দেখে আসার জন্য তক্ষুনি উঠে দাঁড়ালুম বটে, কিন্তু অন্ধকার বাগানের দিকে তাকিয়ে পা বাড়াতে অস্বস্তি হল। সত্যিকার শাঁখচুন্নি যে নেই, তা কে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে?
আমাকে বসে পড়তে দেখে কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠলেন। পিঙ্কিও ব্যাপারটা টের পেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। এবার কুকি সুযোগ পেয়ে তাকে ধমক দিল নিজের ভাষায়। পিঙ্কি গম্ভীর হয়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে।
৪.৪ নীলপুরের নীলারহস্য
নীলপুরের নীলারহস্য – কিশোর কর্নেল সমগ্র ৪ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
বৃষ্টিসন্ধ্যার চিঠি
শ্রাবণ মাসের সন্ধ্যা। টিপটিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। কর্নেলের ড্রয়িংরুমে বসে কফি খেতে খেতে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার–আমাদের প্রিয় হালদার মশাইয়ের পুলিশ জীবনের গল্প শুনছিলুম। রোমাঞ্চকর সব গল্প। হালদারমশাই বলছিলেন,–বৃষ্টিবাদলার রাত্তিরে চোরগো চুরি করনের খুব সুবিধা। ক্যান? না–ঠাণ্ডা ওয়েদারে লোকেরা হেভি ঘুম ঘুমায়।… তো তখন আমি রাজশাহি জেলার চণ্ডীপুরে থানার অফিসার-ইন-চার্জ। লোকে তখন কইত বড়বাবু। এক বর্ষার রাত্তিরে—
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। হঠাৎ বললেন,–হালদারমশাই! ঠাণ্ডা ওয়েদারে বড়বাবুদের ঘুম আরও হেভি হওয়ার কথা!
হালদারমশাই মাথা নেড়ে বললেন,–কী যে কন কর্নেলস্যার! তখন ব্রিটিশ আমল।
গল্পে বাধা পড়ায় বিরক্ত হয়ে বললুম,–এক বর্ষার রাতে কী হয়েছিল, তা-ই বলুন শুনি।
ঠিক এইসময় আরও রসভঙ্গ করে ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল হাঁকলেন,–ষষ্ঠী!
একটু পরে একজন ধুতিপাঞ্জাবিপরা নাদুস-নুদুস গড়নের প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–চিনতে পারছেন তো স্যার? আমি নীলপুরের অঘোর অধিকারী। তা মনে করুন, চারপাঁচ বছর আগের কথা। সেই যে রায়মশাইয়ের বাড়িতে আমাকে দেখেছেন। তারপর মনে করুন হঠাই এসে পড়তে হল।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–বলুন অঘোরবাবু।
অঘোরবাবু সোফায় বসে বললেন,–তা মনে করুন, তিনটে পঁচিশের ট্রেনে চেপেছি। দমদমে একটা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল। শেয়ালদা পৌঁছুতে মনে করুন সাড়ে ছটা।
বুঝলুম, ‘মনে করুন’ বলাটা ভদ্রলোকের মুদ্রাদোষ। উনি ব্যস্তভাবে কাঁধের ব্যাগটা কোলে টেনে হাত ভরলেন। তারপর একটা চশমার খাপ বের করলেন। ভাবলুম চশমা পরবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে চশমার তলা থেকে একটা ভাঁজকরা কাগজ বের করে উনি কর্নেলকে দিলেন।
কর্নেল কাগজটার ভাঁজ খুলতে খুলতে বললেন, রায়মশাইয়ের চিঠি?
অঘোর অধিকারী বললেন,–তা মনে করুন রায়মশাই নিজেই আসতেন। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে আসবেন কী করে? যা অবস্থা! তাই চিঠি লিখে মনে করুন আমাকেই পাঠালেন। এদিকে ফেরার ট্রেন রাত আটটা পাঁচে। সব ট্রেন তো নীলপুর স্টেশনে দাঁড়ায় না। তারপর মনে করুন আমি রাতবিরেতে রায়মশাইয়ের কাছে না থাকলেও চলে না।
কর্নেল চিঠিটা ততক্ষণে পড়ে ফেলেছেন। বললেন,–চিঠিটা আপনি চশমার খাপে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন কেন অঘোরবাবু?
অঘোরবাবু বিষণ্ণ মুখে বললেন,–আজকাল মনে করুন কী যেন হয়েছে। কিছু মনে থাকে না। চশমার খাপের ভেতর চিঠিটা রাখলে মনে থাকবে। কেন জানেন স্যার? সঙ্গে একটা বই এনেছি। ট্রেনজার্নিতে সময় কাটাতে বইয়ের মতো জিনিস নেই। এদিকে মনে করুন, সারাক্ষণ চোখে চশমা পরে থাকতে পারি না। নতুন চশমা নিয়েছি তো! তাই মনে করুন–
কর্নেল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–ছাতি আনেননি দেখছি! আসবার সময় ট্যাক্সি পেয়েছিলেন। এখন না পেতেও পারেন।
–ঠিক বলেছেন স্যার। কিন্তু মনে করুন ছাতি এনেছিলাম। ওই যে বললুম কিছু মনে থাকে । ট্রেনে ফেলে নেমে এসেছি। তারপর মনে করুন ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মনে পড়ল। এখনই উঠছি স্যার! শেয়ালদার কাছাকাছি ছাতার দোকান আছে। একটা কিনে নেব’খন।
বলে পা বাড়িয়ে অঘোরবাবু হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন,–ওই যাঃ! বলতে ভুলে গেছি। আমি যে মনে করুন আপনাকে রায়মশাইয়ের চিঠি দিলুম, তার প্রমাণ আনতে বলেছেন উনি। আমারও ভুলো মন। আর রায়মশাইও মনে করুন কাকেও আজকাল বিশ্বাস করেন না। আমাকেও না। তাই মনে করুন চিঠি যে পেলেন, তা একটুখানি প্রমাণ
কর্নেল তাকে আশ্বস্ত করে বললেন,–দিচ্ছি। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার একটা নেমকার্ড বের করে উল্টোপিঠে কিছু লিখে দিলেন।
কার্ডটা অঘোরবাবু যথারীতি চশমার খাপে ভরে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন।
হালদারমশাই হাসলেন,–খালি কয় মনে করুন। কী কাণ্ড!
বললুম;-তা মনে করুন, ভুলো মনের মানুষ। তাই মনে করুন অর্থাৎ স্মরণ করুন বলেন।
হালদারমশাই আরও হেসে অস্থির হলেন। কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–জয়ন্ত ঠিকই ধরেছে। তবে মনে করুন বলেও সবকিছু ঠিকঠাক মনে পড়ে না। নীলপুর কৃষ্ণনগরের কাছে। ওখানকার সরপুরিয়া বিখ্যাত। রায়মশাই আমার জন্য একপ্যাকেট সরপুরিয়া পাঠিয়েছিলেন। অঘোরবাবুর ব্যাগে সেটা থেকে গেছে।
হালদারমশাই তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন,–ওনারে রাস্তায় গিয়ে ধরব নাকি? সরপুরিয়া কত খাইছি! বলে জিভে জল টানার ভঙ্গি করলেন তিনি। তারপর দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
অমনি আবার ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
একটু পরেই আবার অঘোর অধিকারীর আবির্ভাব ঘটল। কাঁচুমাচু মুখে তিনি ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বললেন,–ভুলো মনের এই এক জ্বালা! রায়মশাই মনে করুন স্যারের জন্য সরপুরিয়া পাঠিয়েছেন। দিতে ভুলে গেছি।
