জন রাগ করে বললেন,–আবার তুমি একটা বিপদ না বাধিয়ে ছাড়বে না বাপু! সেবারকার মতো আর তোমাকে আমি খুঁজতে বেরুব না বলে দিচ্ছি। হায়েনার গুহায় মরে পড়ে থাকবে।
অবাক হয়ে বললাম, হায়েনার গুহা মানে?
জন বললেন,–কাউয়াই দ্বীপের উত্তর উপকূলে একটা এলাকার নাম হায়না। ওখানে সমুদ্রের খাড়ির মাথায় অসংখ্য গুহা আছে। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি মিঃ জয়ন্ত চৌধুরী, কক্ষণও ববের কথায় ভুলে ওর পাল্লায় পড়বেন না।
বব আমার দিকে চোখ টিপল। ঠোঁটের কোণায় হাসি। বললাম,–আচ্ছা অধ্যাপকমশাই, মিনিহুন যদি সত্যি না থাকে, এমন গুজব রটল কেন? আমাদের বাংলার প্রবাদ হল–যা রটে, তা কিছু-কিছু সত্যি বটে।
জন বললেন, আমার ধারণা, আফ্রিকার পিগমিদের মতো বেঁটে একজাতের আদিম অধিবাসী ছিল হাওয়াই এলাকায়। কয়েকশ বছর আগে তারা লুপ্ত হয়ে গেছে। গল্পটা তাই রটে আসছে। যদি আমাদের সঙ্গে যান কাউয়াই দ্বীপে, গিয়েই শুনবেন মিনিহুন নিয়ে লোকেরা গল্প করছে। এমন কী, গাইডগুলো পর্যন্ত হলফ করে আপনাকে ‘মিনিহুন’ দেখাতে নিয়ে যাবে। দেখবেন তো নবডংকাটি, খামোকা একগাদা পয়সা গচ্চা যাবে। গাইড আপনাকে সমুদ্রের খাড়ির মাথায় বসিয়ে রেখে বলবে, আপনি ওইখানটায় লক্ষ রাখুন-খুদে মানুষ দেখতে পাবেন। সময়মতো আপনাকে এসে নিয়ে যাব। আপনি তো বসে রইলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ব্যাটা কতক্ষণ পরে এসে বলবে, কী দেখতে পান নি? তা হলে আজ ওরা বেরোয়নি গুহা থেকে। আপনার বরাত! কালকে চেষ্টা করবেন। অনেকসময় হাজার ফুট নীচে পাথরের ওপর একরকম সমুদ্র শকুন দেখিয়ে গাইড বলবে, ওই দেখুন! আপনি যদি বলেন, ওগুলো তো পাখি–তখন গাইডব্যাটা একগাল হেসে বলবে, মশায়ের চোখ খারাপ। পাখি হলে উড়ত না?
বব মিটিমিটি হেসে বলল,–কী জায়েন্টো চাউড্রি? যাচ্ছ তো আমাদের সঙ্গে।
বললাম,–হায়েনার গুহায় তোমার সঙ্গে ঢুকতে বেজায় লোভ হচ্ছে বব। কিন্তু আমার নামটা তুমি ভুল উচ্চারণ করছ। আমি জয়ন্ত চৌধুরী।
বব বিড়বিড় করে নামটা আওড়াতে থাকল। জানলায় দেখি প্রশান্ত মহাসাগরের নীল ঢেউ। আমাদের প্লেন সবুজ দ্বীপের ওপর চক্কর দিচ্ছে। হনলুলু এয়ারপোর্ট এসে গেল দেখতে-দেখতে।
.
