কর্নেল বললেন,–চার বছর আগে রায় ভবনের অবস্থা এমন ছিল না। বোঝা যাচ্ছে, রায়মশাই আর বাড়ি মেরামতে মন দেননি। দিয়েই বা কী করবেন? এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে থাকে আমেরিকায়। মেয়ে বাঙ্গালোরে।
গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই অঘোরবাবু বেরিয়ে এলেন। একগাল হেসে বললেন,–এসে গেছেন স্যার? তা এলেন কিসে? মনে করুন বাসে বেজায় ভিড়। তারপর মনে করুন রাস্তা একেবারে খানাখন্দে ভরা।
কর্নেল বললেন,–আমরা বাসে এসেছি অঘোরবাবু!
অঘোরবাবু জিভ কেটে বললেন, কী সর্বনাশ! ট্রেনে এলে মনে করুন আরামে আসতেন। বলে বাড়ির দিকটা দেখে নিয়ে চাপা স্বরে ফের বললেন,–একটা অনুরোধ স্যার। রায়মশাইকে যেন দয়া করে বলবেন না আমি কাল সন্ধ্যাবেলা আপনার কাছে গেছি। আজ্ঞে মনে করুন, আমি দুপুরেই গেছি।
-কেন বলুন তো?
অঘোরবাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন,–রায়মশাই মনে করুন আমাকে সক্কালেই পাঠিয়েছিলেন। স্টেশনে যাবার সময় শুনলুম, ফরেস্ট অফিস থেকে নানারকম গাছের চারা বিলি হচ্ছে। আমার মনে করুন বাগান করার খুব সখ। ওপাশে রায়মশাইয়ের পোড়ো জমিতে মনে করুন গাছের চারাগুলো পুঁতব। রায়মশাই বাড়ির ভেতর মনে করুন
কর্নেল হাসলেন,–বুঝেছি। সাপের ভয়ে বাড়ির ভেতরে গাছপালা ঝোঁপঝাড় গজাতে দেন না। তা আপনাদের কাছে কাল সন্ধ্যায় তো গাছের চারা দেখিনি?
–স্টেশনে ওগুলো হরির কাছে রেখে গিয়েছিলুম। আজ্ঞে হরির মনে করুন চায়ের দোকান আছে। খুব ভালো লোক স্যার। তারপর মনে করুন কাল রাত্রে ফেরার সময় চারাগুলো নিয়ে এসেছি।
–রায়মশাই আপনার এত দেরি করার কারণ জিজ্ঞেস করেন নি?
–তা আবার করবেন না? মনে করুন ওঁকে বলেছি, রেল অবরোধ হয়েছিল।
এই সময় দোতলার জানলা থেকে কারও ডাক ভেসে এল,–অঘোর! ও অঘোর!
অঘোরবাবু চেঁচিয়ে বললেন,–রায়মশাই! মনে করুন কর্নেলসায়েব এসে গিয়েছেন! তারপর গেটের দিকে ঘুরে হন্তদন্ত পা বাড়ালেন। একবার ঘুরে আমরা ওঁকে অনুসরণ করছি কি না দেখেও নিলেন।
বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখলুম, লম্বাচওড়া চৌকো সেকেলে লাইম কংক্রিটের উঠোন। ডানদিকের পাঁচিলের একপাশে সমান্তরাল কিছু দেশি ফুলের গাছ আছে। কিন্তু গাছগুলোর তলা পরিষ্কার। একটা টিউবয়েল আছে। ফ্ৰকপরা এক কিশোরী বালতিতে জল ভরছিল। বাঁদিকের পাঁচিল ঘেঁষে একটা চালাঘর। টালির চাল। সেখানে গরু থাকে, তা বুঝতে পারলুম।
নীচের বারান্দায় রায়মশাইকে দেখা গেল। লম্বা শীর্ণ এক বৃদ্ধ মানুষ। গায়ে ফতুয়া। এবং হাঁটুঅব্দি তোলা ধুতি। তার হাতে একটা ছড়ি। মুখে পাকা গোঁফ। মাথার চুল কিন্তু কাঁচাপাকা এবং মধ্যিখানে সিঁথি। চেহারায় আভিজাত্য। কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–আসুন কর্নেলসায়েব। আপনি না এসে পারবেন না এই বিশ্বাস অবশ্য ছিল। কারণ ইংরিজতে ও. কে. লিখে কার্ড পাঠিয়েছেন। অঘোর যে কার্ডখানা এনেছে, এই যথেষ্ট। ওর আজকাল কিছুই নাকি মনে থাকে না।
