–তা হলে এখন আয়রন চেস্টের অবস্থা কী?
–কপাট ঠেলে আটকে রেখেছি। ভেতরকার জিনিস অন্যত্র সরিয়েছি।
–রত্নটা?
শিবশদ্ভু রায় চাপা স্বরে বললেন,–ওটা কিছুদিন কাঠের আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছিলুম। তারপর ভাবলুম, নিরিবিলি জায়গায় বাড়ি। ডাকাত পড়লে আলমারি ভাঙবে সোনাদানার লোভে। তাই মাঝেমাঝে ঠাঁইবদল করে রাখতুম। কখনও পাশের ঘরের কুলুঙ্গিতে গণেশের তলায়। কাগজে মুড়েই রাখতুম। কখনও ওই পালঙ্কে গদির তলায়। আমার দুর্মতি। গত সপ্তাহে ওটা এই হোমিওপ্যাথির বাক্সের ভেতর একটা খোপে ঢুকিয়ে রাখলুম। ভাবলুম, এর ভেতর এমন দামি রত্ন আছে কেউ ভাবতেও পারবে না।
–ওটা হোমিওপ্যাথির বাক্স থেকেই চুরি গেছে?
রায়মশাই করুণ মুখে বললেন, হ্যাঁ।
–আপনি হঠাৎ হোমিওপ্যাথির দিকে মন দিয়েছিলেন কেন?
–ও! আপনি তো জানেন সে কথা। মধ্যে বছর দুয়েক পা আর কোমের বাত হয়েছিল। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায় সারেনি। তারপর নীলপুরের হোমিওপ্যাথির ডাক্তার অমর মুখুজ্যের চিকিৎসায় সেরে গেল। তখন নিজেই বইপত্তর পড়েটড়ে হোমিওপ্যাথির নেশায় পড়ে গেলুম। অঘোর, কিনু ঠাকুর, তার বউ মানদা, কিনুর মেয়ে কাকলি সব্বাই অসুখবিসুখে আমার ওষুধ খায়। বললে বিশ্বাস করবেন না, ম্যাজিক!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ঠিক বলেছেন। ম্যাজিক। কিন্তু এই বাক্সটা কি এখানেই থাকে? নাকি মাঝেমাঝে নীচে নিয়ে গিয়ে অন্য রোগীদের চিকিৎসা করেন?
রায়মশাই বিমর্ষ ভাবে বললেন,–তা করি-মানে, কখনও-সখনও করেছি।
–গত একসপ্তাহের মধ্যে বাক্সটা নীচে নিয়ে গিয়ে কাকেও ওষুধ দিয়েছেন কি?
না!–রায়মশাই জোরে মাথা নাড়লেন,–তবে একদিন ভুলুর বউ তার বাচ্চার জন্য ওষুধ নিতে এসেছিল। তখন আমি শুধু ওষুধ নিয়ে নীচে গিয়েছিলুম। ওই সময় :দি কেউ এ ঘরে ঢুকে থাকে–বলেই তিনি আবার মাথা নাড়লেন,–বাইরের লোকের ঢোকার এশ্নই ওঠে না। বাড়ির কেউ ঢুকতে অবশ্য পারে। কিন্তু যে-ই ঢুকুক, সে কেমন করে জানবে এই বাক্সতে দামি রত্ন লুকোনো আছে?
–রত্নটার কথা বাড়ির কেউ কি জানে?
শিবশঙ্কু রায় জোরে মাথা নেড়ে বললেন,–নাহ! আমি কাকেও বলিনি। জানবার মধ্যে জানে শুধু আমার ছেলে অমলকান্তি। সে থাকে আমেরিকার ডালাসে। মেয়ে নন্দিতা থাকে বাঙ্গালোরে। আমার জামাই ওখানে টাউন প্ল্যানিংয়ের হর্তাকর্তা। বছরে মেয়ে-জামাই একবার আসে পুজোর সময়।
–তাহলে আপনার জামাইও জানেন?
