‘… এই অনুমানের কারণ আছে। তিব্বতের মঠে এক পুরোনো পুঁথিতে লেখা আছে : মর্ম অর্থাৎ ব্রহ্মবংশোদ্ভূত রাজা হেহয় এক দুর্যোগের রাতে অশ্বসহ এই মঠে আশ্রয় নেন। তার সঙ্গে প্রচুর ধনরত্ন ছিল। বিবেকবান বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা ধনরত্ন ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে চলেন। তাই রাজা হেহয়কে পরামর্শ দেন, স্বরাজ্য ব্রহ্মাবর্তে ফিরে গিয়ে আপসে মিটমাট করুন। তা শুনে রাজা হেহয় ক্রুদ্ধ হয়ে মঠ ত্যাগ করেন।
‘…কোথায় গিয়েছিলেন হেহয়? নিশ্চয় মোহেনজোদাড়ো নামে দ্রাবিড় রাজ্যে। আমার ধারণা হেহয় থেকেই হয় কথাটির উদ্ভব। হয় মানে ঘোড়া। পুরাণে হয়গ্রীব অবতারের কথা আছে। সে কি ব্রহ্মবৰ্তরাজ হেহয়েরই উপাখ্যান? সম্ভবত রাজ্যে বিদ্রোহের ফলে হেহয়কে উত্তরে পালাতে হয়েছিল। আশ্রয় না পেয়ে সেখান থেকে তিনি কাশ্মীর ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্রাবিড় রাজ্যের রাজধানীতে চলে আসেন। কাশ্মীরে একটি গিরিপথের নাম হোহো।…’
কর্নেল ডাইরিটি বন্ধ করে বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে ডঃ আলুওয়ালার ফলকচুরির উদ্দেশ্য সম্ভবত নিছক পুরাতত্ত্ব নয়, গুপ্তধন। পৈতৃক নেশার ব্যাপার।
বললুম,–কিন্তু মোহেনজোদাড়ো তো এখন পাকিস্তানে। আর কি সুবিধে করতে পারবেন ডঃ আলুওয়ালা?
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন,–জানি না। তবে সম্প্রতি একটা সুযোগ ওঁর সামনে এসেছে। সিমলাচুক্তি অনুসারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের জ্ঞান আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারই ভিত্তিতে খুব শিগগিরি ভারত থেকে একদল পুরাতাত্ত্বিক পাকিস্তানে মোহেনজোদাড়ো এবং হরাপ্পা দেখতে যাচ্ছেন। খবরের কাগজের নোক হয়েও এ খবর রাখ না দেখে অবাক লাগছে বৎস!
বললুম,রোজ হাজার হাজার খবর বেরোয়। অত মনে থাকে না।
–তা স্বীকার করছি। … বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। একটু পায়চারি করলেন। তারপর বললেন,–পুরাতাত্ত্বিকদের সঙ্গে একদল সাংবাদিকও যাচ্ছেন শুনেছি। জয়ন্ত, তোমাকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। তুমি যেভাবে হোক, কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে দৈনিক সত্যসেবকের পক্ষ থেকে তোমার নামটা সেই দলে ঢোকাবার ব্যবস্থা করো। আর আমিও চেষ্টা করে দেখি, কোনো ফিকিরে নিজেকে ঢোকাতে পারি।
হাসতে-হাসতে বললুম-খুব সোজা রাস্তা আছে। আপনি তো ইদানীং ন্যাচারালিস্ট বা প্রকৃতিবিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন। দুর্লভ ও বিরলজাতের পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় নিয়ে ধানাইপানাই করছেন বিস্তর। বিদেশি কাগজে অনেক প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন। মাকড়সা আর প্রজাপতি সম্পর্কে তো আপনার খুব মাথাব্যথা। কারণ নাকি, দুইয়ের মধ্যে খুনী ও জোচ্চোরদের প্রবৃত্তি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অতএব হে প্রাজ্ঞ ঘুঘু! আপনার অসুবিধেটা কোথায়? বিশেষ করে কেন্দ্রীয় দফতরে দিল্লিওয়ালারা অনেকেই তো আপনার বন্ধু। আপনি …
কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে হাসতে বললেন,–যথেষ্ট, যথেষ্ট ডার্লিং। তোমার প্রদর্শিত পথেই আমি এগবো। ….
