পাসপোর্ট ভিসা এবং অন্যান্য আইন কানুনের ব্যাপার সামলে যখন পাকিস্তান এয়ারলাইনসের বিশাল বোয়িং বিমানের সিঁড়ির কাছে পৌঁছলুম, তখনও কর্নেলের পাত্তা নেই।
কোনো গণ্ডগোলে পড়েননি তো? ডেলিগেশনের লিস্টে নাম আছে দেখেছি। অথচ এখনও আসছেন না কেন?
দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ডঃ আলুওয়ালা ঠেলতে ঠেলতে বিমানে চড়িয়ে ছাড়লেন। সিট নম্বর মেলাতে গিয়ে দেখি আমার পাশে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী বলে এক পণ্ডিতের সিট পড়েছে। দুচ্ছাই! বরং কোনো সাংবাদিক পাশে থাকলে জমতো ভালো। মিঃ যোশী গাব্দাগোব্দা প্রকাণ্ড মানুষ। বেঁটে। দাড়িগোঁফ আছে মুখে। অবশ্য টাক নেই। কাঁচাপাকা কোঁচকানো একরাশ চুলে মাথাটা ভর্তি। আমার সঙ্গে তখুনি আলাপ করে নিলেন। ভারি অমায়িক লোক মনে হল। একটু পরেই বিমান ছাড়ার সময় হয়ে গেল। আমি তখন কর্নেলের আশা ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি।
বিমান ফ্লাই অন রানওয়ে দিয়ে চলতে চলতে ক্রমশ গতি বাড়াল। তারপর মাটি-ছাড়া হল। আজ আবহাওয়া ভারি চমৎকার। সকালের রোদ ঝলমল করছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখি আকাশের এতদূরে পৌঁছেছি যে নীচে সব সমতল দেখাচ্ছে–যেন একখানা চমৎকার কার্পেট পাতা রয়েছে। যা গে! কর্নেল যখন এলেন না, তখন ফলকরহস্য তোলা রইল। অন্য সাংবাদিকরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, আমিও যখন সাংবাদিক তখন সেই উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সফর করে আসি। উপায় কী আর?
লারকানা বিমানবন্দর তিন ঘণ্টার যাত্রা। একটু পরে বিমানে পরিচারিকা স্ন্যাকস্ ও কফি দিতে এলেন। স্ন্যাকসের প্যাকেটের সঙ্গে দেখি একটা চিরকুট। তাতে লেখা আছে : ডার্লিং! ইওর ওল্ড ডাভ ইজ হিয়ার।
ওল্ড ডাভ! বুড়ো ঘুঘু। আমি চঞ্চল চোখে তাকাতেই পরিচারিকা একটু হেসে পিছনে ইশারা করলেন। ঘুরেই ইচ্ছে হল চেঁচিয়ে উঠি–হ্যালো ওল্ড ডাভ।
কিন্তু চেঁচামেচি করা গেল না। দুজনে পরস্পরের দিকে হাসলুম শুধু। ধড়ে প্রাণ এল আমার।
ডঃ যোশী আমার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন। কথায় কথায় জানলুম, ইনি পুণা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। ছাত্রজীবনে কলকাতায় ছিলেন। বাঙালিদের প্রতি প্রচুর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। এক ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলুম, আচ্ছা, স্যার, সিন্ধুসভ্যতার যুগে কি ঘোড়া ছিল না?
ডঃ যোশী যেন চমকে উঠলেন। বললেন,–ঘোড়া? হঠাৎ ঘোড়ার কথা কেন? তারপর হাসতে থাকলেন। সাংবাদিকের পক্ষে ঘোড়া রোগ খুব সুবিধের নয়।
মনে মনে একটু রাগ হল। কিন্তু মুখে হাসি ফুটিয়ে ফুটিয়ে বললুম,–প্রশ্নটা কি অন্যায়, স্যার?
ডঃ যোশী আমার কাঁধে হাত রেখে সকৌতুক বললেন,–মোটেই না। তবে ইদানীং দেখছি কারুর-কারুর মাথায় সিন্ধুসভ্যতার কাল্পনিক ঘোড়া দৌড়াদৌড়ি করছে।
–তা হলে সিন্ধুঘোটক বলুন!
