শিবশম্ভ রায় চাপাস্বরে বললেন,–সাবধানেই তো রেখেছিলুম। আগে কফি খেয়ে নিন।
অঘোরবাবু নিজেই কফি আনলেন ট্রেতে। বললেন, রায়মশাই! কিনুদাকে সায়েবদের জন্য মনে করুন স্পেশাল রান্না করতে বলেছি। ওবেলা বরং বাজার থেকে স্পেশাল মাছ-মাংস আনব। ততক্ষণে মনে করুন আমি গিয়ে দেখি, ভুলু কতটা জায়গা পরিষ্কার করল। বিকেলে মনে করুন গাছের চারাগুলো পুঁততেই হবে।
রায়মশাই বাঁকা হেসে বললেন, বাবুর বাগান করার সখ হয়েছে। বুঝলেন কর্নেলসায়েব? একগুচ্ছের কীসব গাছের চারা এনে রেখেছে।
কর্নেল হাসলেন, ভালো তো! এখন তো বৃক্ষরোপণ উৎসব চলেছে সবখানে। অঘোরবাবু সেই উৎসব পালন করবেন।
রায়মশাই বললেন,–মনমেজাজ ভালো থাকলে বলতুম, আপনি ওর বৃক্ষরোপণ উৎসব উদ্বোধন করবেন।
অঘোরবাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন,–আজ্ঞে মনে করুন গোটা দশবারো চারা! কিসের গাছ তা-ও জানি না। বিনিপয়সায় বিলি করছিল। তাই মনে করুন আমিও গিয়ে লাইন দিয়েছিলুম।
রায়মশাই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–অঘোর! ওসব কথা ছাড়ো! সকাল থেকে দেখছি, আমবাগানের পাশে ঝোঁপের ভেতর থেকে একটা লোক উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তোমাকে ডেকে সাড়া পাইনি। আমি বন্দুক বাগিয়ে বসে ছিলাম। এবার দেখলেই গুলি ছুড়তুম।
অঘোরবাবু আঁতকে উঠে বললেন,–সর্বনাশ! তাহলে মনে করুন রাতবিরেতে কি ওই লোকটাই বাড়িতে ঢিল ছুঁড়ে আমাদের ভয় দেখাত? দিন তো আমাকে বন্দুকটা। ব্যাটাচ্ছেলেকে মনে করুন তাড়া করে গুলি ছুঁড়ে মনে করুন
রায়মশাই ওঁর হাতে সত্যিই বন্দুকটা দিলেন। বন্দুক কাঁধে নিয়ে অঘোরবাবু সবেগে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। রায়মশাই বললেন,–অঘোর! সাবধান! লোকটাকে সত্যি সত্যি গুলি করবি নে। তার মাথার ওপর গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখাবি। দেখেছিস্ তো? সে-রাতে যেই গুলি ছুঁড়লুম, ঢিল পড়া বন্ধ হয়ে গেল।
অঘোরবাবু ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। মুচকি হেসে বললেন, আমার মাথা খারাপ? সত্যি সত্যি কারও ঠ্যাংয়ে গুলি ছুঁড়লে মনে করুন উল্টে খুনের দায়ে ফেঁসে যাব না?
কর্নেল বললেন,–রাতবিরেতে বাড়িতে ঢিল পড়ত বুঝি?
রায়মশাই বললেন, হ্যাঁ। কফি খান। বলছি সে-সব কথা।
আমি বললুম,–অঘোরবাবুকে বন্দুক দিলেন। উনি বন্দুক চালাতে জানেন তো?
–সরকার আইন করে শিকার নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু একসময় আমি অঘোরকে সঙ্গে নিয়ে নীলকুঠির জঙ্গলে হরিয়াল মারতে যেতুম। আমার সঙ্গী ছিল অঘোর। মাঝেমাঝে তাকেও গুলি ছোঁড়ার ট্রেনিং দিতুম। আসলে অঘোর আমার ঠাকুর্দার নায়েবের নাতি। ঠাকুর্দা ছিলেন জমিদার। জমিদারি উঠে যাওয়ার পর তাঁর নায়েব সদানন্দবাবু বৃদ্ধ বয়সে এবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার ছেলে রমাকান্ত-মানে অঘোরের বাবা কেষ্টনগরে স্কুলমাস্টারি করতেন। রমাকান্তকাকা হঠাৎ মারা গেলে। অঘোরকে নিয়ে তার বিধবা স্ত্রী সুধাময়ী আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। সুধাকাকিমা বাড়ির কাজকর্ম করতেন। সে অনেক বছর আগের কথা। সুধাকাকিমা মারা গেলেন। অঘোর এবাড়িতেই থেকে গেল। বিয়ে করেনি। মাঝেমাঝে কোথায় উধাও হয়ে যেত। আবার ফিরে আসত। এখন বয়স হয়েছে। এদিকে আমিও একা মানুষ। অল্প কিছু জমিজমা আছে। অঘোেরই দেখাশুনা করে। বলে রায়মশাই করুণ হাসলেন : কর্নেলসায়েব এসব কথা জানেন।
কর্নেল বললেন,–রাত্রে বাড়িতে ঢিল পড়ার ব্যাপারটা বলুন।
গত সপ্তাহে একদিন মাঝরাত্রে নীচে অঘোরের চ্যাঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে গেল। বারান্দায় বন্দুক হাতে গিয়ে টর্চের আলো জ্বেলে জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে? অঘোর বলল, বাড়ির ভেতর কোনো বদমাস ঢিল ছুঁড়ছিল।
–তখন বাড়িতে কি বিদ্যুৎ ছিল না?
