তার চেহারা চিনাদের মত। কিন্তু সে চিনা কি না বোঝা কঠিন। কারণ সারা পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকেদের এমনি চেহারা ও গড়ন। তার হাতে একটা স্টেনগান, পরনে সবজে মিলিটারি পোশাক এবং চোখে সানগ্লাস।
আমি আপত্তি করে ইংরেজিতে বললুম—এটা কী হচ্ছে? অ্যাঁ? পা সরাও বলছি।
লোকটা দাঁত বের করে হেসে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলল এবং পা তুলে নিয়ে আমাকে দাঁড়াতে। ইশারা করল।
উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, সে একা নয়। আরও একজন অমনি চেহারা ও পোশাকপরা সশস্ত্র লোক ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং চোখে বাইনোকুলার রেখে সমুদ্রের দিকে কী দেখছে!….
নৃসিংহের গর্জন
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। এটা আমার বোকামিরই খেসারত। যদি সতর্কভাবে চারদিকে নজর রাখতুম এবং ইঁদুরের দলে ঢুকে না পড়তুম, এই কাণ্ডটি হত না। এখন একমাত্র ভরসা কর্নেলরা যদি এখনই ফিরে আসেন!
তবে জানি না, কীভাবে এদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাবেন। আমি প্রাণের আশা ছেড়ে দিলুম।
বাইনোকুলার নামিয়ে রেখে দ্বিতীয় লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর ভাঙাভাঙা ইংরেজিতে বলল—গুড মর্নিং! আপনার নাম কী?
তার কথায় ভদ্রতার সুর আছে। জবাব দিলুম—আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরি। আমি কলকাতার একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক। আপনারা কে? কেনই বা এভাবে হামলা করছেন?
লোকটি বলল—সেকথা পরে। যা জিজ্ঞেস করছি, অনুগ্রহ করে তার জবাব দিন। আপনাদের সঙ্গে একজন মেডিকেল সার্জন এসেছেন, তিনি কোথায়?
বুঝলুম, ডঃ পরমেশ পুরকায়স্থের কথা বলছে। বললুম—তিনি একটু আগে বেরিয়েছেন।
ওরা দুজনে পরস্পর দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু বলাবলি করল। তারপর বাইনোকুলারধারী এগিয়ে এসে আমার হাতটা নিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল—যদি কোনও ত্রুটি ঘটে থাকে, অনুগ্রহ করে ক্ষমা করবেন। আচ্ছা, আবার দেখা হবে।
বলে সে তার সঙ্গীকে ইশারা করল। সঙ্গীটি কিন্তু আমার রাইফেলটা ফেরত না দিয়ে চলতে শুরু করল। তখন বলে উঠলুম—এ কি! আমার রাইফেল নিয়ে যাচ্ছেন কেন?
দুজনেই ঘুরে একটু হাসল। কিন্তু কিছু বলল না। ক্যাম্পের ওপাশে গিয়ে চড়াইয়ে উঠল। তখন আমি পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে চেঁচিয়ে বললুম-রাইফেল না দিলে গুলি ছুড়ব বলে দিচ্ছি।
বাইনোকুলারধারী তার হাতের স্টেনগান বাগিয়ে রূঢ়কণ্ঠে বলল—মরতে সাধ থাকলে তাই কর বোকারাম!
হুঁ, ঠিকই বলেছে, ওরা দুজন, আমি একা। দুজনেরই হাতে স্টেনগান। একজনকে বড়জোর গুলি ছুড়ে কাবু করতে পারি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন স্টেনগানের গুলিতে আমার শরীর ঝাঁঝরা করে ফেলবে। অতএব চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম।
লোকটা স্টেনগান আমার দিকে তাক করে বলল—রিভলভার পকেটে ঢোকাও। ভদ্রলোকদের প্রতি ভদ্ৰব্যবহার করাই আমার রীতি।
ভাল ছেলের মতো রিভলভার ঢুকিয়ে দেখি, ওরা পাহাড়ের গায়ে একটা খোঁদলে আমার রাইফেলটা রাখল। তারপর বাইনোকুলারধারী হাসতে হাসতে বলল—তোমার মতো নির্বোধের হাতে রাইফেল থাকলে নিজেরই বিপদ ঘটবে। তাই ওটা নিরাপদ দূরত্বে রেখে গেলাম। আমরা চলে যাওয়ার পর তুমি এসে নিয়ে যেও। কেমন?
