আমি জোরে মাথা দুলিয়ে বললুম,–কক্ষনোও ছেপে দেব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন
ডঃ আলুওয়ালা। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটাই আমি দৈনিক সত্যসেবকে। প্রকাশ করব না। কারণ, আমার মাননীয় বন্ধু কর্নেল আমাকে আগেই সেটা নিষেধ করে দিয়েছেন।
কর্নেল দাড়ি ও টাক পর্যায়ক্রমে চুলকে বললেন,–ঠিক, ঠিক।
ডঃ আলুওয়ালা উঠে গিয়ে একটা স্টিলের আলমারি খুললেন। তারপর একটা ফাইল বের করে আনলেন।
কর্নেল ঝুঁকে পড়লেন কাগজপত্রের দিকে। আমি কি বুঝলাম না। একগাদা কাগজে নানা বিঘুঁটে আঁকজোক রয়েছে। তার পাশে নানান উদ্ভুটে শব্দ ইংরাজিতে লেখা।
ডঃ আলুওয়ালা একটা কাগজ তুলে নিয়ে বললেন,–ফলকটায় লেখা আছে কী শুনুন : ‘শস্যগোলার অধিকর্তাকে একটি সেরা জাতের বলদ পাঠানো হচ্ছে।‘
কর্নেল বললেন,–পাঠাচ্ছেন কে?
–সেকথা ফলকে নেই। মনে হচ্ছে, এটা একটা বাণিজ্য সংক্রান্ত সংবাদ। আজকাল যাকে বলে চালান বা ইনভয়েস।
-ফলকটা কিসের তৈরি? কোথায় আছে ওটা?
-ফলকটা ব্রোঞ্জের। মাপ হচ্ছে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া সাত ইঞ্চি লম্বা। ওটা এখন আছে লন্ডনের জাদুঘরে। মোহেনজোদাড়ো এবং হরাঙ্গা পাকিস্তানে। তাই পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে ওটা দাবি করছেন। শুনেছি, ফলকটা শিগগির ফেরত দেওয়া হবে।
–আপনি কোত্থেকে ফলকের নকল সংগ্রহ করেছিলেন?
ডঃ আলুওয়ালা হাসলেন। আমার বরাত বলতে পারেন। বাবা ছিলেন লারকানার স্টেশন মাস্টার। এখন তো লারকানা বিরাট শহর। পাকিস্তানের পরলোকগত প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাড়ি ওখানে। আমার ছেলেবেলায় লারকানা ছিল অখাদ্য জায়গা। যাই হোক, বাবার একটু-আধটু পুরাতত্ত্বের বাতিক ছিল। স্যার জন মার্শাল ভারতে ব্রিটিশ সরকারের পুরাতত্ত্ব দপ্তরের কর্তা ছিলেন তখন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তার অধীনে এক কর্মচারী। রাখালদাসের সঙ্গে বাবার খুব বন্ধুত্ব ছিল। সেই সুত্রে বাবা ওঁরই কাছ থেকে এই ব্রোঞ্জের ফলকের একটা অবিকল
নকল জোগাড় করেছিলেন। সেটা এখনও আমার কাছে আছে। দেখাচ্ছি।
বলে ডঃ আলুওয়ালা উঠলেন। ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। এতক্ষণে আমি আবার কর্নেলকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম,–হ্যালো ওল্ড বস! ব্যাপারটা কী বলুন তো?
-চুপ, চুপ! আমাকে বস বলে ডেকো না।
–তাহলে কি টিকটিকি বলে ডাকব?
–কিছু না। স্রেফ কর্নেল বলে ডাকবে।
–বেশ। কর্নেল স্যার, এবার বলুন তো সাতসকালে আমাকে ঘুম থেকে তুলে কেন এই গোরস্থানে নিয়ে এলেন?
-–গোরস্থান! … কর্নেল চাপা হাসলেন : তুমি ঠিকই বলেছ জয়ন্ত। মোহেনজোদাড়ো কথাটার মানে মৃতদেহের স্তূপ।
–এবং এই ডঃ আলুওয়ালা দেখছি সেই গোরস্থানের এক মামদো ভূত!
