ভেতর থেকে গমগমে আওয়াজে কর্নেলের সাড়া এল—কী হয়েছে জয়ন্ত?
–বনবিহারী গুলি ছুড়ছে।
—তুমি গুলি ছুড়ে বোসো না তাই বলে। সাবধান।
আমি বিরক্ত হয়ে বললুম-ভাল বলেছেন বটে! আমি…
আমাকে থামিয়ে দিয়ে মাথার ওপরকার পাথরের চটা ছাড়িয়ে ফের বনবিহারীর গুলি কুচ্ছিত আওয়াজ দিল। সঙ্গে সঙ্গে গর্তে ঝাঁপ দিলুম।
তারপর পড়েছি একটা নরম বা শক্ত জান্তব কিছুর ওপর। নাকি ঘাসের জঙ্গলে? টর্চ জ্বলে উঠল। কর্নেল বললেন—সরে এস জয়ন্ত। তুমি বেচারার পেটের ওপর পড়ে আছ!
তাকিয়ে দেখেই আঁতকে সরে গেলুম।
গর্তটা ভেতরে খুব চওড়া। মধ্যিখানে দুপা ছড়িয়ে ফাঁদের স্প্রিংয়ে মাথা রেখে কাত হয়ে শুয়ে আছে একটা দানবাকৃতি প্রাণী। শরীরটা বিশাল গরিলার মতো—কিংবা লোমওয়ালা মানুষেরই মতো—কিন্তু মাথাটা সিংহের মতো। বড় বড় দাঁত ছরকুটে চোখ বুজে কাঠ হয়ে আছে। মাথাটা ঢাকের মতো বড়। ঘন ধূসর রঙের কেশরে ঢাকা। দুই পায়ের গোড়ার স্প্রিংয়ের দাঁত আটকে রয়েছে স্পিংয়ের পাতের সঙ্গে একটা মোটা লোহার শেকল কোণের দিকে লোহার গোঁজে আটকানো আছে। ফাদটা চমৎকার পাতা হয়েছিল বটে।
টর্চের আলো নিভিয়ে কর্নেল বললেন-নৃসিংহ দর্শন হল তো জয়ন্ত?
-হল। কিন্তু ওপরে বনবিহারী যে ওত পেতে আছে!
—থাক। আমরা ওপরে আর উঠছি না।… বলে কর্নেল পরমেশবাবুর দিকে ঘুরে বললেন—তাহলে আপনি বলতে চান, যাকে আমরা নৃসিংহ বলছি—তা আসলে মালয় দ্বীপপুঞ্জের অধুনালুপ্ত একজাতের গরিলা ছাড়া কিছু নয়?
পরেমেশবাবু বললেন—আমার তাই অনুমান। প্রাণীবিজ্ঞান আমাকে পড়তে হয়েছে। সেই জ্ঞানমতেই একথা বলছি। অবশ্য সিংহের মাথা মানুষের শরীরে জোড়া দেওয়া বিজ্ঞানের তত্ত্বর দিক থেকে সম্ভব হতেও পারে। কিন্তু এ প্রাণী গরিলা ছাড়া আর কিছু নয়। যেটা আপনারা সিংহের কেশর ভাবছেন, ওটা গরিলারই চুল। মালয় দ্বীপপুঞ্জ এলাকার গরিলাদের মাথায় মানুষের মতো চুল ছিল। আর ওর চোয়াল লক্ষ্য করুন। সিংহের চোয়ালের সঙ্গে কোনও মিল নেই। দাঁতের গড়ন দেখুন। প্রত্যেকটা দাঁত সমান। মানুষের মতো চোয়ালের দাঁতগুলো ভোতা। এ একটা গরিলাই বটে।
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—তা হোক। তবে এও একটা বিস্ময়কর আবিষ্কার বই কি।
কর্নেল বললেন-তা আর বলতে! যাক গে, এর ঘুম অন্তত পাঁচ ঘন্টা ভাঙবে না। এর মধ্যে একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। চলুন, আমরা বেরিয়ে পড়ি। তারপর…
আমি বাধা দিয়ে বললুম-বেরুবেন কীভাবে? ওপরে বনবিহারীরা তাক করে আছে।
কর্নেল বললেন—এস তো আমার সঙ্গে। ঠিক বেরিয়ে যেতে পারবে নিরাপদে। ততক্ষণে ভেতরের অন্ধকার অতটা মালুম হচ্ছে না। এর কারণ আবিষ্কার করে খুশিতে নেচে উঠলুম। সামনে দেওয়ালের প্রকাণ্ড ফাটল দিয়ে আবছা আলো আসছে। সে পথে আমরা সার বেঁধে এগিয়ে চললুম। কিছুক্ষণ পরে সুড়ঙ্গপথ থেকে বেরিয়ে দেখি, জলপ্রপাতের কাছে এসে পৌঁছেছি, কর্নেল বললেন—তখন ফঁদ পাততে এসে এই পথটা দেখে গিয়েছিলুম। তবে এদিক দিয়ে সেই বিচে। পৌঁছতে অনেক মেহনত হবে এই যা মুশকিল।
দুর্ভাবনায় মুষড়ে গিয়ে বললুম—অন্যপথ জানা আছে তো?
