পরমেশবাবু বললেন–হ্যাঁ, এ ব্যাপারে কিছুটা পরীক্ষা করে দেখার পরই ওই সিদ্ধান্তে এসেছিলুম। ধরুন, দুর্ঘটনার ফলে কারও মাথায় আঘাত লাগল এবং পরিণামে মস্তিষ্কের রোগ দেখা দিল। কিংবা মনে করুন, আগের সব কথা সে ভুলে গেল। সেক্ষেত্রে তার মস্তিষ্ক বদল সম্ভব। তবে মানুষের বেলায় কিন্তু মুশকিলটা কী হবে জানেন? সুস্থ মস্তিষ্ক পাওয়া যাবে কোথায়? রামের মাথায় আঘাত লেগে মগজ বিগড়েছে বলে শ্যাম তো নিজের মগজ দান করতে যাবে না। কারণ তার মানে তাকে মরতে হবে! অবশ্য একটা উপায় আছে। কোনও সদ্যমৃত মানুষের মস্তিষ্ক ব্যবহার করা যায়। কিন্তু তাই বা তার আত্মীয়রা দিতে চাইবেন কেন? – কর্নেল একটু হেসে বলেন—এই মগজ বদল নিয়ে উপভোগ্য গল্পের বই আছে। যাকগে, পরমেশবাবু, আপনার পরীক্ষার কথা বলুন।
পরমেশবাবু বললেন—আমি একটা কুকুরের মগজ বদল করেছিলুম। দুটো কুকুরই দুর্ঘটনায় মারা পড়েছিল। একটার মাথা অক্ষত ছিল, অন্যটার মাথা ট্রাকের চাকার ধাক্কায় জখম হয়েছিল। আমি দ্বিতীয় কুকুরটার মাথা অপারেশন করে প্রথম কুকুরটার মগজ বসিয়ে দিয়েছিলুম।
কর্নেল আগ্রহে বললেন—তারপর, তারপর?
–কুকুরটা ঘণ্টা দশেক বেঁচে ছিল। তারপর মারা যায় ফের। তবে দেখুন, শুধু মগজ কেন, মানুষ হয়তো একদিন পুরো মাথাই বদলাতে পারবে। উদোর মাথা বুধোর ঘাড়ে বসিয়ে দেবে! কেন? আমাদের পৌরাণিক গল্পে গণেশের মাথার আশ্চর্য কাহিনী ভুলে যাচ্ছেন? শনির দৃষ্টি লেগে গণেশের মাথাটি উড়ে গেল। তখন ঐরাবতের মাথা কেটে এনে জোড়া দেওয়া হল! গণেশের মাথাটি তাই হাতির। আমার কেমন যেন সন্দেহ, প্রাচীন ভারতের শল্য চিকিৎসকরা সম্ভবত এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তা না হলে এমন কাহিনীর অর্থ কী?
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—আমি কিন্তু ওটা কাহিনী বলে মনে করিনে। ওটা একটা প্রকৃত ঘটনা!
কর্নেল বললেন—কেন বলুন তো?
ডঃ পুরকায়স্থের বাবা এই দ্বীপে দশাবতার ফলক কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। এই দ্বীপেই আমরা নৃসিংহের মতো বিচিত্র প্রাণীর দেখা পেয়েছি—যার মূর্তি ওই ফলকে ছিল এবং সম্প্রতি চুরি গেছে।
—আপনি কী বলতে চান ডঃ গুটেনবার্গ?
–ধরুন, এই প্রাচীন অধিবাসীরা শল্যবিদ্যায় এত দক্ষ ছিল যে তারা মানুষের ধড়ে সিংহের মুণ্ডু বসিয়ে এই নৃসিংহ নামক প্রাণী সৃষ্টি করতে পেরেছিল এবং সেই নৃসিংহের বংশধরকে আমরা দেখতে পেয়েছি।
—বেশ। তাই মানলুম। তারপর?
–কে বলতে পারে, ওই দশাবতার ফলকে নৃসিংহ মূর্তিটির মধ্যেই শল্যবিদ্যার সেই রহস্যময় পদ্ধতি সাংকেতিক ভাষায় দ্বীপবাসীরা রেখে গেছে কি না!
—আপনার কথায় যুক্তি আছে! বলে যান ডঃ গুটেনবার্গ!
—আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি যে কুখ্যাত টংকু আরেগোনার দলের কথা বললেন—যারা দেশবিদেশের চোরাই প্রত্নদ্রব্যের কারবার করে তারা কোনও সূত্রে দশাবতার ফলকে নৃসিংহ মূর্তির মধ্যে সাংকেতিক লেখাগুলোর রহস্য টের পেয়েছে এবং তাই সেই পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। অতএব আপনি ওদের জন্য নৃসিংহ সৃষ্টি করে দেবেন।
আমি অবাক হয়ে বললুম–ওরা নৃসিংহ নিয়ে করবেটা কী?
জবাবটা দিলেন কর্নেল। হাসতে হাসতে বললেন—জয়ন্ত, নৃসিংহের চেয়েও বিচিত্র প্রাণী এই মানুষ। সবাইকে তাক লাগিয়ে কিছু করতে পারলে সে আর কিছু চায় না। বিশেষ করে টংকু আরেগোনা শুনেছি খুব খামখেয়ালি লোক। সে হয়তো ভেবেছে, এরপর নৃসিংহ-চালানী কারবার ফেঁদে বসবে।
–কী কাণ্ড! কিনবেটা কে?
–কেন? সার্কাস কোম্পানিগুলো কিনবে। আর কিনবে সারা বিশ্বের সব চিড়িয়াখানা।
ডঃ গুটেনবার্গ বললেন— আপনার কথায় তামাশার সুর থাকলেও সত্যি হতে পারে। কর্নেল বললেন—আলবাৎ পারে। টংকু আরেগোনা খুব খামখেয়ালি লোক। একবার তার মাথায় কিছু ঢুকলে তাই নিয়ে পাগল হয়ে যায়। সিঙ্গাপুরে তার কিউরিও শপে একবার আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। আরেগোনা কথাটা যে আসলে অর্জুন, তার কাছেই শুনেছি। সে খুব গর্ব করে বলেছিল—জানেন কর্নেল? আমার পূর্বপুরুষরা ভারতেরই লোক।
এবার আমি বললুম—কিন্তু কর্নেল, আপনার তো দিব্যি গল্পগাছা চালাচ্ছেন—এদিকে ডঃ গড়গড়ি বেচারার কী হল, খুঁজে দেখা উচিত নয় কি?
কর্নেল হো হো করে হেসে উঠলেন। আমি তো অবাক।
ডঃ গুটেনবার্গ বলনে—জয়ন্তবাবু, ডঃ গড়গড়ির জন্য ভাববেন না।
—সে কী?
—উনি আপনাকে বোকা বানিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন আসলে। ওঁর পদস্খলন এবং পতন একটা চালাকি।
—তার মানে?
–কর্নেল বললেন—ডার্লিং! ডঃ হরিহর গড়গড়ি বহাল তবিয়তে কলকাতায় রয়েছেন। ডঃ গড়গড়ি আমার কাছে গিয়েছিলেন নৃসিংহের ছবি নিয়ে তিনি—অর্থাৎ আমাদের সঙ্গে যিনি এসেছিলেন স্রেফ নকল ডঃ গড়গড়ি। আমারই পরামর্শে ডঃ গুটেনবার্গ ওঁকে জাল জেনেও অভিনয় চালিয়ে যান।
—অসম্ভব! ডঃ গড়গড়িকে আমি চিনি! আমার ভুল হতে পারে না। আমি ওঁকে একবার…
-বৎস জয়ন্ত, কবে একবার দেখেছ এবং সম্ভবত এশিয়াটিক সোসাইটির সভায় দূর থেকে বক্তৃতা নোেট করেছে—তাই দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না।
—কিন্তু চেহারা তো মনে আছে। ধরে নিচ্ছি, মাইক্রোফোনে আসল কণ্ঠস্বর না হয় ধরা যায়নি।
—হুঁ, এই নকল লোকটি আসল লোকের মতো দেখতে, এই যা।
-–ওরে বাবা! বলেন কী! এই জাল গড়গড়ি লোকটা কে তাহলে?
—লালবাজারের গোয়েন্দাকর্তা আনোয়ার খানের কাছে পরমেশবাবুর সেই ঠাকুরমশাই সব কবুল করেছেন। ফলক চুরি ঠাকুরমশাই করেছিলেন জাল গড়গড়ি অর্থৎ শ্ৰীযুক্ত বনবিহারী রায়ের টাকা খেয়ে। এই রায়মশাই একজন কুখ্যাত চোরাচালানী পাণ্ডা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও হংকং থেকে প্রচুর জিনিস চোরাচালানে ভারতে যায়। সেই সূত্রে টংকু আরেগোনার সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ ছিল।
