–আজ্ঞে না, না! সে কথা বলছি না। আপনি এসেছেন তাই মনে করুন বাড়িতে আর টিল পড়বে না রাতবিরেতে।
ঢিলপড়া নাকি গতরাত থেকে বন্ধ হয়েছে?
অঘোরবাবু চাপা স্বরে বললেন,–গতরাতেও মনে করুন ঢিল পড়েছিল। রায়মশাইকে কিছু জানতে দিইনি আমরা। কিনুদাকে জিজ্ঞেস করুন। জানলে গুলি খরচ করতেন। কার্তুজের যা দাম মনে করুন!
–আচ্ছা অঘোরবাবু, আপনি নীলপুরের হরেন দত্তর জামাই বিশুবাবুকে চেনেন? অঘোরবাবু নড়ে বসলেন,খুব চিনি। তাকে মনে করুন কোথায় দেখলেন?
–নদীর ঘাটে নৌকো থেকে নেমে গ্রামে ঢুকেছেন।
ব্যাটাচ্ছেলের কাছে মনে করুন আমি পনেরো টাকা পাব। ধার করেছিল। শোধ দেয়নি। রাতের আঁধার মনে করুন কখন কেটে পড়বে। এক্ষুনি গিয়ে ওকে মনে করুন ধরে ফেলতেই হবে।–বলে অঘোরবাবু দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। ..
.
স্বপ্নের বাগান
একটু পরে কর্নেল জানালায় উঁকি মেরে বললেন,–অঘোরবাবু টর্চ জ্বেলে টাটুঘোড়ার মতো দৌড়ে গেলেন।
বললুম,–কিন্তু হরিপুরের বিশুবাবুকে কি আর উনি শ্বশুরবাড়িতে পাবেন? নৌকোর মাঝি বলছিল বিকেল পাঁচটা নাগাদ উনি সস্ত্রীক নৌকোয় উঠবেন। আপনি অঘোরবাবুকে কথাটা বললেই পারতেন।
কর্নেল বললেন,–তাই তো! আমারও দেখছি বড্ড ভুলো মন। বেচারা অকারণ হয়রান হয়ে ফিরে আসবেন। কিংবা বলা যায় না, নদীর দিকে দৌড়বেন। কিন্তু তোমারও কি ভুলো মন জয়ন্ত? তুমি ওঁকে বললে না কেন?
একটু হেসে বললুম,–তা মনে করুন একটু ভুলো মন হয়ে পড়েছি। হালদারমশাই আমাকে অন্যমনস্ক করেছেন।
সাবধান জয়ন্ত! অঘোরবাবুর কথা নকল করতে গিয়ে তুমিও মুদ্রাদোষের কবলে পড়বে।–বলে কর্নেল দরজার কাছে গেলেন : হালদারমশাইয়ের জন্য আমিও উদ্বিগ্ন। আমার এখনই নদীর ধারে যাওয়া উচিত।
–আমিও যাব আপনার সঙ্গে।
কর্নেল বললেন,–থা। আর তোমাকে সন্ধ্যাবেলায় বনবাদাড়ে হাঁটতে হবে না। আমার পায়ে হান্টিং বুট আছে। সাপের দাঁত বিবে না। তুমি অপেক্ষা করো। আমি বেরুচ্ছি। পথে বরং গাছের ডাল কেটে একটা লাঠি বানিয়ে নেব।
কর্নেল তাঁর কিটব্যাগটা পিঠে এঁটে বেরিয়ে গেলেন। বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা নিলেন না। কিটব্যাগে জঙ্গলকাটা কাটারি আছে, তা আমি জানি।
কিছুক্ষণ পরে রায়মশাইয়ের সাড়া পাওয়া গেল। ডাকলেন,–অঘোর। অঘোর!
বারান্দায় কাকলি দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল,–ছোটবাবু টর্চ নিয়ে কোথায় বেরিয়েছেন।
রায়মশাই বললেন,–টর্চ নিয়ে? তার মানে বাজারে আড্ডা দিতে গেছে। আবার আড্ডাবাজ হয়েছে অঘোর। কাল অত রাতে ফিরল। বলল ট্রেন লেট। মিথ্যা কথা। পরশু রাতেও ফিরল দশটার পর। আসুক! মজা দেখাচ্ছি।
বলে উনি আমাদের ঘরে ঢুকলেন। জিজ্ঞেস করলেন,–কর্নেলসায়েবকে অঘোর সঙ্গে নিয়ে গেছে বুঝি?