কর্নেল বললেন—এস তো, দেখা যাক। ডঃ গুটেনবার্গ যখন পথপ্রদর্শক, চিন্তার কারণ নেই।
ডঃ গুটেনবার্গ দাড়ি চুলকে বললেন—আমি এদিকটা বিশেষ চিনি না। সেবার এই উত্তর দিকটায় ঘোরাঘুরির ফুরসত পাইনি।
এই সময় হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, পুবের খাড়িতে সেই মোটরবোটটার কথা। বললুম-কর্নেল! ভুলে গিয়েছি বলতে। ওদিকে একটা মোটরবোট দেখেছিলাম তখন। মাকুর মতো লম্বাটে গড়ন।
কর্নেল বললেন—টর্পেডোবোট? তারপর ঘুরে চোখে বাইনোকুলার রাখলেন।
সবাই ঘুরে দাঁড়ালুম। কর্নেল বোটটা দেখার পর বললেন—তাহলে কি টংকু আরেগোনা স্বয়ং দ্বীপে এসে জুটেছে? ব্যাপারটা কী?
পরমেশবাবু গম্ভীর মুখে বললেন—আর তার লোক আমার কথাই বা কেন জিগ্যেস করে গেল জয়ন্তবাবুকে?
কর্নেল বললেন—একটা সূত্র আমার মাথায় এসেছে।
আমরা সবাই একসঙ্গে বললুম–কী, কী?
কর্নেল বললেন—বনবিহারীর বাসায় আনোয়ার খান, মানে লালবাজার গোয়েন্দা দফতরের সেই কর্তা ভদ্রলোক হামলা করেছিলেন। কিছু কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছিল। তাতে দেখা যায়, বনবিহারী সিঙ্গাপুরের একটা লোককে খুব পুরনো একটা দুষ্প্রাপ্য মূর্তি বেচতে চেয়েছিল—তার জবাবে সিঙ্গাপুরের লোকটি লিখেছে, ওসব বিশ্বাস করি না। হাতেনাতে দেবেন, তাতে আমি রাজি আছি। প্রমাণ পেলে মূর্তিটা পাঁচলক্ষ ডলারে কিনব। আপনি টোরাদ্বীপে আসুন—যে ভাবে পারুন।
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—অতএব বোঝা গেল, ডঃ গড়গড়ি সেজে পরমেশবাবুর ফলকের নৃসিংহ ছবিটা নিয়ে সে আমাদের সঙ্গে টোরাদ্বীপে কেন এসেছে!
আমি বললুম—একা আসতে পারত না? এত রিস্ক নিয়ে এল কেন? বিশেষ করে ডঃ গুটেনবার্গের কাছে ধরা পড়া সম্ভব ছিল।
কর্নেল বললেন—একা তার পক্ষে আসা অসম্ভব। আরেগোনা বিরাট লোক। সে পারে বলে কি অন্য কেউ এই দুর্গম দ্বীপে আসতে পারে? তাই সে ডঃ গড়গড়ি সেজে আমাকে উৎসাহিত করে দ্বীপে আসার সুযোগ নিয়েছে। তাছাড়া ওই যে হাতেনাতে প্রমাণ কথার অর্থও বোঝা যাচ্ছে। সত্যি সত্যি নৃসিংহ-জাতীয় প্রাণী এখানে আছে। কাজেই আমার ধারণা, কোনও সূত্রে ভারতীয় সরকারি সমীক্ষকদলের অভিযান ও নৃসিংহের হাতে মর্মান্তিক পরিণতির কথা বনবিহারী জানতে পেরেছিল। জেনে সে আরও লোভে অস্থির হয়ে উঠেছিল। সত্যি সত্যি নৃসিংহ দেখাতে পারলে আরেগোনা বিশ্বাস করবে যে সত্যি নৃসিংহমূর্তিতে সেই প্রাচীন শল্য চিকিৎসা পদ্ধতির কথা সাংকেতিক ভাষায় লেখা আছে।
