টিহহ বুঝতে পারে না, ফস্টারের কাছে যে সিগারেটকেস ছিল–তা কেমন করে সুদূর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মাঠে মাটির তলায় গেল। সে আমার দিকে তাকিয়ে সেই প্রশ্নটা করল।
আমি বললাম, আমার ধারণা–ফস্টার ভেবেছিল, সুযোগমতো একা গিয়ে সোনা উদ্ধার করবে। সেই সময় তাকে ভারতে পাঠানো হয়। তার প্লেন দৈবাৎ ভেঙে পড়েছিল আমাদের গ্রামের সেই সামরিক বিমান ঘাঁটিতে।
টিহো বলল,–এতকাল পরে আপনার হাতে একটা সিগারেটকেস দেখলাম তাতে আমাদের পবিত্র রাজবংশের চিহ্ন! অমনি টের পেলাম, তা হলে এই সেই সিগারেটকেস! কিন্তু ওটা চুরি করে দেখি, ভেতরে অনেক লেখা অস্পষ্ট এবং মুছে গেছে। কাজেই ওটা পেয়েও খুব একটা সুবিধে হল না। তবু ভাবলাম, যেটুকু পড়া যাচ্ছে–তারই সূত্র ধরে খুঁজলে যদি সোনাটা পাই! কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য! কোথায় লুকিয়ে ছিল হিংস্র হায়েনার পাল। তারা আমাদের আক্রমণ করল।
অনেকক্ষণ কথা বলে টিহো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ডাক্তার এসে আমাদের বললেন,–আর নয়। আপনারা এবার আসুন। এভাবে কথা বললে ওকে বাঁচানো যাবে না।
আমরা বেরিয়ে এলাম। বব বলল,–ঠাকমাকে হোটেলে রেখে চলো আমার জনখুড়োর অবস্থা কী হল দেখি।…
.
ফাদার গ্রিনকট বনাম আংকল ড্রাম
ওয়েইকাপালি গুহার সামনে গিয়ে দেখি যেন যুদ্ধের ঘাঁটি। চারদিকে খাড়ির মাথায় হাজার-হাজার লোক দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছে। পাথরে ম্যাপ বিছিয়ে জনখুড়ো, পুলিশকর্তা গ্যাল্লার এবং আরও সব অফিসার তখনও জল্পনা করছেন। আমাদের সেখানে যাওয়ার বাধা ছিল না। কারণ আমরাই তো এই কাণ্ডের মূলে। উঁকি মেরে ম্যাপ দেখে জ্যোৎস্না বলল,–দেখছ জয়ন্তদা? ওয়েইকাপালি, ওয়াইকানালে আর মানিনিতোলা–এই তিনটে গুহার মধ্যে কেমন যোগাযোগ রয়েছে। এটা মিলিটারি ম্যাপ মনে হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য, যাঁরা গুহার ভেতর সার্ভে করে ম্যাপ এঁকেছেন, তার রাজা হোলাহুয়ার পাতালপুরীর হদিস পাননি! অথচ দেখে, কনটিকি এবং পিলির মূর্তি কোথায়, তাও ম্যাপে চিহ্ন দিয়ে বলা হয়েছে।
বব হঠাৎ লাফিয়ে উঠল–ইউরেকা।
পুলিশকর্তা গ্যান্সলার হাঁড়িপানা মুখ করে বললেন,–কী হে ছোকরা? লাফাচ্ছ কেন?
বব বলল,–তুয়া! তুয়াকে আনলেই তো সে পাতালপুরীতে নিয়ে যেতে পারে।
তুয়া! সেটা আবার কী বস্তু? গ্যান্সলার ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
জ্যোৎস্না বলল,–মিনিন। মারিয়া ঠাকমার মিনিহুনটার নাম তুয়া। তুয়াই তো আমাদের গাইড।
জনখুড়ো সোজা হয়ে বললেন,–মাই গড! এটা আমরা কেউ এতক্ষণ খেয়াল করিনি বব! শিগগির! ম্যাডাম মারিয়াকে গিয়ে বললো, এক্ষুনি ওঁর পোষা প্রাণীটিকে নিয়ে যেন চলে আসেন।
বব বলল,–তা যাচ্ছি। কিন্তু খুড়ো মশাই, তুয়াকে প্রাণী বলা কি ঠিক হচ্ছে?
