বলে পকেট থেকে আমার সিগারেটকেস বের করলাম।
জনখুড়ো আমা সিগারেটকেসটার দিকে তাকিয়েই কেমন যেন চমকে উঠলেন। তারপর খপ করে ওটা প্রায় কেড়ে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে থাকলেন। আমি তো হতভম্ব। বব মিটিমিটি হেসে বলল,দেখছ কী জায়েন্টো! খুড়োর তোমার সিগারেটকেসটির মধ্যে নিশ্চয় হাজার-হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে গেছেন। খুডোমশাই প্রাচীন ইতিহাসের দিগগজ পণ্ডিত কি না। দেখবে, হয়তো তোমার সিগারেটকেস নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার বক্তৃতা দিতে দৌডুবেন।
ভাইপোর তামাশার দিকে মন নেই জনখুডোর। সিগারেটকেসটা খুলে উনি সিগারেটগুলো বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর জানলার কাছে গিয়ে ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে-দেখতে বললেন,–হুম! জয়ন্ত, এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে? নিশ্চয় লস এঞ্জেলিসের কোনো কিউরিও শপে?
বললাম,–না খুড়োমশাই। কিউরিও শপের জিনিসের দাম দেবার পয়সা কোথায় আমার? সিগারেটকেসটা আমি পয়সা দিয়ে কিনিনি। ওটা আমার এক বাল্যবন্ধুর উপহার।
জনখুড়ো উত্তেজিতভাবে বললেন,–বাল্যবন্ধু! কে সে বাল্যবন্ধু?
বললে কি চিনবেন?–হাসতে-হাসতে বললাম : সে থাকে পশ্চিমবঙ্গের এক অজ পাড়াগাঁয়ে। নিছক চাষাভুষো মানুষ। গাঁয়ের পাঠশালায় আমার সঙ্গে দিনকতক অ আ ক খ শিখেছিল। তারপর পড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে জমি চষতে গিয়েছিল। আর পড়াশোনা হয়নি তার। বছর দুই আগে কলকাতা থেকে গাঁয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম–তখন সে এটা উপহার দিয়েছে।
জন নর্থব্রুক আমার মুখোমুখি বসে তেমনি উত্তেজনায় প্রশ্ন করলেন,–আশ্চর্য! সে কোথায় পেল এ জিনিস?
মাঠে জমি চাষ করতে গিয়ে লাঙলের ফালে এটা মাটির তলা থেকে উঠে এসেছিল। এবার একটু গম্ভীর হয়েই জবাব দিলাম। আমার বিস্ময়টা বেড়ে যাচ্ছিল, তাই।
জনখুড়ো চিন্তিতভাবে বললেন,–এ বড় আশ্চর্য জয়ন্ত! এখন আমার মনে হচ্ছে, যেন তোমার এই কাউয়াই দ্বীপের হায়েনা উপনগরীতে ছুটে আসার মধ্যে নিয়তির অনিবার্য টান টের পাচ্ছি। জয়ন্ত, এই সিগারেটকেস এখানকারই পলিনেশীয় জাতির লোকেরা তৈরি করে। এই দেখো, খুদে হরফে লেখা আছে ‘মেড ইন হায়েনা’। কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, এর গায়ে প্রাচীন পলিনেশীয় ভাষায় লেখা কয়েকটা কথা। ‘আহোয়ায়ালোয়া’। তার পাশে দেখতে পাচ্ছ এই চিহ্নটা? একটা ত্রিভুজের মাথায় যেন চন্দ্রকলা আঁকা। বড় রহস্যময় ব্যাপার জয়ন্ত! আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
খুড়ো মুঠোয় সিগারেটকেসটা আঁকড়ে ধরে চোখ বুজে কী যেন ভাবতে লাগলেন। বব আমার দিকে চোখ টিপে কী ইশারা করল এবং মিটিমিট হাসতে লাগল।
চোখ খুলে জনখুড়ো বললেন,–কাছিমজাতীয় একরকম সামুদ্রিক প্রাণীর খোলা থেকে এসব সিগারেটকেস তৈরি করে ওরা। আমার চোখে পড়েছিল ওই ত্রিভুজের মাথায় চন্দ্রকলা চিহ্নটা। এটা এই দ্বীপের আদিম রাজার প্রতীকচিহ্ন। আর ‘আহোয়ায়ালোয়া’ কথাটার মানে এর ভেতরে গোপন বৃত্তান্ত আছে। আমি বুঝতে পারছি না, এটা ভারতের একটা গ্রামের মাঠে চাষের জমিতে কীভাবে গেল?
