এলাকার ভূপ্রকৃতি কেমন যেন রুক্ষ। অবশ্য গাছপালা রয়েছে প্রচুর। তাদের রং কেমন ধূসর। ছোট ছোট পাহাড় আছে অসংখ্য। পাকিস্তান সরকার সিন্ধুনদের জল সেচের কাজে লাগিয়েছেন। ফলে ফসলের ক্ষেত ও গাছপালা অনেকটা শ্ৰী ফুটিয়ে তুলেছে।
কর্নেলের মুখোমুখি হয়েছিলুম হোটেলের লাউঞ্জে। তারপর আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, তাঁর ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ উনিই তদ্বির করে এ ব্যবস্থাটা করে ফেলেছেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।
ঘরটা দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, সাততলায়। কর্নেল দক্ষিণের জানালায় দাঁড়িয়ে ওঁর প্রখ্যাত বাইনোকুলারটি–যা বিরল জাতের পাখির খোঁজে ব্যবহার করেন, চোখে চোখ রেখে বললেন,–হুম! মোহেনজোদাড়ো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
বললুম,–আপনার মাথা খারাপ! এখান থেকে অনেক মাইল দূরে!
-–ঠিকই! তবে আমরা একটা টিলার মাথায় দশতলা হোটেলের সাততলায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে বরাবর ফঁকা। তুমিও দেখতে পার। তা ছাড়া এই দূরবিনটা খুব শক্তিশালী।
–কাছে গিয়েই দেখব’খন। বিকেল তিনটেয় যাওয়ার প্রোগ্রাম না?
–হুঁ। … বলে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে আবার যেন মোহেনজোদাড়ো দেখতে থাকলেন। কী বিদঘুঁটে স্বভাব!
বললুম,–এবার আমার প্রশ্নের জবাব দিন।
–বলো ডার্লিং!
–এয়ারপোর্ট পৌঁছতে আপনার দেরি হল কেন?
–পাকিস্তানের দূতাবাসে গিয়েছিলুম এক বন্ধুকে নিয়ে।
–কেন?
–মোহেনজোদাড়োর সরকারি অতিথিশালায় একটা ডাবল বেড ঘর জোগাড় করতে।
–সে কী! ডেলিগেশনের ব্যাপার। এঁদের সঙ্গেই তো থাকা উচিত।
–থাকব না। আমি আগাম ব্যবস্থা সেরে এসেছি।
–আমাদের প্রতিনিধিদের নেতা আপত্তি করবেন না তো?
–ডঃ তিড়কে? মোটেই না। কথা বলে নিয়েছি ওঁর সঙ্গে।
–ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে নিশ্চয় চোখাচোখি হয়েছে আপনার?
–হয়েছে। ভদ্রলোক খাপ্পা হয়ে গেছেন। বিশেষ কথাবার্তাই বললেন না।
–স্কেচ চুরির অভিযোগ করলেন না?
–নাঃ। তো জয়ন্ত, তোমার সঙ্গে ডঃ যোশীর খুব ভাব দেখলুম।
–ভাব জমাতে আমি ওস্তাদ।
–তোমাকে একটা ব্যাপারে সতর্ক করে দিই। ডঃ যোশীর সঙ্গে আর ভাব জমাতে যেও না। বিপদে পড়বে। আমাকেও বিপদে ফেলবে।
–কেন? কেন?
–আপাতত আর কিছু বলব না, ডার্লিং!
জানি, আর হাজার প্রশ্ন করলেও জবাব পাব না, তাই চুপ করে গেলুম। যতক্ষণ কথা বললেন, কর্নেলের চোখে বাইনোকুলার রয়ে গেল। কী দেখছেন অমন করে? আমার অস্বস্তি জাগল। তাই না বলে পারলুম না–এত কী দেখছেন বলুন তো?
কর্নেল বাইনোকুলার আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন,–এবার তুমি দেখ। আমার দেখা শেষ। হয়েছে আপাতত।
–দেখবটা কী? মোহেনজোদাড়ো তো?
