-ওটা ছিল একটা রুপোর কৌটোর মধ্যে। আমি রুপোর কৌটো ওই আলমারিতে রেখে হোমিওপ্যাথি ওষুধ যে সাদা কাগজে দিই, তার মধ্যে মুড়ে রেখেছিলুম–যাতে চোরডাকাতের সন্দেহ না হয়।
কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বের করলেন। সেটা অ্যালুমিনিয়ামের। এ ধরনের কোটোয় লোকেরা দোক্তা খায় দেখেছি। কর্নেল বললেন,–এই কৌটোটা কার চিনতে পারছেন কি?
-না তো!
কৌটোটা নতুন কেনা।–বলে কৌটোর মুখ খুলে কর্নেল প্রায় মুর্গির ডিমের গড়ন একটা নীল পাথর টেবিলে রাখলেন। পাথরটাতে আলোর ছটা পড়ে ঝলমল করছিল।
রায়মশাই দুহাতে নীলাটা নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বললেন,–ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।
রায়মশাইয়ের চোখ জলে ভিজে গেল।
অবাক হয়ে বললুম,–এটা কার কাছে কোথায় হঠাৎ উদ্ধার করলেন?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–ওই কথাটা আমার বলা বারণ। রায়মশাই, রত্নটা এবার যত্ন করে ভালো জায়গায় রাখুন। কাঠের আলমারি নিরাপদ নয়। আপনার ঘরে গতবারে একটা ছোট সিন্দুক দেখেছিলুম। সেটা কোথায়?
রায়মশাই বললেন,–খাটের তলায় পড়ে আছে। বহুদিন ব্যবহার হয় না।
–ওটা ঐ সিন্দুকের মধ্যে রাখুন। কিন্তু সাবধান। ওঘরে আপনার অগোচরে কেউ যেন না ঢুকতে পারে। …
সে রাতে কর্নেলকে অনেক প্রশ্ন করেও জানতে পারলুম না, এত সহজে কী করে তিনি দশ লক্ষ টাকা দামের নীলা উদ্ধার করলেন।
সকালে উঠে দেখি, কর্নেল যথারীতি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। আজও আকাশে বৃষ্টিমেঘ ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন শরঙ্কাল। আমি ঘুম থেকে উঠে কফির বদলে চা খাই। চা খাওয়ার পর বেরিয়ে গেলুম। অঘোরবাবুর হাঁকডাক শোনা যাচ্ছিল। বাড়ির পূর্বদিকে গিয়ে দেখলুম, সেই ভুলু বাঁশ কেটে এনেছে এবং বেড়ার আয়োজন চলেছে। আমাকে দেখে অঘোরবাবু হাসলেন,–এতক্ষণে উঠলেন বুঝি? কর্নেলসায়েবকে মনে করুন একবার নীলকুঠির জঙ্গলে দেখলুম।
বললুম,–অঘোরবাবু! কাল সন্ধ্যায় বিশুবাবুর দেখা পেয়েছিলেন?
অঘোরবাবু বেজার মুখে বললেন,–না। মনে করুন সে বিকেলেই কেটে পড়েছিল।
চারাগুলো একরাত্রেই সতেজ হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে বললুম,–চারাগুলোর ডালে দড়ি বাঁধা আছে। কেটে ফেলা উচিত।
-হ্যাঁ। কেটে ফেলব। আর মনে করুন দুতিনটে দিন যাক্।
একটা চারার দুটো ডালে সাদা সুতো বাঁধা এবং একটা চিরকুট আটকানো দেখে বললুম,–এটা আবার কী?
–তা মনে করুন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের স্লিপ। গাছের নাম লেখা আছে। কিছুক্ষণ বেড়াবাঁধার কাজ দেখার পর বাড়ির ভেতর গেলুম। দেখলমু, কখন কর্নেল বাড়ির পশ্চিমদিক ঘুরে বাড়ি ঢুকেছেন। বললুম,–হালদারমশাই কেমন আছেন? যাননি সেচবাংলোয়?
কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন,–হালদারমশাই এতক্ষণ নীলপুর বাসস্টপে। সেচবাংলোয় গিয়ে দেখা করেছি। এ যাত্রা উনি অক্ষত শরীরে আছেন। তবে হরিপুরের বিশু যেতে দেরি করেছিল। রাত নটায় নৌকোয় হালদারমশাইকে দেখে সে খাপ্পা হয়েছিল। হালদারমশাই কিছু বলার আগে বিশু তাকে ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিয়েছিল। ওখানে অবশ্য হাঁটু পর্যন্ত জল। হালদারমশাই পাড়ের ঝোঁপ আঁকড়ে না ধরলে কী ঘটত বলা যায় না। যাই হোক, ব্রেকফাস্ট করে আমরাও বাসস্টপে যাব। উনি অপেক্ষা করবেন আমাদের জন্য।…
ব্রেকফাস্ট করে রায়মশাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে বেরুচ্ছিলুম। অঘোরবাবু এসে বললেন,–তা মনে করুন কোথায় চললেন স্যার?
কর্নেল বললেন,–কলকাতা ফিরতে হচ্ছে। চলি অঘোরবাবু! পরে আপনার বাগান দেখতে আসব।
অঘোরবাবু বললেন,–আজ্ঞে আসবেন বৈকি। তা মনে করুন বাগান আমার স্বপ্ন।…
শর্টকাটে বাসস্টপ যাবার পথে বললুম,–কর্নেল! নীলা উদ্ধারের রহস্যটা এবার না বললে মনে করুন
সাবধান জয়ন্ত!–কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন : ওই মনে করুন বড় সাংঘাতিক জিনিস। বাইনোকুলারে দূর থেকে দেখছিলুম, তুমি অঘোর অধিকারীর স্বপ্নের বাগানে দাঁড়িয়ে ছিলে। চারাগুলোর মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্য তোমার চোখে পড়েনি?
একটু ভেবে বললুম,–চারাগুলোর ডালে দড়ি বাঁধা ছিল। আর একটা চারার ডালে সাদা সুতোয় বাঁধা ছিল বনবিভাগের চিরকুট।
কর্নেল বললেন,–দোক্তার কৌটোয় নীলা ভরে অঘোর অধিকারী ওই চারাটার তলায় পুঁতে রেখেছিল। বিশুর সঙ্গে নিশ্চয়ই কথা হয়েছে। অঘোর এখনও জানে না তার চোরাইমালে বাটপাড়ি হয়েছে। তাই আহ্লাদে আছে। আসলে এটা আমার অঙ্ক, জয়ন্ত! এতকাল পরে হঠাৎ অঘোর অধিকারীর বাগান করার সখ হয়েছে! কতকগুলো চারা জোগাড় করেছে। কাল সন্ধ্যায় বেরিয়ে চিরকুটবাঁধা চারাটা ওপড়াতেই কৌটোটো টর্চের আলোয় চকচক করে উঠেছিল। ডার্লিং! এটা নিছক অঙ্ক। আজ জঙ্গলে অঘোরবাবু ভুলুকে একটা চিঠি পোড়াতে পাঠিয়েছিল। চিঠিটা রায়মশাই মেয়েকে লিখেছিলেন। অঘোর অধিকারী নিশ্চয়ই সব চিঠি খুলে পড়ে ফের আঠা এঁটে ডাকবাক্সে ফেলত। এভাবেই সে নীলাটার কথা জেনেছিল। যে চিঠিটা ভুলুকে দিয়ে সে গোপনে পোড়াতে পাঠিয়েছিল, ওতে রায়মশাই লিখেছিলেন, নীলাটা তিনি বুদ্ধি করে হোমিওপ্যাথির বাক্সে লুকিয়ে রেখেছেন। বয়স হয়েছে। হঠাৎ স্ট্রোকে মারা পড়লে তাঁর মেয়ে যেন এসে নীলাটা খুঁজে পায়। অঘোর এই চিঠি পড়েই স্বর্গ হাতে পেয়েছিল।
–এ-ও কি আপনার অঙ্ক?
–আজ ভোরে বেরুনো সময় কৌশলে রায়মশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, সম্প্রতি কোনো চিঠি তিনি ছেলে বা মেয়েকে লিখেছিলেন কি না এবং তাতে কী লিখেছিলেন? রায়মশাই জানিয়ে দিলেন। অঘোর অধিকারীকে দিয়েই সব চিঠি ডাকঘরে পাঠান উনি। কাজেই অঙ্কটা মিলে গেল।