ডঃ যোশী আরও জোরে হেসে উঠলেন।যা বলেছেন। অবশ্য সিন্ধুঘোটক থাকে অন্য সিন্ধুতে। অর্থাৎ সমুদ্রে। এ সিন্ধু প্রদেশটা নেহাত মাটি দিয়ে তৈরি। তাই মাটির ঘোড়া দু-একটা থাকলেও থাকতে পারত সিন্ধুসভ্যতার যুগে।
–যেমন আমাদের বাঁকুড়ার ঘোড়া। কুটিরশিল্পের খাসা দৃষ্টান্ত।
ডঃ যোশী আমার পাল্টা রসিকতায় খুশি হলেন। বললেন,–রসকষ আছে বলেই আমি সাংবাদিকদের পছন্দ করি।
-স্যার, একটু আগে বললেন, ইদানীং নাকি কারুর কারুর মাথায় … বাধা দিয়ে ডঃ যোশী বললেন,–হা জয়ন্তবাবু। যেমন ধরুন আপনাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্বের অধ্যাপক ডঃ আলুওয়ালার মাথায় ঘোড়া ঢুকেছে। এর আগে উনি মাথায় বলদ ঢুকিয়েছিলেন। এখন বলছেন, বলদটা আসলে ঘোড়াই হবে। বিশুদ্ধ সংস্কৃতে যাকে বলে কিনা হয়।
–শুনেছি হেহয় থেকে নাকি ‘হয়’।
–অ্যাঁ বলে ডঃ যোশী আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললেন,–কোথায় শুনলেন একথা?
বললুম,–এক ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিতের কাছে।
–কে তিনি? নাম কী? থাকেন কোথায়? এতক্ষণে মনে হল, ভুল করেছি। মুখ ফসকে গোপন একটা তথ্য বের করে দিয়েছি। অথচ কর্নেল পই পই করে বারণ করেছিলেন। অগত্যা বানিয়ে বললুম,–কলকাতায় ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ ভবার্ণব ভট্টাচার্যর কাছে।
–ডঃ ভবার্ণব ভট্টাচার্যর নাম তো শুনিনি!
আমার ভাগ্য ভালো এইসময় পরিচারিকা দ্বিতীয় দফা খাদ্য পরিবেশন করতে এলেন। এটা ব্রেকফাস্ট। ডঃ যোশীকে পেটুক মনে হল। তখুনি স্যান্ডউইচের প্যাকেট খুলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আড়চোখে লক্ষ করলুম, উনি খেতে খেতে মাঝে মাঝে সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে আমাকে দেখে নিচ্ছেন। ব্যাপারটা কেমন যেন লাগল …
কিন্তু আমার পক্ষে স্বস্তির কথা, ডঃ যোশী আর এ প্রসঙ্গে গেলেন না। দেশের রাজনীতি নিয়ে পড়লেন। দেখতে-দেখতে কখন সময় কেটে গেল। আমাদের বিমান লারকানা বিমান, বন্দরের ওপর চক্কর দিতে শুরু করল। নীচে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছিল। লারকানার পূর্বে সামান্য দূরে সিন্ধুনদ বয়ে চলেছে।
বিমান যখন মাটিতে নামল, তখন সকাল সাড়ে দশটা। পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি এবং সেখানকার পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিত ভারতীয় প্রতিনিধিদের স্বাগত জানতে অপেক্ষা করছিলেন। পরিচয় ও কোলাকুলি পর্ব সেরে গাড়ি করে শহরের দক্ষিণপ্রান্তে নিরিবিলি এলাকায় একটা স্টার হোটেলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। দশতলা এই রাজকীয় হোটেলে বিদেশি পর্যটকদের বেশ ভিড় দেখলুম। শীতের শেষ বলে নাকি এখন ভিড়টা কমেছে। মোহেনজোদাড়ো এখান থেকে কিছু দূরে দক্ষিণে সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরে রয়েছে। তাই এত পর্যটকদের ভিড়।