.
ডঃ আলুওয়ালার অন্তর্ধান
অনেক চেষ্টাচরিত্র করে পাকিস্তানগামী সাংবাদিকদের দলে ঠাই পেলুম। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে যখন পৌঁছেছি, তখনও কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই। বিমান ছাড়তে আর পনেরো মিনিট দেরি। উদ্বিগ্ন হয়ে ঘোরাঘুরি করছি, সেই সময় পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের দলটি এসে পৌঁছলেন। পনেরো জন পণ্ডিত এক জায়গায় জুটলে যা হয়। প্রত্যেকের মুখ গম্ভীর হাবভাব দেখে ভয় করে আমার। দু-তিনজন বাদে সবার চুল পাকা। জ্ঞানের তাপেই হয়তো টাক পড়েছে অনেকের মাথায়। কিন্তু কোথায় আমার সেই সুপরিচিত টাক? শুধু টাক থাকলেই চলবে না, দাড়িও চাই।
রাশভারি দলটির মধ্যে দাড়িওয়ালা আছেন, টাকওলাও আছেন। কিন্তু একসঙ্গে দাড়ি ও টাক আছে, এমন কাকেও দেখতে পাচ্ছি না।
তা হলে কর্নেল কি দলে ভিড়তে পারেন নি? ভাবনায় পড়ে গেলুম। আমি খামোকা একা গিয়ে করবোটা কী? তা ছাড়া ওইসব গোরস্থান বা ভূতপেরেতের জায়গায় যাওয়া আমার একেবারে পছন্দসই নয়। নেহাত বুড়ো ঘুঘুমশায়ের টানে এত কাণ্ড করে এখানে হাজির হয়েছি।
মাইকে বিমানযাত্রীদের ডাকাডাকি শুরু হল। সেই সময় ঠাহর করে দেখি, ডঃ আলুওয়ালা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন। আমার চোখে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে এলেন হাসিমুখে,–আরে! জয়ন্তবাবু না? আপনিও কি যাচ্ছেন নাকি ডেলিগেশনের সঙ্গে?
–যাচ্ছি। আপনিও আছেন, তা লিস্টে দেখলুম।… বলে আমি খুব অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করলুম।
ডঃ আলুওয়ালা মুখে খুশির ভাব ফুটিয়ে বললেন,–যাকগে মশাই। বাঁচা গেল। আমি গোলমাল ভিড় একদম পছন্দ করি নে। তাতে বুঝতেই পারছেন, আজকাল আমি অনেক জ্ঞানীগুণী লোকেরই ঈর্ষার কারণ হয়েছি। তাই একদম ইচ্ছে করছিল না যেতে। সরকারও ছাড়লেন না, আর শেষ অব্দি দেখলুম, যে বিষয়ে সারাজীবন গবেষণা করছি–সেই বিষয়েই তো এই ডেলিগেশন। তবে তার চাইতে বড় কথা বাল্যস্মৃতি। লারকানা এলাকায় আমার ছেলেবেলা কেটেছে। কাজেই মনের টানও বাজল।
আমি মন দিয়ে ওঁর কথা শুনছিলাম না। কারণ কর্নেল বুড়ো এখনও এসে পৌঁছলেন না। বিমানযাত্রীদের আবার ডাকা হচ্ছিল। ডঃ আলুওয়ালা আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন। সিকিউরিটি পুলিশ ও শুল্ক দপ্তরের লোকেরা পরীক্ষা করছেন। প্রত্যেক যাত্রীকে লাইনে দাঁড়াতে হবে।
