-হঃ। লাঞ্চ খাইয়া এখানে ওয়েট করছিলাম।
–আমাদের জন্য?
নাহ। আমি ক্যামনে জানব আপনারা এখানে আইবেন? –হালদারমশাই চারদিক দেখে নিয়ে চুপিচুপি বললেন : রায়মশায়ের বাড়ির কাছে অঘোরবাবুর তাড়া খাইয়া এখানে আইয়া পড়ছি, হঠাৎ দেখি একখান নাও ওখানে বান্ধা আছে। আমারে অরা দেখে নাই। মাঝি বিড়ি টানছিল। আর একজন প্যান্টশার্টপরা লোক নাওয়ের থিকা নাইম্যা মাঝিরে কইল, তুমি এখন যাও! চাইর-সাড়ে চাইর বাজলে এখানে আইয়া ওয়েট করবা।
কনের্ল দ্রুত বাইনোকুলারে যেদিক থেকে এসেছি, সেই দিকটা খুঁটিয়ে দেখে বললেন,–বাঃ! তাহলে অন্তত একজন সন্দেহজনক লোককে আবিষ্কার করেছেন।
গোয়েন্দাপ্রবর মিটিমিটি হেসে বললেন,–নাওখান যদি আগেই আইয়া পড়ে, মাঝির লগে আলাপ করুম। কী কন?
–কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বাংলোয় ফিরতে তো আপনার সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
–সঙ্গে টর্চ আছে। ফায়ার আর্মস আছে।
–পিশাচের পাল্লায় পড়লে রিভলভার দিয়ে আত্মরক্ষা করা যাবে না হালদারমশাই।
হালদারমশাই একচোট হেসে বললেন,–পিচাশ? বাংলো চৌকিদারও কইছিল, নীলকুঠির জঙ্গলে পিচাশ আছে। কর্নেলস্যার! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। কত রাত্রে বনেজঙ্গলে ঘুরছি। পিচাশ দেখি নাই। তবে আপনার লগে যাইয়া দুইবার নকল পিচাশ দেখছিলাম!
এখানকার পিশাচ নকল না হতেও পারে।-বলে কর্নেল বাইনোকুলারে নদী দেখতে থাকলেন। একটু পরে বললেন : একটা ছইঢাকা নৌকো আসছে।
হালদারমশাই বললেন,–যন্তরখান একবার দ্যান কর্নেলস্যার!
কর্নেল ওঁকে বাইনোকুলার দিলেন। গোয়েন্দাপ্রবর কিছুক্ষণ দেখার পর বললেন, হ্যাঁ।
নৌকোটা কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়ল। হালদারমশাইয়ের ইচ্ছে ছিল একা গিয়ে আলাপ জমাবেন। কিন্তু কর্নেল এগিয়ে গিয়ে বললেন,–এই যে মাঝিভাই! আমাদের একটু বেড়াতে নিয়ে যাবে? ভাড়ার অসুবিধে হবে না। কত চাও?
মাঝি নৌকো বেঁধে বলল,–না স্যার। হরিপুরের বিশুবাবুর ভাড়া করা নৌকো। বাবু নীলপুরে শ্বশুরবাড়িতে আছেন। বাবু আর বাবুর বউ পাঁচটা নাগাদ এসে পড়বেন। কটা বাজছে স্যার?
হালদারমশাইয়ের মুখ দেখে মনে হল, কথাটা তিনি বিশ্বাস করেননি। …
.
