অবাক হয়ে বললুম,–একটা চিঠি পুড়িয়ে ফেলার জন্যে এই জঙ্গলে ঢোকার কী দরকার ছিল?
কর্নেল হাসলেন,–লোকটা যে-ই হোক, বেশি সাবধানী। রায়মশাইয়ের বাড়ির দোতলা বা ওঁর ঘরের জানালা থেকে চারপাশটা দেখা যায়। খোলামেলা জায়গা। কাজেই চিঠিটা নীলকুঠির জঙ্গলে পোড়ানো নিরাপদ। চলো! ফেরা যাক।
জঙ্গল পেরিয়ে পোড় ঘাসে ঢাকা মাঠ এবং সেই নালা পেরিয়ে গিয়ে বললুম,–চিঠি পোড়ানোর ব্যাপরাটা মাথায় ঢুকছে না। কেউ কোনো গোপনীয় চিঠি পোড়াতে চাইলে আমরা এখানে আসবার আগেই পুড়িয়ে ফেলতে পারত। হঠাৎ আজ বিকেলে কেন পোড়াল?
কর্নেল বললেন,–যত ভাববে, মাথার ঘিলু বিগড়ে যাবে। ছেড়ে দাও।
রায়মশাইয়ের বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখলুম, অঘোরবাবু গাছের চারাগুলো গর্তে বসিয়ে ঝারি থেকে জল ঢালছেন। আমাদের দেখতে পেয়ে একগাল হেসে বললেন,–তা মনে করুন, চারাগুলো তাজা। একবছরেই আঁকড়া হয়ে বেড়ে উঠবে।
কর্নেল চোখ বুলিয়ে চারাগুলো দেখে বললেন,–কিন্তু বেড়া না দিলে গরুছাগলে মুড়িয়ে ফেলবে অঘোরবাবু!
–তা কি দেব না ভাবছেন স্যার? ওই দেখুন রায়মশাইয়ের বাঁশঝাড়। পারমিশন নিয়ে নিয়েছি। কাল ভোরে ভুলু কাটারি নিয়ে আসবে। আমি বাজার থেকে দড়ি কিনে আনব।
–বাঃ! কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, চারাগুলো একজাতের গাছের হলে ভালো হত। এটা মনে হচ্ছে আকাশমণি। পরেরটা শিরিষ। কী আশ্চর্য! এটা মনে হচ্ছে অর্জুন গাছ। আর ওটা সম্ভবত ইউক্যালিপ্টাস!
অঘোর অধিকারী বললেন,–হো না! বিনিপয়সায় পেয়েছি।
–কিন্তু এত ঘন করে লাগানো ঠিক হয়নি। গাছগুলো বেড়ে উঠলে ঠাসাঠাসি হয়ে যাবে।
–আজ্ঞে স্যার! মনে করুন গাছ দেখতে ভালোবাসি। তারপর মনে করুন এগুলো হবে আমার নিজের গাছ। বুড়ো বয়সে এখানে কুটির তৈরি করে মনে করুন মুনিঋষির মতো বসে থাকব। রায়মশাই মনে করুন যখন স্বর্গধামে, তখন তো আমার ও বাড়িতে ঠাই হবে না। ওঁর ছেলে বা মেয়েজামাই বাড়ি বেচে দেবেন। সেইসব ভেবেই মনে করুন এই প্ল্যান মাথায় এসেছিল।
–চমৎকার প্ল্যান! আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করি অঘোরবাবু।
অঘোরবাবু হাসতে হাসতে বললেন,–আজ্ঞে স্যার। আমার যে বড্ড ভুলো মন। তাই আগেভাগেই মনে করুন নিজের আশ্রম পত্তন করে রাখলুম।
অঘোরবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন। আমরা রায়বাড়িতে গিয়ে ঢুকলুম। রায়মশাই উঠোনের শেষপ্রান্তে গরুর চালাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন,–নীলকুঠির জঙ্গলে ঢুকেছিলেন নাকি?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। জয়ন্তকে নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে আনলুম।
বর্ষার সময় জঙ্গলে ঢোকা উচিত হয় নি। সাপ থাকতে পারে। বলে রায়মশাই হাঁক দিলেন : কিনু! সায়েবদের কফি তৈরি করে আনো। অঘোর বোধ করি গাছের চারা পুঁতছে। পাগল একটা!
