে পড়েছি।
চিত হয়ে কতক্ষণ আচ্ছন্নভাবে পড়ে থালুম।
হঠাৎ কী একটা খসখস শব্দ হল। তারপর বিশ্রী দুর্গন্ধ টের পেলুম। নিশ্চয় কোনো হিংস্র জন্তু-বাঘ কিংবা নেকড়ে। শুনেছি এদেশের পাহাড়ি এলাকায় নেকড়েরা দলে-দলে ঘুরে বেড়ায়। আতঙ্কে আবার কাঁপুনি শুরু হল।
একটু পরে মনে হল যে খসখস শব্দটা শুনেছিলুম, সেটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। দুর্গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে। নাকে রুমাল চাপা দেব ভেবে যেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে গেছি, অমনি কী একটা প্রাণী আমার হাত ধরে ফেলল।
হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে বুঝলুম, প্রাণীটার গায়ে অসম্ভব শক্তি। সে এক হ্যাঁচকা টানে আমাকে বালির ওপর টানতে শুরু করল।
এবার টের পেলুম, প্রাণীটার মানুষের মতো হাত আছে। সেই হাত আমার কব্জি সাঁড়াশির মতো ধরেছে। পরক্ষণে সে আচমকা পিলে চমকানো হাসি হেসে উঠল–হিঁ-হিঁ হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ!
ওরে বাবা! এ যে ভূতুড়ে হাসি! তা হলে এ কার পাল্লায় আমি পড়েছি? চেঁচিয়ে ওঁদের ডাকব ভাবলুম, কিন্তু গলা দিয়ে শুধু গোঁ গোঁ আওয়াজ হল। তারপর দেখি, সেই ভূতুড়ে প্রাণীটা দুহাতে আমাকে শূন্যে তুলে নিয়েছে এবং দৌড়তে শুরু করেছে। বিকট গন্ধে নাড়িভুড়ি উগরে আসছে।
তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললুম।…
.
রাজা হেহয়ের শিলালিপি
যখন জ্ঞান হল, কয়েক মুহূর্ত কিছু বুঝতে পারলুম না কোথায় আছি এবং কী ঘটেছে। তারপর সব মনে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলুম। সর্বাঙ্গে ব্যথা করছে।
সামনে একটা পিদিম জ্বলছে। সেই আলোয় যা দেখা গেল, বুঝলুম আমি একটা গুহার মধ্যে আছি। পিদিম জ্বলছে একটা পাথরের বেদির ওপর। মাটির পিদিম আর বেদির পাশে এক বুড়ো জটাজুটধারী লম্বাচওড়া দাড়িওয়ালা ফকির চোখ বুজে সম্ভবত ধ্যান করছেন। তার গলায় কয়েকটা রঙিন পাথরের মালা।
তখন মুহূর্তেই আতঙ্ক ঘুচে গেল। ডাকলুম,–ফকিরসায়েব!
ফকিরসায়েব! ফকির চোখ খুললেন এবং ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললুম,–আমাকে এখানে কে আনল ফকিরসায়েব?
ফকির ইশারায় কাছে ডাকলেন। গুহার ছাদটা নিচু। দাঁড়ালে মাথা ঠেকে যাবে। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেলুম। তখন ফকির আমাকে অবাক করে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন, তুমি কে বাবা?
–এ কী! আপনি বাঙালি?
–হ্যাঁ বাবা, আমি বাঙালি। কিন্তু তুমি কি কোনো পর্যটক? মোহেনজোদাড়ো দেখতে এসেছিলে?
–হ্যাঁ ফকিরসায়েব। কিন্তু আপনি …।
ফকির একটু হেসে বললেন,–দেখতেই তো পাচ্ছ আমি সংসারত্যাগী ফকির। এই গুহায় সাধনভজন করি। এটাই আমার আস্তানা। কিন্তু তুমি কেমন করে ওই নচ্ছারটার পাল্লায় পড়লে? ভাগ্যিস, ওই সময় একবার বেরিয়েছিলুম। আমার সামনে পড়তেই ব্যাটা তোমাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল। আমি তখন নিয়ে এলুম তোমাকে।
–কে ও? ভূত, না মানুষ?
ফকির আবার হেসে ফেললেন। –ও ব্যাটাকে ভূতও বলতে পার মানুষও বলতে পার। ও একটা ভূত-মানুষ।
–তার মানে কী ফকিরসায়েব?
–মানে? মানে কী আমিও জানি ছাই? এই গুহায় জুটেছি আজ প্রায় দুবছর। প্রথম প্রথম অমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। তারপর আমিই ওকে ভয় পাইয়ে দিলুম। আমার এই ফকিরি চিমটে ঝনঝন করে বাজালেই ব্যাটা পড়ি-কী-মরি করে পালিয়ে যায়। তবে একথা ঠিক, ওকে দিনে একবারও দেখিনি! তা হলে ও আসলে কে, ঠিকই বুঝতে পারতুম। ব্যাটা সন্ধ্যার পর বেরিয়ে পড়ে। এই খাদেই ওর গতিবিধি। তবে একবার ফুটফুটে চাঁদের আলোয় সামনা-সামনি দেখেছিলুম। ও মানুষের মতো দু-পায়েও হাঁটে। অসম্ভব জোরে দৌড়াতে পারে। আর ওর একটা বিদঘুঁটে অভ্যাস। মাঝে মাঝে ঘোড়ার মতো চিহি করে ওঠে। মনে হবে, ওটা ওর হাসি। কিন্তু মোটেও তা নয়। ব্যাটা নিজেকে হয়তো ঘোড়া ভাবে।