একটুখানি ছাই এবং বিশুবাবু
হালদারমশাই মাঝির সঙ্গে আলাপ করলেন। বোঝা গেল, তিনি আমাদের সঙ্গী হতে চান না। বরাবর দেখে আসছি, ওঁর মনে কোনো খটকা বাধলে, উনি তার হেস্তনেস্ত না করে ছাড়বেন না। কোন্ হরিপুরের জনৈক বিশুবাবু সম্পর্কে ওঁর কেন খটকা বেধেছে, তা আপাতত জানা যাবে না।
ততক্ষণে কর্নেল হাঁটতে শুরু করেছেন। তাকে অনুসরণ করে বললুম, এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
নীলকুঠির জঙ্গলে।
কর্নেল বাইনোকুলারে পূর্বদিকে জঙ্গলের শীর্ষে সম্ভবত পাখি-টাখি দেখে নিলেন। তারপর ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হন্তদন্ত হাঁটতে শুরু করলেন। মধ্যে মধ্যে ফাঁকা ঘাসজমি। তারপর জমাট ঝোঁপের মধ্যে উঁচু-নিচু গাছগুলো এলোমেলো বাতাসে দুলছে। চারদিকে অদ্ভুত শোঁ শোঁ শনশন শব্দ।
এদিকে আমি প্রতিমুহূর্তে সাপের ছোবল খাওয়ার আশঙ্কায় বিপন্ন বোধ করছি। তবে কর্নেল আমার আগে আছেন। সাপ ফোঁস করে উঠলে প্রথমে তিনিই টের পাবেন। কিছুক্ষণ পরে ইটের চাবড়া দেখতে পেলুম। তা হলে এটাই নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। এখানে গাছের তলা মোটামুটি ফাঁকা এবং এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড সব লাইম-কংক্রিটের স্তূপ।
কর্নেল আরও কিছুটা এগিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর আমাকে ইশারায় দাঁড়াতে বলে একটা উঁচু প্রকাণ্ড স্তূপের দিকে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন। তিনি জঙ্গলে ঢাকা পটার কাছাকাছি গেছেন, অমনি ধুপধুপ শব্দে কেউ যেন দৌড়ে পালিয়ে গেল। কর্নেল ততক্ষণে তূপের ওপাশে চলে গেছেন।
আচমকা এরকম ধুপধুপ দৌড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। কর্নেল স্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হতেই ডাকলুম,–কর্নেল। কর্নেল!
কর্নেলের সাড়া এল,–এখানে এসো জয়ন্ত!
স্কুপের ওপাশে গিয়ে দেখি, কর্নেল খানিকটা ছাইয়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম-কী দেখছেন?
কর্নেল হাসলেন,–যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তা-ই, পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন। এই পদ্যটা তুমি নিশ্চয় পড়েছ। লক্ষ্য করো, ছাইটুকু থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে।
-কেউ এখানে সবে আগুন জ্বেলেছিল মনে হচ্ছে। পালিয়ে গেল কেন?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ইস্স্। আর দু-তিন মিনিট আগে আসতে পারলে লোকটাকে হাতে-নাতে ধরে ফেলতুম। বাইনোকুলারে ওকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল বটে, কিন্তু অনুমান করতে পারিনি ওর উদ্দেশ্য কী। এখন বোঝা গেল।
-ওটা কীসের ছাই?
তুমিই পরীক্ষা করে বলল এটুকু ছাই কিসের হতে পারে!-কর্নেল কয়েক পা এগিয়ে ঘাসের ভেতর থেকে একটা দেশলাই কুড়িয়ে নিলেন। বললেন : লোকটা দেশলাই ফেলে পালিয়েছে দেখছি! তার মানে সে যা পোড়াচ্ছিল, তা গোপন কিছু!
ছাইটুকু লক্ষ্য করে বললুম,–কাগজপোড়া মনে হচ্ছে।
–ঠিক ধরেছ।
–কিন্তু লোকটাকে পালানোর সময় দেখতে পাননি?
–কাছেই এই ঝোঁপটা দেখছো, এর ভেতর ঢুকে গিয়ে সামনে স্তূপের আড়াল হওয়া সোজা।
–তার পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেয়েছি।
কর্নেল আতসকাঁচ বের করে ছাইটুকু পরীক্ষা করে বললেন,–মনে হচ্ছে একটা চিঠি।
