হ্যাঁ। আশা করি, আমার চিঠি পেয়েছেন।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকার শাস্তি মৃত্যু, জানেন তো?
সে কী! ও কথার মানে?
মানে এখনই বুঝিয়ে দিচ্ছি! তারপর লোকটা বাংলায় বলে উঠল, তোমাকে আমি চিনতে পেরেছি। চুরাইল তোমার মুণ্ডু ছেঁড়ার আগে সেকথা জেনে যাও। বলে সে তিনবার শিস দিল।
অমনি চুরাইলটা আবার বিকট চিৎকার করে উঠল। তারপর ধপাস করে একটা শব্দ হল। কর্নেল আমাকে ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং টর্চ জ্বাললেন। আমিও টর্চ জ্বাললুম। বাগানের অন্যদিক থেকেও কয়েকটা টর্চ জ্বলে উঠল।
সেই আলোয় দেখলুম, কাল পোড়োখনিতে দেখা সেই ভয়ঙ্কর প্রাণীটা অথবা প্রেতিনী কর্নেলের ধরাশায়ী ডামির ওপর ঝুঁকে গলায় কামড় বসিয়েছে এবং লাল কাপড়-পরা সেই সাধু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রেতিনীর মাথায় মেয়েদের মতো চুল, হাতে শাঁখা!
সাধু পালাবার চেষ্টা করতেই বুটের শব্দ তুলে পুলিশ অফিসার আর কনস্টেবলরা দৌড়ে এলেন। তাকে ধরে ফেললেন।
এদিকে পোড়োখনির প্রেতিনী তখন ফড়ফড় করে খড় আর কাপড় ছিঁড়ছে। রক্ত না পেয়ে খেপে গেছে যেন। মুহুর্মুহু বিকট চিৎকার করে সে ডামিটা ফর্দাফাই করে ফেলছিল। কর্নেল এগিয়ে গিয়ে তার মুখে টর্চ ফেললেন। তখন সে মুখ তুলল। নীল জ্বলজ্বলে নিষ্পলক হিংস্র চোখ তার। মাথায় বড় বড় চুল। শাঁখা পরা হাতে ধারালো বাঁকানো নখ। বিকট গর্জন করে উঠে দাঁড়াতেই কর্নেল পর পর দুবার গুলি ছুড়লেন। প্রেতিনী নেতিয়ে পড়ে গেল। আমি দৌড়ে গেলুম কর্নেলের কাছে।
কর্নেল চুরাইলের মাথার চুল ধরে টান দিতেই উপড়ে গেল। কর্নেল হো হো করে হেসে বললেন,–স্ত্রীলোকবেশী এবং হাতে শাঁখা-পরা এই প্রাণীটিকে আশা করি, চিনতে পেরেছ জয়ন্ত!
কী আশ্চর্য! এটা একটা ভালুক না?
হ্যাঁ। ভালুকই বটে। তবে খুব শিক্ষিত ভালুক। ওকে পান্নাবাবু মানুষের রক্ত খাইয়ে রক্তলোভী করে তুলেছিলেন। কর্নেল একজন পুলিশ অফিসারকে বললেন,–মিঃ সিং! তাহলে আসামীকে আপনারা নিয়ে যান! আমি একটু পরে যাচ্ছি থানায়।
পুলিশ অফিসার হাসতে হাসতে কর্নেলের কাটামুণ্ডুটা কুড়িয়ে বললেন, আপনার কাটামুণ্ডু কিন্তু চমৎকার কথা বলছিল। আপনি যে এত চমৎকার ভেন্ট্রিলোকুইজম্ জানেন, ভাবতে পারিনি। নিন আপনার কাটামুণ্ডু।
কর্নেল তার কাটামুণ্ডু দেখে নিয়ে বললেন,–একটু রং চটে গেছে মাত্র। আবার কুমোরটুলি গিয়ে পালমশাইকে দেব।
ততক্ষণে বাড়ির বাইরের আলোগুলো আবার জ্বলে উঠেছে। যদুবাবু, দশরথ, পিঙ্কি আর তার কুকুর বেরিয়ে এল। পুলিশ সাধুবাবা ওরফে পান্নালাল ওঝাকে থানায় নিয়ে গেল। সর্বনাশা মরা ভালুকটা বাগানে পড়ে রইল। কুকি বারান্দা থেকে সেইদিকে লক্ষ্য করে খুব ধমক দিতে থাকল। পিঙ্কি কিছু বুঝতে না পেরে তাকে তুলে নিয়ে চাটি মেরে বলল,খুব হয়েছে।
কিন্তু চুরাইল-রহস্য এভাবে ফাঁস হওয়াতে দশরথ খুশি হয়নি বুঝি। একপ্রস্থ চা এনে দিয়ে বলল,–লেকিন করাড়ি রোটি ইয়ে বদমাস ভালুর না আছে, রামজির কিরিয়া। যো ভালু খুন পিতা, উও কভি রোটি বানানে নেহি জানতা। রোটি ঔর কৈ ভালু বানিয়েছে।
অতএব করাড়ি রোটি খেয়ে তার ক্ষতি হবে না। কর্নেল আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–কী ডার্লিং, কাটামুণ্ডুর কথা বলার ম্যাজিক দেখালুম কি না বলো?