–না। এই হোটেলের নীচের রাস্তার যে টিলাটা আছে, সেখানে দেখবে একটা পার্ক। পার্কে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই ভদ্রলোক।
তখনি বাইনোকুলারে চোখ রাখলুম। তারপর চমকে উঠলুম। দুই ভদ্রলোকের একজন হচ্ছেন ডঃ আলুওয়ালা। অন্যজনের গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। পেল্লায় গোঁফ আছে মুখে। এই গুঁফো লোকটিকে আমাদের দলে দেখেছি, এতে কোনো ভুল নেই।
কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা হোটেলে পৌঁছেই বেরিয়ে গেছেন এবং ওই লোকটির সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কী কথা বলছেন? ভারি সন্দেহজনক ব্যাপার।
একটু দেখেই আমার ক্লান্তি লাগল। সরে এলুম। কর্নেল পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হয়েছেন। আমি পোশাক বদলে নিলুম। দিল্লিতে ভোরবেলা স্নান করে নিয়েছি। এখানে দেখছি মার্চ মাসেও শীতটা কড়া। বাথরুম থেকে এসে দেখি, চা এসে গেছে। তার সঙ্গে প্রচুর ফল এবং মিষ্টান্নও। আমরা সরকারি অতিথি বলেই এত আদর নিশ্চয়।
কিন্তু কর্নেলের মুখটা গম্ভীর কেন? কাছে যেতেই একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন,–ওদের টনক নড়েছে। এই দেখো।
–কাদের?
-–খুলে চিঠিটা পড়ে নাও আগে।
খামের মধ্যে ভাজ করা একটা চিঠি আছে। খামের ওপরে ইংরেজিতে লেখা : ৬৩২ নম্বর স্যুটের অধিবাসীদ্বয়কে।
চিঠি নয়–চিরকুট বলাই উচিত। তাতে ডটপেনে লেখা আছে :’ঘোড়াটা মোগা। ওই নিয়ে রেস লড়তে যেও না। সর্বস্বান্ত হবে।
ইতি–রেসুড়েদের রাজা।‘
আমার হাত কাঁপছিল। কর্নেল চাপা হেসে বললেন, জয়ন্ত কি এতেই ভয় পেয়ে গেলে?
শুকনো হেসে বললুম,মোটেও না। আপনার কথা মতো আমি সঙ্গে আমার রিভলভারটা এনেছি। গুলিও এনেছি প্রচুর। না না–আইন ভেঙে আনিনি। সিকিউরিটির হাতে ধরা পড়তুম। ওদের মেটাল ডিটেক্টর যন্ত্রে ঠিক টের পেয়ে যেত। দিল্লির পাকিস্তানি দূতাবাসে আপনার যেমন বন্ধু আছেন, আমারও কি থাকতে নেই? তবে আমার প্রত্যক্ষ বন্ধু নয়। বন্ধুর বন্ধু আর কী! আর আপনি তো জানেন, সাংবাদিকরা কিছু বিশেষ সুবিধা সব দেশের সরকারের কাছেই পেয়ে থাকেন। অতএব কোনো ঝামেলা হয়নি অনুমতি পেতে।
কর্নেল বললেন,–আমিও সশস্ত্র, জয়ন্ত। আমারও অনুমতি পেতে ঝামেলা হয়নি। বরং আরও অস্ত্র সাহায্য চাইলে পেয়ে যাব।
-বলেন কী!
-এখনই সব বুঝতে পারবে। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের সিন্ধুসভ্যতা সংক্রান্ত শাখার প্রধান অধ্যাপক ডঃ আবদুল করিমের আসবার সময় হল। তার সঙ্গে আসছেন সরকারি গোয়েন্দা দফতরের স্থানীয় অধিকর্তা কর্নেল কামাল খাঁ। আমি সব আয়োজন করেই এসেছি।
সব দুর্ভাবনা মুহূর্তে চলে গেল। চা খেতে-খেতে এবার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার বাক্যলাপ প্রসঙ্গটি তুললুম। কর্নেল বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি এখনও বড় ছেলেমানুষ জয়ন্ত! কোন আক্কেলে ‘হেহয়’ কথাটা বললে ওঁকে?
