–খবরের কাগজে পড়ে। পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে যেসব প্রত্নদ্রব্য দাবি করেছেন, তার মধ্যে ওই ফলকটার উল্লেখ ছিল।
–হুম। কষ্ট করে এবং প্রচুর অর্থ ব্যয়ে লন্ডন যাওয়ার চেয়ে আপনার আলমারি থেকে ওটার নকল বাগানো অনেক সোজা হয়েছে।
ডঃ আলুওয়ালার মনে ধরল কথাটা। সায় দিয়ে বললেন,–ঠিক, ঠিক। কিন্তু ওতে এমন কী আছে কে জানে? চোর ইচ্ছে করলে এই ফাইলটাও হাতাতে পারত। এতেও কাগজে আঁকা অবিকল স্কেচ রয়েছে।
কর্নেল হাসলেন। কাগজের স্কেচের চেয়ে ব্রোঞ্জের নকল ফলকটাই কাজে লাগবে মনে হয়েছে কারুর। আপনার এই স্কেচ তো নকলস্য নকল। আপনার ড্রইং ক্ষমতায় সম্ভবত আস্থা নেই ভদ্রলোকের।
–ভদ্রলোক! সে ব্যাটা ভদ্রলোক। নচ্ছার চোর কাহেকা। এখুনি থানায় জানাচ্ছি।
ডঃ আলুওয়ালা উত্তেজিতভাবে ফোনের কাছে গেলেন। ডায়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন,–সব সময় এনগেজড়! কলকাতার টেলিফোনকে ভূতে ধরেছে। নাঃ! থানায় গিয়েই সব জানিয়ে আসি। বৈজু আসুক।
এই সময় আমি লক্ষ করলুম কর্নেল টেবিলে রাখা সেই ফাইল থেকে একটুকরো কাগজ তুলে নিয়ে কোটের পকেটে ঢোকালেন। ডঃ আলুওয়ালা টের পেলেন না। আবার ডায়াল করতে ব্যস্ত হয়েছেন। বোঝা যায় থানায় যেতে মন চাইছে না। নেহাত বেঘোরে না পড়লে আজকাল থানায় যেতে কারই বা ইচ্ছে করে!
কিন্তু কর্নেল যা করলেন, তাও যে চুরি! আমি কটমট করে তাকাতেই উনি চোখ টিপে একটু হাসলেন। আমার অস্বস্তি হল। বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি করবেন যে!
ডঃ আলুওয়ালা আরও কয়েকবার চেষ্টা করার পর থানার লাইন না পেয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। তারপর আমাদের কাছে এসে বিমর্ষভাবে বললেন,–দেখুন তো, কী সর্বনাশ হল।
কর্নেল বললেন,–থানায় গিয়ে জানিয়ে দিন এক্ষুনি। আজ আমরা তাহলে উঠি। অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলুম আপনার।
–মোটই না! ভাগ্যিস আপনারা এসেছিলেন, তাই চুরিটা এত শিগগির ধরা পড়ল। নইলে আমি তো ওই আলমারি এখন খুলতুম না। কিছু টেরও পেতুম না।
কর্নেল ও আমি উঠে দাঁড়ালুম। ডঃ আলুওয়ালা এগিয়ে গিয়ে দরজার পর্দা তুলে ধরলেন। ভদ্রলোক অতি সজ্জন ও কেতাদুরস্ত মানুষ।
আমরা তিনতলা থেকে নেমে আসছি, দোতলার মুখে ডঃ আলুওয়ালার চাকর সেই বৈজুর সঙ্গে দেখা হল। তার হাতে বাজারের থলে। সসম্ভ্রমে একপাশে সরে সে আমাদের সেলাম দিল। কর্নেল তাকে কী যেন জিজ্ঞেস করতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। করেই বুজিয়ে নিলেন। বৈজু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল। কর্নেল গট গট করে নেমে গেলেন, আমি বৈজুর দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে তাকে অনুসরণ করলুম।
রাস্তায় আমার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। একটু পরে গাড়িতে যেতে যেতে বললুম,–আপনিও ওই চুরিতে জড়িয়ে পড়বেন নেই–তখন আপনার ওপরই সন্দেহ হবে।
কর্নেল চাপা হেসে বললেন,–চোরের ওপর বাটপাড়িতে দোষ নেই, জয়ন্ত।
–তার মানে?