ভেন্ট্রিলোকুইজম্ কবে শিখলেন?
সম্প্রতি কলকাতার বিখ্যাত এক হরবোলার কাছে শিখতে হয়েছে। তোমার পাশে বসে দিব্যি কথা বলছিলুম সাধুবাবার সঙ্গে। সাধুবাবা ভেবেছিল, গাছে হেলান দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলছি। তবে মহাধড়িবাজ লোক। বিকেলে হ্যান্ডব্যাগ ফেরত পাঠানোর সময় সেই বিদেশি কোম্পানির নামে একটা চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলুম। লিখেছিলুম,–আমিই ঝগবো কোম্পানির প্রতিনিধি। রাত ন’টা নাগাদ যদুবাবুর বাগানে এসে দেখা করুন। সাধুবাবা চালাকিটা ধরে ফেলেছিল। আমিও জানতুম, সে আমার চালটুকু ধরে ফেলবে। কিন্তু তাহলেও সে আসবে। আমাকে খতম করার জন্য তাকে চুরাইল’ নিয়ে আসতেই হবে। আমি তার সব প্ল্যান ভেস্তে দিতে চলেছি কি না।
হুঁ, বুঝলুম। কিন্তু চিৎপুরে গুপ্ত কোম্পানিতে যাওয়ার রহস্যটা কী?
কর্নেল হাসলেন। তোমার মনে পড়ল তাহলে? হ্যাঁ–তুমি শুধু আমাকে গুপ্ত কোম্পানির দোকানে ঢুকতে দেখেছিলে। কিন্তু আমাকে ওদিন অন্তত সারা চিৎপুর এলাকার অসংখ্য দোকানে ঢুকতে হয়েছিল।
কেন?
দুটো জিনিসের তদন্তে। জটাজুট আর অস্বাভাবিক গড়নের একটা পরচুলো সম্প্রতি এক বছরে একইসঙ্গে কেউ কিনেছে কিনা। গত শীতে ভৈরবগড়ে গিয়ে চুরাইলটাকে দেখামাত্র ভালুক বলে সন্দেহ হয়েছিল। তুমি কি ভালুকের মাথা লক্ষ্য করেছ, জয়ন্ত? ওই মাথায় স্ত্রীলোকের পরচুলো আটকাতে হলে বিশেষ অর্ডার দিয়ে পরচুলা বানাতে হবে। যাই হোক, খোঁজ পেয়ে গেলুম শেষপর্যন্ত। এক পরচুলা ব্যবসায়ী কথায়-কথায় বলে ফেলল,–এক ভালুকওয়ালার অদ্ভুত অর্ডার পেয়েছিল। সে নাকি নিজে জটাজুটধারী সাধু সাজবে এবং তার ভালুককে স্ত্রীলোক সাজিয়ে শাড়ি-শাঁখা পরিয়ে খেলা দেখাবে। তাই …
বাধা দিয়ে বললুম,–ভালুকটার হাতে শাঁখা দেখেছি। পরনে শাড়িও আছে নাকি?
আছে। গণ্ডগোল এবং আতঙ্কের চোটে লক্ষ্য করো নি। এখন গিয়ে দেখে এসো, লালপেড়ে শাড়িও আছে।