–না। লোডশেডিং ছিল। নীলপুরের বিদ্যুতের হাল শোচনীয়। তো তারপর যে-রাতে লোডশেডিং হয়েছে, সেই রাতে ঢিল। সকালে দেখেছি, উঠোনে ইটপাটকেল ভর্তি। তারপর খেয়াল হল, হাতে বন্দুক থাকতে চুপ করে থাকা উচিত হচ্ছে না। পরশু রাতে তৈরি হয়েই ছিলুম। অঘোরের চ্যাঁচানি শুনে বারান্দা থেকে পরপর দুটো ফায়ার করলুম। ঢিলপড়া বন্ধ হল। তারপর সকালে আবিষ্কার করলুম নীলা চুরি গেছে।
–কোথায় রেখেছিলেন?
ঠিক এই সময় বাইরে কোথাও বন্দুকের গুলির শব্দ হল এবং অঘোরবাবুর চিৎকার শোনা গেল,–ধর! ধর! ভুলু! ভুলু! …
.
বটতলায় একটা নৌকোড়
রায়মশাই সেই পাশের ঘরে ঢুকে জানালা থেকে চিৎকার করছিলেন,–অঘোর! অঘোর!
কর্নেল ফফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। তার কোনো চাঞ্চল্য দেখলুম না। বললুম,–নীচে গিয়ে ব্যাপারটা দেখা উচিত ছিল। হালদারমশাই উঁকি দিতে এসে বিপদে পড়লেন নাকি?
কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন। একটু পরে রায়মশাই এ ঘরে এসে বললেন, –অঘোর খামোকা একটা কার্তুজ নষ্ট করল। ওদিকটায় বনবাদাড়। আর ভুলু লোকটা ভীতুর শিরোমণি! দিনদুপুরে ভূত দেখতে পায়।
জিজ্ঞেস করলুম,ভুলুই কি আপনার বাড়িতে থাকে?
-না। ভুলু একজন দিনমজুর। অঘোরের বাগানের সাধ হয়েছে। তাই ওকে দুপুর পর্যন্ত কাজে লাগিয়েছে। জঙ্গল কেটে মাটিতে গর্ত করে রাখবে। ব্যস্।
কর্নেল চোখ খুলে বললেন,–অঘোরবাবুকে কোথায় দেখে এলেন?
–ও এক আস্ত গবেট। ঝোঁপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভুলুকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে, লোকটা কোনদিকে পালিয়েছে।
–এবার বলুন নীলা কোথায় রেখেছিলেন? রায়মশাই কপালে থাপ্পড় মেরে বললেন,–আমারই দুর্বুদ্ধি! আপনাকে দেখিয়ে ছিলুম, রত্নটা আয়রন চেস্টে থাকত। ঠাকুর্দার বাবার আমলের আয়রন চেস্ট। গতবছর চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতেই চাবি ভেঙে গেল। অঘোরকে দিয়ে কামার ডেকে এনে কোনোক্রমে খোলা তো হল। কিন্তু চাবির ভাঙা অংশটা কামার অনেক চেষ্টাতেও বের করতে পারল না। সে বলল,–কলকাতা থেকে মিস্তিরি আনতে হবে। অঘোর কলকাতা থেকে মিস্তিরি এনেছিল। বললে,–দেওয়াল ভেঙে আয়রন চেস্ট বের করে তার সঙ্গে কলকাতা পাঠাতে হবে। তা না হলে চাবি বের করা যাবে না। নতুন লক তৈরি করে লাগাতে হবে। সে এক হাঙ্গামা! তাই মিস্তিরিকে যাতায়াতের ভাড়া আর কিঞ্চিৎ বকশিস দিয়ে বিদেয় করলুম।