–ছিঃ ছিঃ! মহাপণ্ডিত মানুষ উনি!
যাই বলুন, হাজার হাজার বছর আগের ব্যাপার নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামান, তাঁরা মামদো ভূত নয়তো কী? বর্তমানেই আমাদের কত রকম সমস্যা! তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে কাজ হত। তা নয়, মোহেনজোদাড়ো!
–উঁহু, মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া।
–সে ঘোড়াও তো কত হাজার বছর আগে মরে ভূত হয়ে গেছে। তা ছাড়া এখন ঘোড়ার মূল্য কী? এটা যন্ত্রযুগ। বড়জোর রেস খেলায় বাজি ধরে যারা, তারা ঘোড়া নিয়ে মাথা ঘামায় দেখেছি। আপনি কি ইদানীং রেসুড়ে হয়ে উঠেছেন? ছ্যা ছ্যা!
জয়ন্ত ডার্লিং! তোমার কথাগুলো কিন্তু ভিন্ন অর্থে সত্যি। আমি সম্প্রতি মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া ভূতের পাল্লায় পড়েছি এবং রেসুড়েদের মতো পিছনে বাজিও ধরেছি।
এবার একটু চমকে উঠলুম। কর্নেলের কথার হেঁয়ালি আছে। কিন্তু আর প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম না। ডঃ আলুওয়ালা হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলেন। একেবারে অন্য রকম চেহারা। হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন,–তাজ্জব কাণ্ড কর্নেল! ফলকটা খুঁজে পেলুম না।
–সে কী!
–শুধু তাই নয়, শোবার ঘরের যে আলমারির লকারে ওটা রেখেছিলুম, তার তালা ভাঙা। আলমারির পাল্লার তালা কিন্তু ঠিক আছে।
–ভারি আশ্চর্য তো!
–অতি আশ্চর্য! গত রাতেও দেখেছি, লকারটা ঠিক আছে। এখন দেখি তালা ভাঙা। কে এমন সাংঘাতিক কাজ করল বুঝতে পারছি না!
–আর কোনো জিনিস চুরি গেছে কি?
–না। আমার স্ত্রীর গয়নাগাটি এবং কিছু নগদ টাকা ছিল। সব আছে।
–আপনার স্ত্রী কিছু বলতে পারছেন না?
–আমার স্ত্রী গতকাল সকালে বোম্বাই গেছেন মেয়েকে নিয়ে। বাড়িতে আমি একা।
–আপনার চাকর আছে দেখলুম!
–ও! হ্যাঁ! বৈজু আছে বটে। কিন্তু সে তো খুব বিশ্বাসী ছেলে। প্রায় মাস তিনেক হল, তাকে রেখেছি। বুঝতেই পারেন, আজকাল ভালো ঝি চাকর পাওয়া কত সমস্যা।
–বৈজুকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু?
–নিশ্চয় করব। বোধ হয়, বাজার করতে গেছে। ফিরে আসুক।
–আপনি দয়া করে বসুন, ডঃ আলুওয়ালা!
কর্নেলের কথায় উনি ধুপ করে বসলেন। উত্তেজনায় তখনও ওঁকে অস্থির দেখাচ্ছে। আমি বললুম,–পুলিশে জানানো উচিত।
কর্নেল বললেন, অবশ্যই। আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, ফলকের নকল চুরি করে কার কী লাভ হতে পারে?
ডঃ আলুওয়ালা জবাব দিলেন,–বুঝতে পারছি না। তবে একটা কথা, ওই ফলকটার ছবি কিন্তু এ যাবৎ কোনো বইয়ে দেখিনি। কোথাও কোনো উল্লেখও পাইনি। নেহাত বাবার খেয়াল ছিল, তাই সংগ্রহ করেছিলেন, এবং আমি দেখবার সুযোগ পেয়েছিলুম।
–লন্ডন মিউজিয়ামে যে আসল ফলকটা আছে, কী ভাবে জানলেন?