জন ধমক দিয়ে বললেন,–সবটাতে তক্ক করা চইি! প্রাণী না তো কী? মিনিহুন আসলে অধুনালুপ্ত পলিনেশীয় বাঁদর। তবে তারা বুদ্ধিমান বাঁদর।
জ্যোৎস্না বলল,–অধুনালুপ্ত বলছেন কেন খুড়োমশাই? ফাদার গ্রিনকটের দেখা পেলে দেখবেন অসংখ্য মিনিন এখনও বেঁচে আছে পাতালপুরীতে।
বব পুলিশের মোটরবোটে চলে গেল। আমরা ওর ফিরে আসার পথে তাকিয়ে রইলাম। ইতিমধ্যে এসে গেল খবর শিকারী সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার আর টি.ভি. ক্যামেরা নিয়ে একদল লোক। মারকিন মুল্লুকে এদের প্রচুর স্বাধীনতা। পুলিশকে গ্রাহ্যও করে না। বরং পুলিশ জানে, এই সুযোগে তাদের নাম যেমন ছড়াবে, তেমনি টি.ভি-তে ঘরে ঘরে তাদের ছবিও লোকে দেখবে।
জনখুড়ো তাদের উদ্দেশে ঘোষণা করলেন,বন্ধুগণ! আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমাদের ‘পাতালপুরী অপারেশন’ শুরু হয়ে যাবে। এই পাতালপুরীতে আছেন এক ধুরন্ধর জীববিজ্ঞানী–তার নাম ফাদার গ্রিনকট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইনি বানরকে মানুষ এবং মানুষকে বানর করা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। শোনা যায়, হিটলারের হুকুমে তাকে জার্মান গুপ্তচরেরা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। হিটলারের উদ্দেশ্য ছিল, পৃথিবীর সব মানুষকে বার করে ছাড়বেন।
সবাই হেসে উঠল। জনখুড়োর সামনে গোটা পাঁচেক টিভি ক্যামেরার চোখ–এদিকে অনবরত ক্লিক-ক্লিক করে শাটার চলেছে কাগজের ফোটোগ্রাফারের। রিপোর্টাররা নোট করে যাচ্ছে কথাগুলো। আমিও কলকাতার প্রখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের রিপোর্টার। কিন্তু এদের আদিখ্যেতা দেখে হাসি পাচ্ছিল।
কতক্ষণ পরে বব ফিরে এল মারিয়া আর তুয়াকে নিয়ে তারপর ‘অপারেশন শুরু হল।
ওয়েইকাপালি গুহার ভেতর উজ্জ্বল আলো ফেলে সামনের সারিতে চলেছেন মারিয়া ও তুয়া, পেছনে সশস্ত্র পুলিশ হাতে সাবমেশিন গান, স্টেনগান, টমিমান, এমন কী কারুর হাতে গ্রেনেডও। তাদের পেছনে জনখুড়ো, আমি, বব ও জ্যোৎস্না। আমাদের পেছনে টিভি-র ক্যামেরা।
কনটিকির মূর্তি পেরিয়ে তুয়া বাঁয়ে ঘুরল। বাঁদিকে একটা সরু ফাটল। ফাটলে হাত ভরে সে একটা কিছু টানল। অমনি এবড়ো-খেবড়ো দেয়ালের খানিকটা অংশ ঘুরে গেল এবং ভেতরে এমনি চওড়া গুহাপথ দেখা গেল।
প্রায় আধঘণ্টা ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে একখানে তুয়া ফের তেমনি একটা সরু ফাটলে হাত ভরে কী টানল। এখানেও দরজার মতো ফাঁক হয়ে গেল দেয়াল।
ভেতরে মসৃণ বারান্দার মতো চওড়া খানিকটা জায়গা। তার সামনে কারুকার্যখচিত সুন্দর দরজা। তুয়া দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। তীব্র মিঠে গন্ধ ভেসে এল। পাতালপুরীতে ঢুকলাম আমরা।
