–মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ডঃ যোশী আসলে কে?
–এই প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারছি, তোমার বুদ্ধি খুলেছে। জয়ন্ত, ওই একই প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরছে। কারণ পুণা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পত্রিকায় ডঃ যোশীর যে ছবি দেখেছিলুম, তাতে মুখে দাড়ি নেই।
–কী মুশকিল। এখন দাড়ি রেখেছেন উনি?
–সেই ছবির মুখে দাড়ি কল্পনা করেছি, কিন্তু মিলছে না।
–তা হলে কি ইনি জাল ডঃ যোশী?
এই সময় ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিলেন এবং চাপা গলায় কী বললেন। তারপর ফোন রেখে হাসিমুখে ঘুরলেন,–জয়ন্ত, ডঃ করিম এবং কামাল খাঁ এসে গেছেন।
তিন মিনিট অপেক্ষার পর ঘণ্টা বাজল। দরজা খুলে দেখি একজন বেঁটে, অন্যজন দৈত্যের মতো বিশাল লোক ঘরে ঢুকে সম্ভাষণ জানালেন। কর্নেলের সঙ্গে কোলাকুলি শেষ হতেই চায় না। তারপর আমার দিকে দুজনে এগোতেই ভয় পেয়ে গেলুম। এই বেঁটে ও লম্বা পর্বতের সামনে আমি একেবারে নেংটি ইঁদুর যে!
কর্নেল বেঁটে ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, আমার একসময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি জীবনে দুজনেই আফ্রিকা রণাঙ্গনে ছিলুম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
মনে হল ওঁরা ব্যস্ত। ঝটপট কাজের কথা শুরু করলেন। কর্নেল কামাল খাঁ ব্রিফকেস্ থেকে একটা ভাঁজ করা ম্যাপ বের করে বিছানায় খুলে ধরলেন। তিনজনে ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। তারপর যা সব কথাবার্তা হল, আমি স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারলুম না। শুধু টের পেলুম, এতদিনে মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া রহস্যের একটা কিনারা হতে চলেছে।
. ওঁরা বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর আমরা লাঞ্চ খেতে গেলুম। এই ফ্লোরেও ডাইনিং হল আছে। সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভোজ দিচ্ছেন। বক্তৃতাও হল। তারপর অতিথিদের খানাপিনা শেষ হতে পাক্কা একঘণ্টা লেগে গেল।
ঘরে ফিরে কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, ভোজসভায় একটা বিশেষ ব্যাপার কি তোমার চোখে পড়ছে?
–বিশেষ ব্যাপার? না তো।
–ডঃ আলুওয়ালা কিন্তু ভোজসভায় অনুপস্থিত!
–তাই নাকি? লক্ষ করিনি।
–তুমি না সাংবাদিক! সব কিছুতে লক্ষ রাখা তোমার উচিত ডার্লিং!
–তাই বলে আলুওয়ালা পটলওয়ালাদের নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, কিন্তু প্রতিনিধিদলের নেতা ডঃ তিড়কের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। ডঃ আলুওয়ালা ছিলেন ডঃ যোশীর ঘরে। ডঃ যোশী বলেছেন, তাঁর সঙ্গে নাকি কী একটা ব্যাপারে তর্কাতর্কি হয়েছিল। ডঃ আলুওয়ালা রেগেমেগে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। ডঃ তিড়কে এতে যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি খাপ্পা। ভারতীয় পণ্ডিতের এহেন আচরণ বিদেশে বাঞ্ছুনীয় নয়। যাই হোক, নীচে রিসেপশনের কেউ লক্ষ করেনি কখন উনি বেরিয়ে গেছেন। শুধু লিফটম্যান বলেছে, এক বেঁটে মোটা ভদ্রলোক ব্যাগেজ নিয়ে নেমেছেন। যাক গে, এবার নাটক জমে উঠল মনে হচ্ছে।
ক্লান্তি তো বটেই, বাদশাহী ধরনের একটা অসাধারণ খাওয়ার পর আমার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। শুয়ে পড়লুম। সেই সময় লক্ষ করলুম, কর্নেল একটা ম্যাপ খুলে বসেছেন এবং কী সব চিহ্ন দিচ্ছেন ম্যাপে।
ঘুম ভাঙল কর্নেলেরই ডাকে। ওঠ জয়ন্ত! তিনটে বেজে গেল। আমরা এবার রওনা দেব। ডঃ তিড়কের কাছে বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে। আর দেরি করা ঠিক নয়। এখনই কামাল সায়েবের জিপ এসে পড়বে।
দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলুম। কিছুক্ষণ পরে ফোনে রিসেপশান থেকে জানাল–জিপ এসে গেছে। আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ব্যাগেজ হোটেলের লোকেরা এসে নিয়ে গেল। করিডোরে লিফটের দিকে এগোচ্ছি, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক মিঃ রঘুনন্দনের সঙ্গে দেখা। বললেন,–এ কী চৌধুরী! কোথায় যাচ্ছ তুমি?