সিগারেট কেসের রহস্য
খুড়ো ভাইপোর সঙ্গে আধঘণ্টা পরে ফের প্লেনে উঠলাম। কাউয়াই দ্বীপে পৌঁছতে মোটে সাতাশ মিনিট লাগল। এই এয়ারপোর্টের নাম লিহিউ। চারদিকে আখের ক্ষেত, মধ্যিখানে বিমানবন্দর। গেট পেরিয়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম তিনজনে। জনখুড়ো ট্যাকসি চালককে বললেন,–হায়েনা টাউনশিপ।
কাউয়াইকে বলা হয় উদ্যানদ্বীপ। সবুজ গাছে ভরা। দূরে হাজার পাঁচেক উঁচু পাহাড় মাউন্ট ওয়াইয়ালেয়ালে। আসলে দ্বীপটার চারদিকেই উঁচু পাহাড়। খাড়িগুলো বিপজ্জনক। কাউয়াইদ্বীপে তাই জাহাজ ভেড়ার জায়গা নেই। কয়েক মাইল দূরে জাহাজ রেখে ছোট ছোট বোটে দুঃসাহসীরা খাড়িতে যদি বা ঢুকতে পারে, তীরে ওঠা অসম্ভব। খাড়া পাহাড়। তাই এ দ্বীপের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ শুধু প্লেনে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে টমাস কুক এ দ্বীপে নামতেই পারেননি।
ছোটবড় গোটা আষ্টেক দ্বীপ নিয়ে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। আমেরিকার শাসনে রয়েছে। তাই আমেরিকায় ঘুরে যেমনটি দেখেছি, এখানেও তাই। সুন্দর সুন্দর চকচকে রাস্তাঘাটে পায়ে হাঁটা লোক নেই। এই কাউয়াই দ্বীপকে সত্যি একটা বাগানের মতো সাজিয়ে রেখেছে। হায়েনা উপনগরী পাহাড়ি টিলার গায়ে। উত্তর-পশ্চিম জুড়ে প্রশান্ত মহাসাগর। প্রায় হাজার ফুট নীচে সমুদ্রের জল গর্জন করছে। সাদা ফেনা দুলছে। ঝকে-ঝকে সমুদ্রপাখি উড়ছে। শব্দে কান পাতা দায়।
ততক্ষণে লিহিউতে নেমেই জনখুড়ো ফোন করে হোটেল বুক করেছেন। হোটেলের নাম কোকো পাম হোটেল। দোতলা হোটেল। ওপরতলায় আমি একটা সিঙ্গল স্যুট, খুড়োভাইপো একটা ডাবল সট ভাড়া করেছেন। এ হোটেলেও যা রাজকীয় বিলাস আর আরামের ব্যবস্থা, আমাদের দেশের সেরা হোটেলেও তা কল্পনা করা যায় না। জানলা দিয়ে খাড়ির নীচে সমুদ্র চোখে পড়ছিল। বিকেল-চারটে বেজে গেছে। পাশের ঘর থেকে ফোন করলেন জনখুড়ো। কফি খেতে ডাকলেন।
গিয়ে দেখি, নিজেরাই কফি তৈরি করেছেন। প্রতি ঘরে কফি তৈরির ব্যবস্থা আছে। কফি খেতে খেতে জন বললেন, কী মনে হচ্ছে? কাউয়াই স্বর্গোদ্যান না?
স্বীকার করলাম। … অবশ্যই মিঃ নর্থধ্রুব। এমন জায়গা থাকতে পারে, ভাবিনি। তা ছাড়া …
কথা কেড়ে বব বলল,–তুমিও আমার মতো ওঁকে আংকল জন বা জনখুড়ো বলতে পার জায়েন্টো! তাতে উনি রাগ করবেন না।
জনখুড়ো হাসিমুখে বললেন,–মোটেও রাগ করব না। তুমিও আমার ভাইপোর বয়সি জয়ন্ত! বললাম, আপনি তো দিব্যি জয়ন্ত উচ্চারণ করতে পারছেন, কিন্তু বব আমাকে জায়েন্টো বানিয়ে ছাড়ল। অথচ আমি জায়েন্টো বা দৈত্যের এক শতাংশও নই।
এই সময় দেখলাম বব সিগারেটের প্যাকেট বের করে খুড়োর দিকে বাড়িয়ে দিল। আমার চোখে এটা দৃষ্টিকটু। গুরুজনদের সিগারেট দেওয়া তো দূরের কথা, তাদের সামনেও আমরা ভারতীয়রা সিগারেট খাই না। কিন্তু সায়েবদের রীতিনীতি আলাদা। জন সিগারেট নিলেন, বব আমার দিকে এগিয়ে দিল প্যাকেট। বললাম,–ধন্যবাদ বব। আমি আলাদা ব্রান্ডের সিগারেট খাই। আমার কড়া সিগারেট পছন্দ।
