কিন্তু এখনও কোথাও আলো জ্বলছে না।
এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে তুয়া যেখানে নিয়ে এল, দেখেই চিনতে পারলাম। সেই যন্ত্রঘর। কাঁচের দেয়াল। কিন্তু কোথায় ফাদার গ্রিনকট? কোথায় তার মিনিহুনের দল? কোথায় বা সেইসব হিংস্র হায়েনার পাল?
রাজা হোলাবোয়ার পাতাপুৈরী স্তব্ধ নির্জন। যন্ত্রঘরে যন্ত্রগুলো আছে। কিন্তু বড়-বড় কাঁচের পাত্র থেকে বাষ্প উঠছে না। কোনো আলোও জ্বলছে না। তারপর তুয়ার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। তুয়া সেই গোলাকার মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে যোবা মানুষের মতো গলার ভেতর শব্দ করছে–কান্নার মতো শব্দ।
মঞ্চে একটা কালো ছাইয়ের বিরাট স্তূপ দেখা যাচ্ছে। মারিয়া চেঁচিয়ে উঠলেন, সর্বনাশ। শয়তানটা ওদের পারমাণবিক আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।
জন বললেন,–কাদের? মিনিহুনদের?
মারিয়া কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, হ্যাঁ। শয়তান গ্রিনকট ওদের পুড়িয়ে মেরে পালিয়েছে। তুয়া! তুয়া! কোথায় গেল গ্রিনকট, খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। প্রতিশোধ নিতে হবে বাছা!
তুয়া অমনি চলতে শুরু করল। তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। হায়েনার খাঁচার পাশ দিয়ে যাবার সময় একই দৃশ্য দেখলাম। পলিনেশীয় এক বিচিত্র প্রজাতির হায়েনাদেরও সে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। একি জীববিজ্ঞানীর প্রতিহিংসা?
এবার অগ্নিদেবী পিলির মূর্তি সামনে পড়ল। তার ডাইনে সরু একটা গুহাপথ দিয়ে এগিয়ে বাইরের রোদ্দুর দেখা গেল।
তুয়া একটা ফাটল বেয়ে নামতে শুরু করল।
পিঁপড়ের সার যেমন করে নামে, তেমনি করে আমরা, পুলিশ-বাহিনী, সাংবাদিকরা, টিভির লোকেরা। নেমে গিয়ে মোটামুটি একটা সমতল বিশাল চাতালমতো জায়গায় পৌঁছিলাম।
হঠাৎ জ্যোৎস্না চেঁচিয়ে উঠল,–ও কী! বাবার সঙ্গে গ্রিনকট মারামারি করছে যে।
চাতালের আন্দাজ কুড়ি ফুট নীচে হ্রদের ধারে খানিকটা জায়গায় বালির বিচ। তার ওপর দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড বিক্রমে লড়ে যাচ্ছেন আংকল ড্রাম এবং ফাদার গ্রিনকট। জ্যোৎস্না লাফ দিয়ে যাচ্ছিল, তাকে ধরে আটকালাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে তুয়া ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে গ্রিনকটের ওপর।
ঢাকুচাচা ওপর দিকে তাকিয়ে আমাদের দেখে বিরাট হাসি হাসলেন। ঢাকের মতো গমগম করে বললে,–হুঁমুন্দিরে ধরছিলাম। এ বান্দরটা না আইলে অরে ডুবাইয়া ছাড়তাম ঠাণ্ডা পানিতে। হঃ! আমার নাম ঢাকু মিয়া! আমারে চেনে নাই হুমুন্দির পোলা।
হাসবো কী, তুয়া যা করল, দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
সে সরু লিকলিকে হাতে গ্রিনকটের গলা টিপে ধরে হ্যাঁচকা টানে ছুঁড়ে ফেলল হ্রদের জলে। তারপর জলের ভেতর হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল। একবারের জন্য ফাদার গ্রিনকটের পা দুটো দেখা গেল। তারপর তলিয়ে গেল চিরকালের মতো।
ঢাকুচাচা দেখতে-দেখতে বললেন,–হাঙরের পাল হুমুন্দিরে লইয়া গেল। যাউক! …
.