আমিও ব্যাপারটা ভাবছিলাম। এতক্ষণে হদিস মিলে গেল। বললাম,–জনখুড়ো! একটা যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছি মনে হচ্ছে। আমাদের গ্রামের যে মাঠে জিনিসটা আমার চাষীবন্ধু কুড়িয়ে পেয়েছিল, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটা সামরিক বিমানঘাঁটি বানানো হয়েছিল। তখন আমি নেহাত বাচ্চা। শুনেছি, একদিন একটা ছোট্ট প্লেন কীভাবে সেখানে আছড়ে পড়েছিল নামবার সময়। প্লেনটায় আগুন ধরে যায়। পাইলট বা তার সঙ্গীরা কেউ বাঁচেনি। এখন মনে হচ্ছে, এই সিগারেটকেসটা তাদেরই কারুর কাছে ছিল। যেভাবে হোক, ওটা ধ্বংসস্তূপে টিকে গিয়েছিল। তারপর বিমানঘাঁটিটা যুদ্ধের শেষে উঠে যায়। অনেকবছর পরে জমিতে চাষ পড়ে। তখন সিগারেটকেসটা বেরিয়ে আসে লাঙলের ফলায়।
জন সায় দিয়ে বললেন,–ঠিক ঠিক। বোঝা গেল সব। এ নিশ্চয় কোনো আমেরিকানের কাছে ছিল। কিন্তু জয়ন্ত, আবার বলছি–যেন তুমি নিয়তির টানেই ছুটে এসেছ হায়েনাতে। কারণ হায়েনার আদিম রাজার প্রতীক-চিহ্ন আঁকা সিগারেটকে তোমার কাছে।
ভয় পেয়ে বললাম,–ওরে বাবা! নিয়তি-নিয়তি শুনলে বুক ঢিপঢিপ করে কাঁপে যে!
বব বলল,–খুড়ো! ওই হোয়া হোয়াহোয়া ব্যাপারটা কী বলছিলেন যেন?
জন বললেন,–তামাশা নয় বব! কথাটার মানে এর ভেতরে গোপন বৃত্তান্ত আছে। তার মানে এই সিগারেটকেসটার ভেতর আদিম রাজা হোলাহুয়া সংক্রান্ত কোনো গোপন বিবরণ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তা প্লেন দুর্ঘটনার সময় নষ্ট হয়ে গেছে। কিংবা ..
বাধা দিয়ে বললাম,জনখুড়ো! আমার চাষীবন্ধু বলেছিল এর ভেতর দলাপাকানো শক্ত কিছু জিনিস ছিল। সেগুলো সে ধুয়ে সাফ করেছিল।
জন বললেন,–হুঁ। যা ভেবেছি, তাই।
বব বলল,–দলাপাকানো শক্ত জিনিসগুলো সিগারেট ছাড়া কিছু নয়।
জন ভাইপোর দিকে তাকিয়ে বললেন,–হ্যাঁ-হ্যাঁ। তা হতে পারে জয়ন্ত, জিনিসটা আমি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। তোমার কি আপত্তি আছে?
আমি বলার আগেই বব বলে উঠল,–জায়েন্টো খুব ভালো ছেলে। ওর কোনো আপত্তি নেই। আপনি ওটা নিয়ে গবেষণায় লেগে যান। ততক্ষণ আমি জায়েন্টোকে নিয়ে একবার চক্কর দিয়ে আসি।