বললুম,–না। কর্নেল সেচবাংলোয় ওঁর একজন বন্ধুর কাছে গেছেন।
রায়মশাই একটা চেয়ার টেনে বসে চাপা স্বরে বললেন, আপনি তো কর্নেলসায়েবের কাছের মানুষ। আমার জিনিসটার ব্যাপারে তদন্ত-টদন্ত কতদূর করলেন জানেন?
বললুম, মনে হচ্ছে, তদন্ত করতেই বেরিয়েছেন। কারণ সেচবাংলোয় ওঁর সেই বন্ধু একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আগেই ওই ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কর্নেল।
রায়মশাই খুশি হয়ে বললেন,–কর্নেলসায়েবের ওপর আমার ভরসা আছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আগেরবার এখানে উনি এসে নীলকুঠির জঙ্গলের পিশাচ রহস্য ফর্দাফাই করেছিলেন।
-বলেন কী? আমি জানি না তো! কর্নেল শুধু বলেছেন, ওই জঙ্গলে রাতদুপুরে অমানুষিক গর্জন শুনেছিলেন।
রায়মশাই হাসলেন,–ওটা ছিল চোরাচালানিদের ঘাঁটি। শ্মশানে রাতবিরেতে শবযাত্রীরা গেলে ওদের নৌকো চোখে পড়ে সন্দেহ হতেই পারে। তা পিশাচের গপ্পো রটিয়েছিল ব্যাটাচ্ছেলেরা। আর ওই অমানুষিক গর্জন ব্যাপারটা মাইক্রোফোনে বিকট চিৎকার। কর্নেল দলটাকে পুলিশ দিয়ে পাকড়াও করিয়েছিলেন। তবে এই গোপন ব্যাপার বাইরের লোকেরা তো জানে না। তাই এখনও রাতবিরেতে শ্মশানযাত্রীরা ডেলাইট জ্বেলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল বাজায়।
রায়মশাই এবার ঘটনাটা বিস্তারিত শুনিয়ে ছাড়লেন। তার কিছুক্ষণ পরে কর্নেল এসে গেলেন। বারান্দার নীচে থেকে বললেন,–জঙ্গলে জলকাদায় আছাড় খেয়েছি রায়মশাই। শর্টকাটে আসতে গিয়ে এই বিপদ। এক বালতি জল চাই।
রায়মশাই উঠে গেলেন,–কাকলি! এখানেই জল এনে দে। ইহ : হাতে আর জুতোয় কত কাদা লেগে গেছে!
কাদা ধুয়ে কর্নেল ঘরে ঢুকলেন। জিজ্ঞেস করলুম, হালদারমশাইয়ের খবর কী?
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। তোয়ালেতে হাত মুছে জুতো খুলে চটি পরলেন। তারপর বললেন,–রায়মশাই! কফি খাব।
নিশ্চয়ই খাবেন। কিনু! সায়েবকে কফি দাও-বলে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন : খবর আছে। কিছু?
–আছে। কফি খেয়ে আপনার ঘরে গিয়ে বলব।
রায়মশাই অস্থির হয়ে বললেন, তাহলে বরং আমার ঘরেই চলুন। সেখানেই কফি পাঠাতে বলছি।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ঠিক আছে। তাই চলুন। জয়ন্ত! তুমিও এসো।…
দোতলায় রায়মশাইয়ের ঘরে গিয়ে বসার পর কিছুক্ষণের মধ্যে কিনুঠাকুর কফি আর পাঁপরভাজা দিয়ে গেলেন। কর্নেল বনে,রায়মশাই! সিঁড়ির দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে আসুন।
রায়মশাই এ কাজে দেরি করলেন না। খবর শোনার জন্য আমিও উদগ্রীব। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে চাপা স্বরে বললেন,–সুখবর। কিন্তু আগে বলুন, জিনিসটা কিসের ভেতর রেখেছিলেন?