পদ্মার ইলিশ
পলিনেশীয় রাজা হোলাহুয়ার পাতালপুরী এতদিনে আবিষ্কৃত হয়েছে। হায়েনাটাউনে এবার পর্যটকদের ভিড় বেড়ে যাবে। ওদিকে জনখুড়ো দ্বিতীয় দফা অভিযান চালিয়ে সোনাগুলো উদ্ধার করেছেন। সরকারি কোষাগারে সেটা জমা পড়েছে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের দাবি, ওই সোনার দামে দ্বীপগুলোকে স্বর্গ বানাতে হবে। মারিয়া তুয়াকে নিয়ে স্যাক্রামেন্টোতে তার বাড়ি ফিরে গেছেন।
আমি ও বব চাচার রেস্তোরাঁয় ডিনার খাওয়ার নেমন্তন্ন পেয়েছিলাম। জ্যোৎস্না বলল,–বব! তোমার জন্য ঝাল কম দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দেশের নদী পদ্মার ইলিশ। একটু ঝাল না হলে ভালো লাগে না।
বব বলল,–আই উইল ট্রাই। তারপর একটু চেখেই ‘ও ফাদার গ্রিনকট’ বলে আর্তনাদ করল।
চাচা এসে বলল,–কী? পোলাড়া চিল্লায় ক্যান? হঃ বুঝছি, গ্রিনকট কইল না? তবে শোনেন।
চাচা তার দেশোয়ালি ভাষায় এবং ববের জন্যে তার নিজস্ব ইংরাজিতে অনুবাদ করে যা বললেন,–তা হল : সবাই যখন সামনের দিকে ফাদার গ্রিনকটকে ধরবে বলে তোড়জোড় করছে তখন উনি পেছনের দিকে ওত পেতে বসাই ঠিক মনে করেছিলেন। মোটর বোট থেকে মানিনিহোলা গুহার খোঁজে ওপরে উঠতে যাচ্ছেন, হঠাৎ ফাদার গ্রিনকট তার সামনে এসে পড়েছেন। হাবভাব দেখে চাচা তখুনি টের পেয়েছেন, এই সেই হুমুন্দি। অমনি জাপটে ধরেছেন তাকে।
বব ঝোল মুছে ইলিশ চুষতে চুষতে বলল,–ফাইন ফিশ। বাট নট বেটার দ্যান সার্ডিন।
চাচা বললেন,–বান্দরটা গ্রিনকটেরে না ধরলে আমি ধরতাম আর করতাম কী জানেন? আষ্টমন লঙ্কা বাঁইটা হেই ঝোলে চুবাইতাম। হঃ।
৪.৬ হিটাইট ফলক রহস্য
হিটাইট ফলক রহস্য – কিশোর কর্নেল সমগ্র ৪ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ব্রোঞ্জের ফলক চুরি
মার্চ মাসের এক ভোরবেলায় টেলিফোনের বিরক্তিকর শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। যথারীতি খাপ্পা হয়ে রিসিভার তুলে বলেছিলুম,রং নাম্বার।
অমনই আমার কানে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,–রাইট নাম্বার ডার্লিং! অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বসে বলেছিলুম,–মর্নিং ওল্ড বস! আসলে
-জানি, জানি। তুমি আটটার আগে ওঠ না। তবে আমি জানি, নাইট ডিউটি থাকলে ভোরে ঘুমন্ত সাংবাদিকদের কানের কাছে কামান গর্জন হলেও তাদের ঘুম ভাঙে না। যাই হোক, বোঝ যাছে, তোমার নাইট ডিউটি ছিল না।
–কিন্তু ব্যাপারটা কী?
–ব্যাপার না থাকলে এই বৃদ্ধ তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙায় না, তা তো তুমি জানো জয়ন্ত!
