হাসতে-হাসতে বললুম,–অর্থাৎ আপনার বাড়িতে আমার আজ ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্ন। তারপর!
কর্নেল কিছুটা চাপা স্বরে বললেন, তারপর আমরা জনৈক আলুওয়ালার কাছে যাব।
–কী সর্বনাশ! এবার আলুর গুদামে রহস্যের ইঁদুর ঢুকেছে নাকি?
–জয়ন্ত! হাতে সময় কম। এখনই চলে এসো।…
ঠিক এইভাবেই মার্চের সেই অদ্ভুত দিনটা শুরু হয়েছিল। অদ্ভুত বলছি, তার কারণ আমি কল্পনাও করিনি, জনৈক আলুওয়ালাসায়েবের পাল্লায় পড়ে একসময় আমাকে-হ্যাঁ, শুধু আমাকেই, কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে নয়, সুদূর কোনো দেশের মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে শুয়ে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করতে হবে।
তবে না। সে-কথা যথাসময়ে হবে। সেদিনকার কথা দিয়েই এই রোমাঞ্চকর কাহিনি শুরু করা যাক।
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ব্রেকফাস্ট করে এবং কফি খেয়ে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলুম। তারপর পৌঁছেছিলুম সত্যি সত্যি জনৈক আলুওয়ালাসায়েবের নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে। অবশ্য তাঁকে আমি এই কাহিনিতে আলুওয়ালা বললেও তার প্রকৃত পদবি আলুওয়ালিয়া।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর কর্নেল এবং তার মধ্যে যে-সব কথাবার্তা হয়েছিল, এবার তা বলা যাক্। …
–মোহেনজোদাড়োতে ঘোড়া? অসম্ভব। ওখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে এযাবৎ অনেক জন্তুর মূর্তি পাওয়া গেছে, ঘোড়ার কোনো চিহ্নই মেলেনি। এর একটাই মানে দাঁড়ায়। ওখানকার লোকেরা ঘোড়া নামে কোনো জন্তুর কথা জানত না। আর শুধু ওখানে কেন, হরাপ্পা, চানহুড়ো, কালিবঙ্গান থেকে শুরু করে, যেখানে-যেখানে সিন্ধু সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে, কোথাও ঘোড়ার মূর্তি দেখা যায়নি।
–আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, মোহেনজোদাড়োর ধ্বংসাবশেষ তত বাঙালি পুরাতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আবিষ্কার করেছিলেন। তাই না?
-হ্যাঁ। ১৯২১ সালে তিনিই সিন্ধুপ্রদেশের লারকানা থেকে মাইল বিশেক দূরে একটা বৌদ্ধ স্কুপ দেখতে পান। সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করার সময় টের পান, একটা শহরের ধ্বংসাবশেষ মাটির তলায় লুকিয়ে আছে। এর প্রায় একশ বছর আগে ওখান থেকে চারশ মাইল দূরে হরাপ্পার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছিল। তবে যাকে বলে বিজ্ঞানসম্মত খনন, তা শুরু হয় ১৯২১ সালে। তারপর …।
-একটা কথা জিজ্ঞেস করি ডঃ আলুওয়ালা। আপনার বাবা ওই সময় লারকানায় স্টেশন মাস্টার ছিলেন। তাই না?
-হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন?
–আপনার লেখা একটা প্রবন্ধ পড়ে। চমৎকার প্রবন্ধ।
–বাঃ। আপনার দেখছি পুরাতত্ত্ব বিষয়ক পত্রিকা পড়ারও নেশা আছে।
-আমি সবই পড়ি, ডঃ আলুওয়ালা। সত্যি বলতে কী, আপনার ওই প্রবন্ধ পড়েই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের লোভ সামলাতে পারিনি।
-হাঃ হাঃ হাঃ! এতক্ষণে বুঝলুম, কেন আমার কাছে এসেছেন। বাঁচালেন মশাই। এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলছি বটে, কিন্তু মনের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছিল প্রচণ্ড রকমের।
–সে কী! কেন, কেন?