আমাদের থাকার ঘরের তালা আঁটা ছিল। খাপ্পা হয়ে রায়মশাই বললেন,–চাবি অঘোরের কাছে। কাকলি! এ ঘরের চাবি নিয়ে আয়। অঘোরের কাছে আছে।
কিনু ঠাকুরের মেয়ে কাকলি দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
কর্নেল আস্তে বললেন,–আচ্ছা রায়মশাই! আপনি হরিপুরের বিশুবাবু নামে কাউকে চেনেন–নীলপুরে তার শ্বশুরবাড়ি?
রায়মশাই ভুরু কুঁচকে বললেন,–তাকে চেনেন নাকি?
–না। নদীর ঘাটে নৌকো রেখে বিশুবাবু নাকি শ্বশুরবাড়ি বউকে আনতে গেছেন। নৌকোর মাঝি বলল। ওটা নাকি ছোট ঘাট। নতুন তৈরি হয়েছে।
রায়মশাই চাপা স্বরে বললেন,–ঠক! জোচ্চোর। চিটিংবাজ। আগে তো নীলপুরেই থাকত। ঘরজামাই ছিল। হরেন দত্তর আড়ত আছে। একটিমাত্র মেয়ে। তাই বিশুকে আড়তে বসিয়েছিল। বদমাস বিশু এরিয়ার চোরডাকাতদের চোরাই মাল কিনত আর কলকাতায় বেচে আসত। শেষে পুলিশ ওকে ধরেছিল। হনের টাকাকড়ি খরচ করে জামাইকে ছাড়িয়ে এনেছিল। কিন্তু বিশু কোন মুখে আর শ্বশুরবাড়িতে থাকবে? কদিন আগে হরেন বলছিল, তার মেয়ে রাগ করে চলে এসেছে। তাই বুঝি বিশু শ্বশুরবাড়ি এল। কিন্তু অমন চোরাপথে কেন? মাঝি বুঝি আপনাদের বলল ছোট ঘাট? নতুন ঘাট? বোগাস! ওখানে ঘাট নেই।
–বিশুবাবু কি আপনার বাড়িতে কখনও এসেছেন?
–নাহ। আমার কাছে ওর কী কাজ থাকতে পারে? এলে বাড়ি ঢুকতেই কেন দেব?
অঘোরবাবু দৌড়ে এলেন,–ইস্! কর্নেলসায়েবদের দেখেও মনে করুন চাবির কথা মনে পড়েনি। আমার ভুলো মন! ছ্যা ছ্যা ছ্যা!
বলে তিনি তালা খুলে দিলেন। রায়মশাই বললেন,–চাবিটা আমাকে দাও অঘোর। তোমার ভুলো মন নিয়ে আমার সব সময় প্রব্লেম। দাও!
চাবিটা রায়মশাইকে দিয়ে অঘোরবাবু টিউবয়েলে হাত-পা ধুতে গেলেন। দেখলুম, কাকলি হাতল টিপে দিচ্ছে।
ঘরে বসে কফি খেতে খেতে শাঁখ বাজল। সম্ভবত কিনু ঠাকুরের স্ত্রী মানদা শাঁখে ফুঁ দিচ্ছেন। রায়মশাই বললেন,–সন্ধ্যা-আহ্নিক সেরে আসি। আপনারা রেস্ট নিন। বলে তিনি সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–বিশুবাবুর যা পরিচয় পেলুম, হালদারমশাই বিপদে পড়েন।
বললুম,–হালদারমশাইয়ের কাছে রিভলভার আছে।
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, অঘোরবাবু চায়ের কাপ হাতে ঘরে কে একটা চেয়ারে বসলেন। বললেন,–তা মনে করুন আজ শান্তিতে ঘুমুতে পারব।
কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ। নিজের আশ্রমের শিলান্যাস করলেন!
