মিষ্টান্নের প্যাকেটটা হলদে পলিব্যাগে মোড়া ছিল। দুহাতে কর্নেলকে এগিয়ে দিয়ে অঘোরবাবু চলে যাচ্ছিলেন। হালদারমশাই সকৌতুকে বললেন,–মনে করুন আর কিছু আছে নাকি?
আজ্ঞে না।–অমায়িক হাসলেন অঘোরবাবু : এবার মনে করুন বিদায় নিই। ট্রেন ফেল হবে।
কর্নেল স্মরণ করিয়ে দিলেন,–অঘোরবাবু! ছাতা! রাস্তার ছাতা কিনতে ভুলবেন না।
–তা মনে করুন বৌবাজারের মোড়ে কিনে ফেলব। বৃষ্টি পড়ছে। এবার আর ভুল হবে না। বলে নমস্কার করে অঘোরবাবু সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেল বললেন,–বৃষ্টির সন্ধ্যায় সরপুরিয়া খেতে মন্দ লাগবে না। আরেক দফা কফিও খাওয়া যাবে।
বলে তিনি ষষ্ঠীচরণকে ডেকে তিনটে প্লেট আর তিনটে চামচ আনতে বললেন। ষষ্ঠী তক্ষুনি প্লেট আর চামচ এনে দিল। কর্নেল শ্যাকেট খুলে সরপুরিয়া চামচে তুলে একটা প্লেটে নিজের জন্য একটুখানি রাখলেন। তারপর হালদারমশাই এবং আমার প্লেটে অনেকখানি তুলে দিলেন। বাকিটা ষষ্ঠীর জন্য রাখলেন। ষষ্ঠী ততক্ষণে কফির জল গরম করতে গেছে।
হঠাৎ দেখি, কর্নেল প্যাকেটটার তলার কাগজ সরিয়ে একটা মুখআঁটা খাম বের করছেন। হালদারমশাই খাওয়া বন্ধ করে গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললুম,–এ কী! অদ্ভুত
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–হ্যাঁ। অদ্ভুত! নীলপুরের শিবশদ্ভু রায়ের এই চিঠিটাই আসল চিঠি। অঘোরবাবু বললেন : আজকাল রায়মশাই তাঁকেও বিশ্বাস করেন না। তাই খোলাচিঠিতে আমাকে শুধু ওঁর বাড়িতে শিগগির একবার যেতে বলেছেন। কোথায় নাকি আশ্চর্য প্রজাতির পরগাছা দেখেছেন ইত্যাদি। তারপর একপ্যাকেট সরপুরিয়া পাঠানোর কথা লিখে আন্ডারলাইন করে দিয়েছেন। কিন্তু আমি অঘোরবাবুকে ইচ্ছে করেই সরপুরিয়ার প্যাকেটের কথা মনে করিয়ে দিইনি।
গোয়ন্দাপ্রবর অবাক হয়ে শুনছিলেন। বললেন,–দ্যাননি ক্যান?
পরীক্ষা করতে চেয়েছিলুম সত্যি উনি ভুলো মনের মানুষ কি না। বলে কর্নেল খামটা টেবিলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রাখলেন। তারপর সরপুরিয়াটুকু তারিয়ে তারিয়ে খেলেন।
হালদারমশাই বললেন,–বহু বৎসর সরপুরিয়া খাই নাই। জয়ন্তবাবুরে কই, মিষ্টান্ন খাইয়া জল খাইবেন না য্যান। অ্যাসিডিটি হইতে পারে।
কর্নেল সায় দিলেন,–ঠিক বলেছেন। জলের বদলে কফি নিরাপদ।
খামের ভেতর গোপন চিঠিতে নীলপুরের রায়মশাই কী লিখেছেন, তা জানার জন্য খুব আগ্রহ হচ্ছিল। কিন্তু কর্নেলের কোনো তাড়া লক্ষ্য করছি না। ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি আনল। কর্নেল তাকে বাকি সরপুরিয়াভর্তি প্যাকেটটা দিলে সে খুশি হয়ে নিল এবং একগাল হেসে বলল,–বাবামশাই একবার ঠিক এইরকম সন্দেশ এনেছিলেন।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–সরপুরিয়া।
আজ্ঞে। মনে পড়েছে বটে!–বলে ষষ্ঠী চলে গেল।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–নীলপুর নামের ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ওখানে নীলের চাষ হত। একটা নীলকুঠি ছিল। তা ভেঙেচুরে কবে জঙ্গল গজিয়েছিল। নদীর ধারে সেই জঙ্গলে একসময় বাঘ থাকত। চারবছর আগে সেই জঙ্গলে নির্ভয়ে ঘোরাঘুরি করেছিলুম। ওখানে একটা শ্মশান আছে। কিন্তু স্থানীয় লোকেরা রাতবিরেতে সেই শ্মশানে মড়া পোড়াতে গেলে ধুন্ধুমার বাধায়।
হালদারমশাই বললেন,–ধুন্ধুমার? তার মানে?