–আপনার কার্ডটা দেখে। ওতে লেখা আছে : কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার। অর্থাৎ কিনা শখের গোয়েন্দা। দেখেই আমি চমকে উঠেছিলুম। আমার কাছে এই সাতসকালে গোয়েন্দা কেন রে বাবা? আমি নেহাত অধ্যাপক মানুষ। হাঃ হাঃ হাঃ! তার ওপর আপনার সঙ্গী ভদ্রলোক আবার খবরের কাগজের লোক। বলুন, অস্বস্তি হয় কি না!
এই সময় একটা লোক চা ও স্ন্যাকস্ নিয়ে এল ট্রে বোঝাই করে। ডঃ আলুওয়ালা তার থেকে ট্রে প্রায় কেড়ে নিলেন এবং টেবিলে রেখে সযত্নে কফি তৈরি করতে ব্যস্ত হলেন। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, কর্নেল ডঃ আলুওয়ালার বইঠাসা আলমারিগুলোর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। অপরাধতত্ত্ব থেকে প্রকৃতিতত্ত্বে এসে পৌঁছেছিলেন ইদানীং। এবার দেখছি পুরাতত্ত্বে ঝুঁকেছেন। হুঁ, এবার তত্ত্ববাগীশ না হয়ে ছাড়বেন না।
–চা নিন, কর্নেল।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বললেন,–আপনি মোহেনজোদাভোর একটা ফলকের হরফগুলো নাকি পড়তে পেরেছেন। দয়া করে সেটা যদি একবার দেখান, বাধিত হব।
ডঃ আলুওয়ালা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনাকে দেখাতে আপত্তি নেই। কিন্তু জয়ন্তবাবুকে একটা বিশেষ অনুরোধ করব।
বললুম,–নিশ্চয়, নিশ্চয়।
–দেখুন, জয়ন্তবাবু! সেই ১৯২২ থেকে এ পর্যন্ত দেশবিদেশের বড় বড় পণ্ডিত সিন্ধু সভ্যতার সময় নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছেন। সীলমোহর এবং ফলকের লেখাগুলো পড়তে পারলে হয়তো সঠিক সময় নির্ণয় করা যেত। কেউ বলছেন, এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার সালের, কেউ বলছেন, আরও পরবর্তী যুগের। আজ অব্দি সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যদিও মাঝে মাঝে কেউ কেউ দাবি করেন যে তিনি লেখাগুলো পড়তে পেরেছেন। আসলে সমস্যা কোথায় জানেন? সম্ভবত যে-ভাষার ওই লিপি, সেই ভাষাই হাজার হাজার বছর আগে লুপ্ত হয়েছে। যাই হোক, এই সমস্যার একটা সমাধানের পথ আমি খুঁজে পেয়েছিলুম। আপনারা চিত্রলিপির কথা নিশ্চয় জানেন? অতীত যুগে সূর্য বোঝাতে সূর্য আঁকা হত। পাখি বোঝাতে পাখি। মোহেনজোদাড়োর একটা ফলক নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করেছিলুম। সেটাতে কয়েকটা চিহ্ন দেখে আমার মনে হয়েছিল, এ নিশ্চয় চিত্রলিপি। চিহ্নগুলোতে ফসলের শীষ, লাঙল, বলদ, শস্যগোলা ইত্যাদির আভাস আছে যেন। এই সূত্র ধরেই ফলকটা আমি অনুবাদ করে ফেলেছি। কিন্তু এখনই হুট করে সেটা প্রচার করতে চাইনে। যদি ভুল প্রমাণিত হয়, উপহাস্যাস্পদ হব। তাই জয়ন্তবাবু খবরের কাগজের লোক বলেই বলছি, ফলকের অনুবাদটা যেন কাগজে ছেপে দেবেন না। আমি পত্রিকার প্রবন্ধে শুধু বলেছি, একটা ফলকের পাঠোদ্ধার করেছি বলে মনে করি। তার বেশি কিছু লিখিনি।
