—যাক গে। প্রচুর জ্ঞান হল। কিন্তু বনবিহারী নৃসিংহের ছবি পেল কোথায়?
—ডঃ গুটেনবার্গ যখন নার্সিং হোমে ছিলেন, ওঁর পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাট থেকে ছবিটা চুরি গিয়েছিল। পরে যখন সে ডঃ গড়গড়ি সেজে আমাদের দলে ভিড়ল, ডঃ গুটেনবার্গ তাকে দেখে অবাক। আমি ওঁকে পরামর্শ দিলুম, চেপে যান। তবে বনবিহারী এ রিস্ক নিয়েছিল, কারণ তার চেহারা অবিকল ডঃ গড়গড়ির মতো। তাছাড়া সে ভেবেছিল, সাহেবদের এ ব্যাপারে ঠকানো সোজা।
একটু রাগ দেখিয়ে বললুম—তাহলে গোড়া থেকেই সব জানতেন অথচ আমাকে কিছু বলেননি। বললে আমি নজর রাখতুম ওর দিকে। অন্তত ডঃ গুটেনবার্গও যদি একটু আভাস দিতেন।
কর্নেল আমার একটা হাত নিয়ে আদর করে বললেন—বৎস জয়ন্ত! বেশি জানলে মাথার ঠিক থাকে না। মাঝে মাঝে মানুষের যত কম জানা হয়, তত মঙ্গল। যাক গে, তুমি অনেক হেনস্থা হয়েছ। মানুষ ও ইঁদুরের হাতে। এবার একটু বিশ্রাম করো। আর আসুন পরমেশবাবু, আসুন ডঃ গুটেনবার্গ। আমরা শাবল গাঁইতিতে হাত লাগাই। বদমাশ লুঠেরা ইঁদুরদের গর্ত থেকে লুঠের মালগুলো উদ্ধার করা যাক। নইলে কিছু খেতে পাব না।
তিনজনে শাবল ও গাঁইতি নিয়ে পাথরের চাতালে সেই ফাটলটার কাছে গেলেন। এবং হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে বড় বড় পাথরের টুকরো ওপড়াতে শুরু করলেন।
তারপরই তখনকার মতো বিদঘুটে দৃশ্য দেখা গেল। ইঁদুরগুলোর সঙ্গে তিনটি মানুষের জব্বর লড়াই বেধে গেল। তিনজনেই শাবল ও গাঁইতি চালিয়ে প্রচণ্ড পরাক্রমে ইদুরদের নিধনযজ্ঞে মেতে উঠলেন। বেগতিক দেখে বেচারারা কোথায় গা ঢাকা দিলে শেষমেশ।
সাতটা ইঁদুর হত। লেজ ধরে নিচে ছুড়ে ফেলা হল। আহতগুলো কোনওরকমে পালিয়ে গেল। আমি ক্যাম্পখাটে শুয়ে ব্যাপারটা খুব উপভোগ করলুম। কিছুক্ষণ পরে উদ্ধারকরা টিনগুলোর মুখ কেটে সবে সবাই খেতে বসেছি, হঠাৎ পাহাড়ের ওপর দিকে অমানুষিক জান্তব গর্জন শুনে চারজনে আঁতকে উঠলুম।
সেই ভয়ঙ্কর গর্জনের কোনও তুলনা হয় না। যেন একশোটা সিংহ একসঙ্গে আকাশ ফাটিয়ে পাহাড় কাঁপিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্তভাবে বললেন—চলে আসুন সবাই। নৃসিংহ ফাঁদে পড়েছে।
নৃসিংহ না গরিলা?
