জনখুড়ো গম্ভীর মুখে বললেন,–যেখানে যাবে যাও, গুহা-টুহায় যেন ঢুকো না। সাবধান। আর জয়ন্ত, ও যদি কোনো গুহায় ঢুকতে চায়, তুমি ওর চুপ খামচে ধরে ঠেকাবে। বব চুলে জব্দ।
বব তার মাথায় লম্বা মেয়েলি চুলগুলো দুহাতে ঢেকে বলল,–জায়েন্টো, আমার চুলে কিন্তু বিদ্যুৎ আছে। শক মারবে। ছুঁয়ো না।
বলে সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বাইরে নিয়ে গেল।…
.
আংকল ড্রাম
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের নভেম্বর-শেষের আবহাওয়া ভারি মনোরম। কলকাতারই নভেম্বরের মতো। কিন্তু হুট করতেই বৃষ্টির বড় উপদ্রব। বেরুলাম যখন তখন চারদিকে ঝলমল করছে বিকেলের গোলাপি রোদ্দুর। সমুদ্রের দিকটা অবশ্য ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে। পাহাড়ের খাঁজে-খাঁজে চড়াই-উৎরাই রাস্তা। রেলিংঘেরা ফুটপাথের ধারে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। ফুলে-ফুলে ছয়লাপ, যেদিকে তাকাই। নীচের উপত্যকায় ঘন নারকোলবন। চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তায় পায়ে হাঁটা লোক কিছু-কিছু চোখে পড়ছিল। পৃথিবীর নানা দেশের পর্যটক ওরা। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের প্রাচীন অধিবাসী পলিনেশীয়রা খুব সেজেগুজে ঘুরছে। ওদের মেয়েদের গায়ে ফুলের পোশাক। চওড়া ফুটপাতে বা কোথাও ছোট্ট পার্কে ওরা নাচছে-গাইছে। পুরুষরা বাজনা বাজাচ্ছে। ভিড় জমে আছে। যেতে যেতে হঠাৎ কোত্থেকে বৃষ্টি এসে গেল। দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজতে সবাই ভালোবাসে। আমি আর বব বাদে।
বব আমার হাত ধরে টানতে-টানতে দৌডুল। একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঢুকলাম। ঢোকার সময় অবাক হয়ে দেখলাম, কয়েকটা ভাষার সঙ্গে বাংলাতেও বড় বড় হরফে লেখা আছে : ঢাকুচাচার রেস্তোরাঁ। পাশে ইংরেজিতে : আংকল ড্রামস রেস্তোরাঁ।
বললাম,–বব! বব! এটা বাঙালি রেস্তোরাঁ দেখছি।
বব বলল,–তাই বুঝি?
ভেতরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড ভুড়িওলা বেঁটে একটা লোক তম্বি করছিলেন ইংরাজিতে। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথায় বিশাল টাক। দেখামাত্র আমার প্রিয়তম বন্ধু সেই প্রখ্যাত ‘বুড়োঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কথা মনে পড়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। হায় কর্নেল! তুমি কোথায়, আর তোমার চিরনেওটা জয়ন্তই বা কোথায়? মাঝখানে দু-দুটো মহাসাগরের ব্যবধান-প্রশান্ত মহাসাগর আর ভারত মহাসাগর।
বব ফিসফিস করে বলল,–এ দেখছি আরেক আংলক। আমার আংকল জন, আর তোমার তা হলে এই বাঙালি আংকল ড্রাম। সত্যি ড্রাম বটে। ড্রামের মতো গমগম করে বাজছে শোনো!
প্রকাণ্ড পিপে-মানুষটা আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন কাউন্টার থেকে। পায়ের চাপে মাটি কাঁপার কথা। কিন্তু মেঝেয় পুরু নরম কার্পেট। কোণার দিকে ছোট্ট মঞ্চে বাজনাপার্টি বসে আছে। সেজেগুজে। অবাক হয়ে দেখলাম, মাইকের সামনে একটা শাড়িপরা বাঙালি মেয়ে এসে দাঁড়াল। তারপর মিঠে গলায় বাংলায় ভাটিয়ালি গেয়ে উঠল। তন্ময় হয়ে গেলাম। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এসে বাংলার ভাটিয়ালি শুনব কে ভেবেছিল?