–কয়েকটা ডেলাইট জ্বেলে লাঠিসড়কিবন্দুক নিয়ে ঢাকঢোল বাজাতে বাজাতে শ্মশানে যায়।
–ক্যান?
–নীলকুঠির জঙ্গলে নাকি একটা মড়াখেকো পিশাচ আছে।
–পিচাশ? কন কী!
হালদারমশাই পিশাচকে ‘পিচাশ’ বলে তা জানি। কিন্তু আমি রায়মশাইয়ের গোপন চিঠির জন্য। উসখুস করছিলুম। বললুম,–কর্নেল! চিঠিতে পিশাচের খবর আছে নিশ্চয়ই!
কর্নেল এবার খামের মুখ ছিঁড়ে বললেন,–থাকতেও পারে। সেবার ওখানে গিয়ে রায়মশাইয়ের বাড়ির দোতলা থেকে দুপুর রাতে একটা অমানুষিক গর্জন শুনতে পেয়েছিলুম। গর্জনটা ভেসে এসেছিল জঙ্গলের দিক থেকে। কিন্তু আগেই বলেছি, দিনের বেলায় জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে কোনো পিশাচ দেখিনি।
গোয়ন্দাপ্রবর বলে উঠলেন,–গর্জন শুনছিলেন! কিসের গর্জন?
জানি না–বলে কর্নেল চিঠিটা পড়তে থাকলেন। পড়ার পর তিনি চিঠিটা হালদারমশাইকে দিয়ে বললেন : দেখুন। রায়মশাইয়ের হারানিধি উদ্ধার করতে পারেন নাকি।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ চিঠিটা পড়ছিলেন। তার গোঁফটা উত্তেজনায় তিরতির করে কাঁপছিল। উঁকি মেরে দেখলুম, চিঠিতে শুধু লেখা আছে :
আমার মহা সর্বনাশ হয়েছে। পূর্বপুরুষের সযত্নে রক্ষিত
রত্ন নীলা হারিয়ে গেছে। এ বাজারে দশ লক্ষ টাকা দাম।
দয়া করে শীঘ্র এসে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন।
কর্নেল বললেন,–নীলাটা আমাকে দেখিয়েছিলেন রায়মশাই। প্রায় মুরগির ডিমের সাইজ। রত্নটার নীল রঙে আলো পড়লে চোখ ঝলসে যায়। কিন্তু ওটা হারাল কী করে, তা লেখেন নি।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে.কে. হালদার উত্তেজিতভাবে বললেন,–নীলপুরে যাওয়া দরকার। কর্নেলস্যার কখন যাইবেন, কন। আমি আপনার লগে লগে যামু। নাকি আমি একা যামু? যামু কিসে?
কর্নেল বললেন,–তাই যান। ভোরে এসপ্ল্যানেড থেকে বাস ছাড়ে। ট্রেনের চেয়ে বাসই ভালো। তবে একটু হাঁটতে হবে এই যা। ….
.
রাতের উপদ্রব এবং বন্দুক
নীলপুরকে নেহাত পাড়াগাঁ ভেবেছিলুম। পরদিন দুপুরে সেখানে পৌঁছে দেখলুম, জমজমাট বাজার আর একতলা-দোতলা প্রচুর বাড়ি আছে। বিদ্যুৎ আছে। শিবশম্ভু রায়ের বাড়ি নীলপুরের শেষপ্রান্তে নদীর ধারে। উঁচু পাঁচিলঘেরা সেকেলে গড়নের দোতলা বাড়ি। তবে পাঁচিল এবং বাড়ির অবস্থা জরাজীর্ণ। এদিকটায় আমবাগান আর এখানে-ওখানে ঝোঁপ-জঙ্গল গজিয়ে আছে। বাড়ির গেটের অবস্থাও শোচনীয়।