আগেই বলেছি, দ্বীপটা সমুদ্র থেকে পিরামিডের মতো মাথা তুলেছে এবং তার গায়ে আগাগোড়া ঘন জঙ্গল—কোথাও কোথাও ন্যাড়াপাথর আছে এই যা।
নৃসিংহের ফাঁদের কাছে পৌঁছতে প্রায় পাঁচশো ফুট চড়তে হল। ঢালু বলে তত কষ্ট হল না। সমুদ্রতল থেকে আন্দাজ আটশো ফুট উঁচুতে বলে সবসময় প্রচণ্ড জোরে হাওয়া বইছে। কিন্তু এখানে উঁচু উঁচু গাছের জঙ্গল রয়েছে। ফাদটা পাতা হয়েছে সেই জলপ্রপাতের দিকে। ফঁদ মানে একটা গভীর গর্তের মধ্যে শক্ত স্প্রিং দেওয়া জাঁতাকল। গর্তের ভেতরটা অন্ধকার। সেখান থেকে মুহুর্মুহু গর্জন করছে প্রাণীটা। কানে তালা ধরানো সেই গর্জন। হৃদপিণ্ডে খিল ধরে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছে আমার। গোটা পাহাড়টা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন—ডঃ গুটেনবার্গ! এবার আর দেরি না করে আপনার ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ুন।
ডঃ গুটেনবার্গ ওঁর রিভলভারের নলের মুখে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ এঁটে ট্রিগার টিপলেন। হিস্ করে একটা শব্দ হল।
প্রায় পাঁচমিনিট কেটে গেল। তারপর প্রাণীটার আর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
কর্নেল বললেন—আসুন, এবার গর্তে নেমে প্রাণীটাকে ভাল করে দেখা যাক। জয়ন্ত, তুমি চারদিকে নজর রেখে পাহারা দাও। সাবধান, এবার আর বোকামি কোরো না।
আমি বেজার মুখে বললুম-নৃসিংহ দেখার ইচ্ছে বুঝি আমার নেই?
কর্নেল হেসে বললেন—দেখবে বৎস, দেখবে। প্রাণভরে দেখতে পাবে। কীভাবে ওকে টেনে তুলব, আগে দেখে আসতে দাও।
ওঁরা তিনজনে গর্তের ধারের পাথর আঁকড়ে নামতে থাকলেন। গর্তটা খুব গভীর এবং প্রকাণ্ড। এ গর্ত কোন আদিম যুগে ভূমিকম্পের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে হয়তো। চারধারে ঘন ঝোপ ও গাছ থাকায় হঠাৎ কারও নজরে পড়া সম্ভব নয়। গর্তের মুখের উপর অনেকটা জায়গা জুড়ে ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে। তাই বেচারা নৃসিংহ আচমকা…
আমার ভাবনা বাধা পেল। না—আচমকা নয়। গর্তের এধারে অনেকগুলো সেই রাক্ষুসে ইঁদুরের টোপ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দেখতে পেলুম। ও হরি! তাহলে নৃসিংহ এইসব ইঁদুর কড়মড়িয়ে খেয়েই বেঁচে আছে। একেকটা ইঁদুরের ওজন কমপক্ষে দু আড়াই কিলোর কম নয়। কটা খেলে ওর পেট ভরে কে জানে।
ইঁদুরের লোভেই বেচারা হুড়মুড় করে এসে ফাঁদে পড়েছে। নিশ্চয় ওর এই খাদ্যের ব্যাপারটা ডঃ গুটেনবার্গ জানতেন।…
এই সময় হঠাৎ আমার চোখ গেল এই দ্বীপ পাহাড়ের পূর্বে সমুদ্রের দিকে।
দেখি, একটা ছোট্ট স্টিমবোট ঢেউয়ে দুলছে। স্টিমবোটের গড়ন একটা লম্বাটে মাকুর মতো। ওতেই কি টংকু আরেগোনা বা অর্জুনের লোকেরা এসেছে? দেখে মনে হল, বোটটা অপেক্ষা করছে ওদের জন্যে।
আমি বোটের দিকে নজর রেখেছি, এমন সময় আমার পিছনে কোথাও একটা শব্দ হল। সম্ভবত একটা পাথর গড়াতে গড়াতে পড়ল। অমনি ঘুরে দাঁড়ালুম।
এক পলকের জন্য দেখলুম, ওপারে গাছপালার মধ্যে একটা বড় পাথরের আড়ালে ডঃ গড়গড়ির মুখটা স্যাৎ করে সরে গেল। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম—হ্যালো বনবিহারীবাবু!
অমনি আমার দুপাশে দুমদাম আওয়াজ করে কেউ গুলি ছুড়ল। একলাফে গর্তের ধারে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে ডাকতে থাকলুম-কর্নেল! কর্নেল!