পিপেমানুষটা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। পা থেকে মাথা অব্দি গমগমে গলায় এবং বিরাট হাসি মিশিয়ে বলে উঠলেন,–ঢাকা না কইলকাত্তা?
কলকাতা।
প্রকাণ্ড দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন,–হঃ। গন্ধ পাইয়াই বুজছি। আহা রে, কতকাল বাদে ভাইপোডারে পাইলাম। আয়েন, আয়েন। আর শোনেন, আমারে চাচা কইবেন। ঢাকুচাচা।
তারপর ববকে দেখিয়ে বললেন,–এ হালারে জোটাইলেন ক্যান? মাইয়ামাইনষের লাখন চুল রাখছে মাথায়। হালা বুত না প্যারত? মারকিনগুলান, বোঝলেন? ব্যাবাক জংলি।
বব কিছু আঁচ করছিল। ঢাকুচাচা এবার তার হাত নিয়ে জোরালো হ্যান্ডশেক করে নিজস্ব ইংরেজিতে বললেন, হ্যালো হ্যালো হ্যালো! আই অ্যাম ইওর আংকল ড্রাম!
বব মুচকি হেসে বলল, আমার একজন আংকল আছে। তবে জোড়া আংকলে আপত্তি নেই।
কাঁচের দেওয়ালের পাশে আমাদের বসিয়ে ঢাকুচাচা গল্প করতে লাগলেন। তার নাম মুঝঃফর হোসেন। ডাক নাম তার ঢাকু মিয়া। বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। সতেরো বছর ধরে নানা ঘাটের জল খেয়ে এই হায়েনাতে এসে জুটেছেন। পয়সাকড়ি হয়েছে। মা-মরা মেয়ে জ্যোৎস্নাকে এনেছেন গত বছর। ঢাকায় মামার কাছে থাকত এতদিন জ্যোৎস্না ভালো গাইতে পারে। এই এক বছরে নানাভাষায় গান শিখেছে সে। যে দেশের গান গায়, সেই দেশের পোশাক পরে। ঢাকুচাচা বললেন,–জ্যোৎস্না আইয়া আমার রেস্তোরাঁর বিক্রিবাটা খুব বাড়ছে। হঃ। আর আমার চিন্তা নাই। মাইয়াডার হাতেও রেস্তোরাঁর ভার দিয়া বাইরে ঘোরনের ফুরসত পাই। কাইল সকালে আসেন ভাইপো। আপনারে লইয়া বাইরামু।
চারমাস পরে বাংলায় মন খুলে কথা বলতে পেরে আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল। একটু পরে চাচা তার মেয়েকে ডেকে এনে আলাপ করিয়ে দিলেন। জ্যোৎস্না ফুটফুটে সুন্দরী। মাথার চুল ববছাঁট। ভারি মিষ্টিস্বভাবের মেয়ে। এক সময় সে আমাকে অবাক করে বলে উঠল,–আচ্ছা। এবার বলুন, আপনি একা কেন কাউয়াই দ্বীপে? সঙ্গে আপনার কর্নেল নেই কেন?
হাঁ করে আছি দেখে সে বলল,–বারে! জয়ন্ত চৌধুরী আর কর্নেলের অ্যাডভেঞ্চার আমি পড়িনি বুঝি? কলকাতায় আমার মাসির বাড়ি। যখন গেছি, একগাদা করে বই কিনে নিয়ে গেছি ঢাকায়। আমি অ্যাডভেঞ্চার আর গোয়েন্দা-কাহিনির পোকা।
প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে পাঠিকা পেয়ে যাওয়া আমার পক্ষে খুব আনন্দের। ববকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলে সে প্রশংসার চোখে আমাকে দেখতে লাগল, চাচা কাউন্টারে চলে গেছেন। রেস্তোরাঁয় ভিড় বাড়ছে ডিনার খেতে। এখানে লোকের ছটার মধ্যে ডিনার খাওয়া অভ্যাস। বব উসখুস করছে দেখলাম।