কর্নেল আমার সঙ্গে রায়মশাইয়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। রায়মশাই বললেন,–বাবাজীবন, আমার ছেলের বয়সী। কাজেই তুমি বলব।
বললুম,–নিশ্চয়ই বলবেন।
অঘোরবাবু নীচের তলায় একটা ঘরের তালা খুলছিলেন। রায়মশাই বললেন,–এখন ওঘরে নয়। কর্নেলসায়ের আগে আমার ঘরে যাবেন। অঘোর! কিনুঠাকুরকে বলে এখনই কর্নেলসায়েবের জন্য কফির ব্যবস্থা করো। দেরি কোরো না।
দোতলায় উঠে চওড়া বারান্দা দিয়ে হেঁটে শিবশঙ্কু রায় মাঝখানের একটা ঘরে তালা খুললেন। চাবি তাঁর পৈতেয় বাঁধা ছিল। ঘরের জানালাগুলো বড়ো এবং ভোলা। পর্দা একপাশে গুটানো আছে। পর্দার অবস্থা দেখে বুঝলুম, বাড়িটার মতোই জীর্ণ এবং বিবর্ণ।
উঁচু মেহগিনি পালঙ্ক একপাশে এবং অন্যপাশে গদিআঁটা কয়েকটা চেয়ার। একটা প্রকাণ্ড টেবিল। টেবিলে কীসব কাগজপত্র, ফাইল, একটা অ্যালার্মর্ঘড়ি এবং একটা ছোট্ট বাক্স। হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স মনে হল। তার পাশে দুটো মোটা অভিধানের মতো বই। নিশ্চয়ই হোমিও মেটিরিয়া মেডিকা।
ফ্যান চালিয়ে দিয়ে রায়মশাই বললেন,–বসুন আপনারা। আমি আসছি।
চেয়ারে বসে টুপি খুলে কর্নেল তার পিঠে আটকানো কিটব্যাগটা নীচে রাখলেন। বাইনোকুলার আর ক্যামেরা তাঁর কোলে বসল। আমার কাঁধের ব্যাগটা আমিও নামিয়ে রাখলুম। রায়মশাই পাশের ঘরে ঢুকেছেন ততক্ষণে।
পালঙ্কের কাছাকাছি ঘরের এককোণে পাশাপাশি দুটো কাঠের বদ্ধ আলমারি চোখে পড়ল। তার পাশে দেওয়ালে বসানো একটা আয়রন চেস্ট। বলতে যাচ্ছিলুম,–দশ লক্ষ টাকা দামের নীলা কি আয়রন চেস্টে ছিল? বলা হল না। রায়মশাই ফিরে এলেন দোনলা বন্দুক নিয়ে।
কর্নেল বললেন,–বন্দুক কেন রায়মশাই?
রায়মশাই চাপা স্বরে বললেন, আপনারা আসার একটু আগে ও-ঘরের জানালায় বন্দুকহাতে বসেছিলুম। একটা লোক আমবাগানের কাছে ঝোঁপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। দুবার লোকটাকে সন্দেহজনকভাবে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখেছি। বন্দুকের নল দেখামাত্র লুকিয়ে পড়েছে। তাই অঘোরকে ডাকছিলুম।
-কেমন চেহারা নোকটার?
–শুধু মাথাটা দেখেছি। মাথায় ছাইরঙা টুপি। মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাইনি। অঘোর আসুক। ওকে ওদিকে লক্ষ্য রাখতে বলব।
কর্নেলের দিকে তাকালুম। চোখের ইশারায় ওঁকে বলতে চেয়েছিলুম, লোকটা নিশ্চয়ই আমাদের প্রিয় হালদারমশাই। কিন্তু কর্নেল আমার দিকে তাকালেন না। বললেন, আপনাকে সেবার বলেছিলুম জিনিসটা সাবধানে রাখবেন।
