–ঢিল পড়ত কেন?
–ওটাই অঘোরের বদমায়েসি। ভূতুড়ে আবহাওয়া তৈরি করতে চেয়েছিল বাড়িতে। রায়মশাই মুখে যা-ই বলুন, আমি খুব ভালো জানি, উনি ভূতপ্রেতে বিশ্বাসী। যদি নীলা চুরি ভূতের ঘাড়ে চাপানো যায়!
বলে কর্নেল বাইনোকুলারে সম্ভবত পাখি দেখে নিয়ে আবার হাঁটতে থাকলেন।…
***
একটু পরিশিষ্ট আছে। তা বলা দরকার। আমরা কলকাতা ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরে কর্নেল রায়মশাইয়ের একটা চিঠি পেয়েছিলেন। তাতে উনি লিখেছিলেন :
সম্প্রতি অঘোর বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে। সংসারে তার আর মন নেই। সদগুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে যাবে। হতভাগা কেন সন্ন্যাসী হবে, এটা আমার কাছে রহস্য। তবে এ রহস্য নিয়ে আমার মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আপনাকেও এ বিষয়ে মাথা ঘামাতে বলছি না। আর একটা কথা। যাবার আগে সে তার বাগানের চারাগাছগুলো উপড়ে ফেলে দিয়ে গেছে। …
৪.৫ হায়েনার গুহা
হায়েনার গুহা – কিশোর কর্নেল সমগ্র ৪ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
খুদে–মানুষ মিনিহুন
গায়ে পড়ে আলাপ করতে আমেরিকানদের জুড়ি নেই। লস এঞ্জেলিস থেকে প্লেনে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হনলুলু যাবার সময় এই মারকিন খুড়ো-ভাইপোর সঙ্গে খুব ভাব হয়েছিল। খুডোর নাম জন নর্থব্রুক। ভাইপোর নাম রবার্ট ওরফে বব। খুড়োর বয়স ষাটের কাছাকাছি। গায়ে গতরে সাদা হাতি বলা যায়। ভাইপোটি তার উল্টো। কতকটা আমার মতো রোগাটে। মাথাতেও প্রায় সমান-সমান। কথায়-কথায় ফিকফিক করে হাসে। ভারি আমুদে-ছোকরা।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের মাঝারি গড়নের প্লেন। জনা ষাটেক যাত্রী ধরে। মাঝবরাবর করিডোরের মতো যাতায়াতের পথ আছে এবং প্রতিসারে একদিকে তিনটে, অন্যদিকে দুটো করে আসন। তিনটে আসনের দিকে জানলার ধারে আসনটা আমার। বাকি দুটোয় সেই খুড়ো-ভাইপো।
জনখুড়ো আমার গায়ে। তিনিই গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মাফ করবেন। মশাই কি দক্ষিণদেশীয়? স্প্যানিশ, পর্তুগিজ?
আমেরিকানরা যখন ‘দক্ষিণদেশীয়’ বলে তখন বুঝতে হবে ওরা দক্ষিণ আমেরিকার কথা বলছে। এই ক’মাসে টের পেয়েছি, কী জানি কেন সবখানেই ওরা আমাকে স্প্যানিশ বা পর্তুগিজ ভাবে। ডেনভারে একজন আমাকে ইন্দোনেশিয়ার লোক ভেবেছিল। আসলে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে স্প্যানিশ বা পর্তুগিজদের গায়ের রঙ মোটেও ফর্সা নয়, বোদপোড়া তামাটে। বংশানুক্রমে ওদের পিতৃ-পুরুষদের ইউরোপীয় সাদা চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে দক্ষিণ আমেরিকার জলহাওয়ায় এবং কড়া রোদ্দুরে। তা ছাড়া সেখানে ভীষণ দারিদ্র। অপুষ্টিতে তাগড়াই গতর আমার মতো প্যাকাটি হয়ে গেছে অনেকের।
জনখুডোর প্রশ্নের জবাবে যখন নিজের পরিচয় দিলাম, তখন উনি ভারি অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, আমার এ ভুলের জন্যে দুঃখিত মিস্টার। তা হলে আপনি ক্যালকুট্টার লোক? আমার এক দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্যালকুট্টাতে ছিলেন। ওঃ! সে কত অদ্ভুত সব গল্প শুনেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ভাব হয়ে গেল। বিদেশ-বিভূঁয়ে–বিশেষ করে পথে যেতে যেতে কারুর সঙ্গে আলাপ হলে ভালোই লাগে। পথের ক্লান্তি টের পাওয়া যায় না। জন নর্থব্রুক নিজের পরিচয় দিলেন। উনি লস এঞ্জেলিসে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক। এমন পণ্ডিত লোকের সঙ্গে পরিচয় হওয়া খুব আনন্দের। ওঁর ভাইপো বব আমার মতোই পেশায় সাংবাদিক। এখন নভেম্বরের শেষাশেষি আমেরিকায় থ্যাংকস-গিভিং ডে’র উৎসব। তাই দিনতিনেক ছুটি। খুড়ো ভাইপো ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে।
জনখুড়ো বললেন,–আর আধঘণ্টার মধ্যেই আমরা হনলুলুতে নামছি। তা আপনি কি হনলুলুতেই থাকছেন?
বললাম,আমার ইচ্ছে, বিখ্যাত সমুদ্রতট ওয়াইকিকিতেই কোথাও থাকব।
জন হাসলেন। ওয়াইকিকি খুব সুন্দর জায়গা। সবাই ওখানেই যায়। কিন্তু আমি বলি কি, যদি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সত্যিকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাহলে চলুন আমাদের সঙ্গে কাউয়াই দ্বীপে।
বব গম্ভীর মুখে বলল,আমরা সেখানে মিনিন’ দেখতে যাচ্ছি।
বললাম,–মিনিহুন? সে আবার কী?
জন হাসতে হাসতে বললেন,–বব সব সময় তামাশা করে। মিনিহুন নিছক কল্পনা। আপনি নিশ্চয় বিখ্যাত বই গালিভারের ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়েছেন? তাতে লিলিপুট নামে খুদে মানুষদের কথা আছে। এই ‘মিনিহুন’ হল সেই রকম লিলিপুট মানুষ। আশ্চর্য, ক্যাপ্টেন টমাস কুক ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাউয়াই দ্বীপে এসেছিলেন–তিনিও স্বচক্ষে ওদের দেখেছেন বলে লিখে গেছেন। তারপর দুশো বছর ধরে এই গুজব সমানে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা মিনিন কেউ ধরে ফেলা তো দূরের কথা, ফটো পর্যন্ত তুলে দেখাতে পারে নি। কাজেই এটা নিছক গুলতাপ্পি। আসলে কথাটা এসেছে সম্ভবত মিনি থেকে। মিনি মানে খুদে। আর হুন হল সেই বর্বর ইউরোপীয় জাতের লোকের–যাদের নেতা ছিল অ্যাটিলা। হুনদের শরীর ছিল পেশীবহুল। গায়ে প্রচণ্ড জোর। আমাদের সেরা পালোয়ানকেও একজন মিনিন নাকি তুলে আছাড় মারতে পারে।
বব তেমনি গম্ভীর মুখে বলল,আমি কিন্তু এবার যাচ্ছি মিনিহুনদের ছবি তুলব এবং আমার খবরের কাগজে তাদের কথা লিখব। চাউড্রি (চৌধুরী), তুমিও কাগজের লোক। আমার সঙ্গী হও।