–ডঃ আলুওয়ালার ব্রোঞ্জের ফলকটাও চুরি করা।
–সে কী! উনি যে বললেন, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ওঁর বাবাকে—
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন,–স্রেফ মিথ্যে। রাখালবাবু সত্যি এক ভদ্রলোককে আসল ফলকের একটা নকল দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভদ্রলোকের নাম ডঃ পরমেশ্বর ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন নামকরা প্রত্নবিজ্ঞানী। রাখালবাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার বাড়ি বর্ধমানের এক গ্রামে। অনেক দিন আগে তিনি মারা গেছেন। তার ছেলে শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এখন রিটায়ার করেছেন। সম্প্রতি মাস দুই আগে তার গ্রামের বাড়ি থেকে রহস্যজনক চুরি হয়েছে। চোর আর কিছু নেয়নি–নিয়ে গেছে শুধু একটা ব্রোঞ্জের ফলক।
–কী কাণ্ড! তা হলে ডঃ আলুওয়ালাই কি এই চুরির পেছনে?
–তা আর বলতে! পুরাতাত্ত্বিক পত্রিকা ‘দা এনসেন্ট ওয়ার্ড’-এ একটা বিশেষ ফলক প্রসঙ্গে ওঁর লেখা প্রবন্ধ পড়েই আমার সন্দেহ জেগেছিল। তাই আজ ওঁর বাড়ি এসেছিলুম। ইচ্ছে করেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলুম। ভদ্রলোক অসম্ভব ধূর্ত।
–কিন্তু ওঁর আলমারি ভেঙে ফলকটা চুরি গেছে! নিশ্চয় ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো।
কর্নেল হো হো করে হাসলেন। চুরি যায়নি। এক মিথ্যে ঢাকতে আরেক মিথ্যে।
আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম। সত্যি, এতক্ষণে একটা জটপাকানো রহস্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
.
রাজা হেহয়ের গুপ্তধন
ইলিয়ট রোডে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে সেদিন দুপুর অব্দি কাটাতে হল আমাকে। কাপের পর কাপ কফি খেলুম এবং অসংখ্য প্রশ্ন করলুম। জবাবে যেটুকু জানলুম, তা আগেই যা জেনেছি তার একচুল বেশি নয়। অর্থাৎ বর্ধমানের এক গ্রামের জনৈক স্কুল শিক্ষক শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে ব্রোঞ্জের ফলক চুরি গেছে। শচীনবাবু কবে এসে কর্নেলকে ধরে ছিলেন। কর্নেল কথা দিয়েছিলেন, চেষ্টা করবেন ফলকের হদিস পেতে। মনে হচ্ছে, পেয়েও গেছেন। ব্যস, এটুকুই।
কর্নেল ডঃ আলুওয়ালার আঁকা সেই স্কেচটার দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন। কয়েকবার প্রশ্ন করে যখন জবাব আর পেলুম না, তখন বললুম,–বেলা হয়ে গেছে। আমি উঠি তাহলে।
কর্নেলের ধ্যান ভাঙল একথায়। বললেন,–আচ্ছা, জয়ন্ত! ফলকের স্কেচে এই চিহ্নটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার? বাঁদিক থেকে পঞ্চম চিহ্নটা।
তারপর স্কেচটা আমার সামনে এগিয়ে ধরলেন।
দেখে নিয়েই বললুম,–হনুমান ওটা। অবশ্য অনুমানের হনুমানও বলতে পারেন।