–এত বাদশাহী আরামে থাকা পোষাবে না ভাই! এক চেনা ভদ্রলোকের ওখানে উঠব।
–সে কী!
মিঃ রঘুনন্দন হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি দৌড়ে গিয়ে লিফটে ঢুলুম। কর্নেল বললেন,–কী বললে ওঁকে?
বললুম,–এক চেনা ভদ্রলোকের বাসায় যাচ্ছি …
নীচে নেমে গিয়ে জিপে উঠলুম। পাঠান ড্রাইভার জিপে স্টার্ট দিল। রাস্তায় যেতে-যেতে একটা অদ্ভুত বৈষম্য চোখে পড়ছিল। বিশাল চওড়া হাইওয়েতে অজস্র বিলিতি গাড়ি যাতায়াত করছে বটে, উট আর ঘোড়াগাড়ির সংখ্যাও কম নয়। মাথায় পাগড়ি ও পা অব্দি রঙবেরঙের আলখাল্লা পরা মানুষের ভিড়ে বিলিতি পোশাকের মানুষও রয়েছে। সেইসঙ্গে ভেড়ার পাল নিয়েও যাচ্ছে যারা–তারা কসাই না রাখাল বুঝতে পারলুম না।
অদ্ভুত এখানকার ভূপ্রকৃতিও। কখনও চড়াই, কখনও উত্রাই। এই রাস্তার দুধারে মাঝে-মাঝে টানা সবুজ শস্যের মাঠ, কখনও ধু ধু বালিয়াড়ি আদিগন্ত। ন্যাড়া টিলা, আবার কখনও রুক্ষ বাঁজা জমির ওপর বড় বড় পাথর পড়ে রয়েছে। তারপর রাস্তা ক্রমশ নীচের দিকে নেমে গেছে। গাছপালা খুবই কম। তারপর একটানা বাজার। বাজার পেরিয়ে গিয়ে একটা টিলার গায়ে সরকারি গেস্ট হাউস।
গেস্ট হাউসের পুবের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন,–ওই হের বৎস! সিন্ধুনদ ও তার তীরবর্তী হাজার-হাজার বছরের পুরোনো ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শন সেই মোহেনজোদাড়ো।
কে জানে কেন, অস্বস্তিতে আমার বুক কেঁপে উঠল এতক্ষণে।…
.
মামদো ভূতের কবলে
গেস্ট হাউসটার পরিবেশ এই রুক্ষ মরুসদৃশ জায়গায় একেবারে বিপরীত। সবুজ গাছ ও ফুলে সাজানো। মোহেনজোদাড়ো রয়েছে পূর্বে অনেক নীচে। তার ওধারে সিন্ধুনদের চরগুলো দেখা যাচ্ছে। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে চা খেতে খেতে কর্নেল হঠাৎ বললেন,–ওই দেখো জয়ন্ত, ভারতীয় পণ্ডিত এবং সাংবাদিকদের বাস দুটো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওঁরা মোহেনজোদাড়ো শহরের রাজপথে হেঁটে যাচ্ছেন।