রাগ হলেও বুঝলুম, কথাটা ঠিকই বলেছে, রাইফেলটা তখনই ফেরত দিলে হয়তো আমি ঝোকের বশে কী করে বসতুম, বলা যায় না।
ওরা পাহাড়ের ওপাশে অদৃশ্য হলে রাইফেলটা নিয়ে এলুম। তারপর ভাবতে বসলুম এতক্ষণ কি একটা বিদঘুটে স্বপ্ন দেখছিলুম? কে ওরা? কেন পরমেশবাবু এসেছেন কি না জানতে এসেছিল? অজ্ঞাত আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল।
আর ডঃ গড়গড়িই বা কোথায় গেলেন?
এতক্ষণ পরে মনে পড়ল, কিছু ঘটলে তিনবার বাঁশি বাজিয়ে সংকেত জানানোর কথা আছে। তাই পকেট থেকে হুইসলটা বের করে ফুঁ দিলুম। পরপর দিনবার।
তারপর দেখি, পাহাড়ের ওপর দিকে একটা চাতালের ওপর কর্নেল উঁকি দিচ্ছেন এদিকে। চোখে বাইনোকুলার। আমি ওঁকে দেখামাত্র বাজখাঁই চেঁচিয়ে ডাকলুম-কর্নেল! কর্নেল! শিগগির আসুন আপনারা! ভীষণ বিপদ!
আমার কথাগুলো বিকট প্রতিধ্বনি তুলল।
কিন্তু মিনিটের পর মিনিট কেটে গেল। ওঁদের আর পাত্তা নেই। কর্নেল সেই যে উঁকি মেরে অদৃশ্য হলেন তো হলেন। রাগে দুঃখে ছটফট করতে থাকলুম। অস্থিরভাবে পায়চারি করে সব দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলুম। এখান থেকে নারকেল বনের মাথার ওপর দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। অনন্ত বিশাল জলের ফেনায় ওপর সূর্যের আলো ঝকমক করে উঠছে। শার্ক কোথায় অপেক্ষা করছে, দেখতে পাচ্ছি না। দিগন্তে দু একটা কালো ঢিবির মতো পাহাড় মাঝে মাঝে ঢেউয়ের ফাঁকে ড়ুবছে আর ভেসে উঠেছে। আর ডাইনে দূরে এই দ্বীপের খাড়ির ওপর অজস্র সামুদ্রিক পাখি ওড়াউড়ি করছে, তাদের তীক্ষ্ণ চিঙ্কার হাওয়ায় ভেসে আসছে।
সবচেয়ে খারাপ লাগছে, আমাদের খাদ্য ভাণ্ডারটি লুঠপাট হওয়ার কথা ভেবে। কপালে কর্নেলের বকুনি তো আছেই। আমি দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। অতএব ওপর রাগ করা আমার সাজে না।
প্রায় একটি অস্থির ঘণ্টা কেটে গেল। তারপর কর্নেলরা ফিরলেন।
আমি প্রায় এক নিঃশ্বাসে পুরো ঘটনা জানিয়ে দিলুম। ওঁরা তিনজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর কর্নেল বললেন—হুম্! তাহলে ডঃ গুটেনবার্গ, বোঝা যাচ্ছে আমার ধারণায় কোনও ভুল নেই। এ নিশ্চয় টংকু আরেগোনার দল না হয়ে যায় না। কিন্তু ওরা পরমেশবাবুর সম্পর্কে এত আগ্রহী কেন?
পরমেশবাবু ভয় পেয়েছেন মনে হল। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ডঃ গুটেনবার্গ বললেন—আচ্ছা ডঃ পুরকায়স্থ, আপনি তো একবার ভিয়েনায় বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানী সম্মেলনে বলেছিলেন হৃদ্যন্ত্র যেমন বদল করা যায় শরীরে, তেমনি মাথাও বদল করা যায়।