–সুপ্রকাশের না জানার কারণ নেই।
এই সময় অঘোরবাবু বন্দুক কাঁধে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন,– তা মনে করুন মানুষ না ভূত বোঝা গেল না। দেখলুম, ঝোঁপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে মনে করুন একটা টুপি ভাসতে ভাসতে ভ্যানিশ হয়ে গেল। তন্নতন্ন খুঁজে পেলুম না। এদিকে ভুলুও মনে করুন–
রায়মশাই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বাধা দিয়ে বললেন,–বন্দুক দাও। খামোক একটা কার্তুজ খরচ করে এলে।
–তা মনে করুন, আপনিই গুলি ছুঁড়তে বলেছিলেন।
–খুব হয়েছে। কর্নেলসায়েবদের নিয়ে যাও। চান-টানের ব্যবস্থা করে যাইয়ে দাও। আমি যাচ্ছি।
একটু পরে নীচের একটা সাজানো-গোছানো ঘরে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে অঘোরবাবু বললেন,–কাকলিকে স্নানের জল ভর্তি করতে বলি। স্নান করলে মনে করুন শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে।
কর্নেল বললেন,–আমি স্নান করব না অঘোরবাবু!
অঘোরবাবু বললেন, তাহলে মনে করুন আমি ভুলুর কাছে গিয়ে কতগুলো গর্ত করেছে দেখে আসি। তলায় মনে করুন গোবর-সার ফেলে জল ঢালতে হবে। বলে বারান্দায় গিয়ে তিনি ডাকলেন : কিনুদা! আমি এখনই আসছি। সায়েবদের খাওয়া রেডি করো …
খাওয়া-দাওয়া করে কর্নেল জানালার কাছে বসে চুরুট টানছিলেন। আমি বিছানায় অভ্যাসবশে গড়িয়ে নিচ্ছিলুম। একটু পরে কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! উঠে পড়ো। বেরুব।
–কোথায় বেরুবেন? হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে কেলেঙ্কারি!
–বৃষ্টির লক্ষণ দেখছি না। জোরে বাতাস বইছে। ওঠো! নীলকুঠির জলে যদি দৈবাৎ পিশাচটার দেখা পাই!
কর্নেলের তাগিদে বেরুতে হল। গেট ভেজানো ছিল। বাইরে গিয়ে নেল বললেন, অঘোরবাবুর বাগান দেখে আসি।
বললুম,–বাগান তো এখনও হয়নি!
ভবিষ্যতে হবে।–বলে কর্নেল বাড়ির পূর্বদিকে গেলেন। তারপর বললেন : বাঃ! অনেকটা জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে। গাছের চারা বসানোর গর্তও হয়ে গেছে।
কর্নেল এগিয়ে গিয়ে গর্তগুলো গুনলেন। তারপর ওপাশে একটা ঘাসে ঢাকা জমিতে গিয়ে বাইনোকুলারে সম্ভবত পাখি খুঁজতে থাকলেন।
একটু পরেই তিনি হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। অনুসরণ করতে হল। এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। একটা ছোট্ট নালা ডিঙিয়ে ঝোঁপজঙ্গলের ভেতর পায়েচলা পথ পাওয়া গেল। সেই পথ ধরে কিছুদূর যাওয়ার পর একটা প্রকাণ্ড বটগাছ এবং নীচে নদী দেখতে পেলুম।
বটতলায় গিয়ে কর্নেল একটু কাশলেন। অমনি অবাক হয়ে দেখলুম, গাছটার অন্য পাশে ঝুরির আড়াল থেকে আবির্ভূত হলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। আমাদের দেখে তিনি ফিক করে হাসলেন। তারপর বললেন,–ইরিগেশন বাংলার চৌকিদারের ম্যানেজ করছি। অসুবিধা হয় নাই। আপনারা আইলেন কি না খরব লইবার জন্য রায়মশায়ের বাড়ির পিছনে গিছলাম। কী কাণ্ড!
অঘোরবাবু সাংঘাতিক লোক। বন্দুক লইয়া তাড়া করছিল। একখান গুলিও ছুঁড়ছিল। কর্নেল বললেন, আপনি তাড়া খেয়ে কি সেচবাংলোয় চলে গিয়েছিলেন?
