ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে গেলুম। কর্নেল আমার পিছনে। তার কোলে কুকি। সাধুবাবা এতক্ষণে গর্ত থেকে উঠেছেন। কিন্তু আমাদের দেখেই থমকে দাঁড়ালেন। আমি রিভলবার বের করে চেঁচিয়ে বললুম,–খবরদার সাধুবাবা! পালাবার চেষ্টা করলে গুলি ছুঁড়ব।
সাধুবাবা অমনি দৌড়ে গিয়ে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। আমিও দৌড়লুম। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর তার পাত্তা পেলুম না। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করে হন্যে হয়ে কর্নেলকে ডাকলুম। একটু তফাতে কর্নেল কোনো অদৃশ্য জায়গা থেকে সাড়া দিয়ে বললেন, এখানে চলে এসো জয়ন্ত!
একটা পোড়োখনির মুখই হবে। বিরাট গর্ত। সেই গর্তে কি কর্নেল সাধুবাবার মতো পা হড়কে পড়ে গেছেন? কাছে গিয়ে দেখি, আরও অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে। গর্তের ভেতর বেচারি পিঙ্কির মুখ একটুকরো লাল কাপড়ে বাঁধা। দু’হাত এবং পা-দুটো লতা দিয়ে বাঁধা। কুকি তার দিকে যেন অবাক চোখে তাকিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল তার বাঁধন কেটে দিচ্ছেন ছুরি দিয়ে।
কর্নেল বললেন, আমরা না এসে পড়লে কী সাংঘাতিক ব্যাপার হত, ভেবে শিউরে উঠছি জয়ন্ত!
পিঙ্কি কিন্তু মোটেও ঘাবড়ে যায়নি। দিব্যি উঠে দাঁড়াল। তারপর কুকিকে কোলে নিয়ে দুবার তার গালে চড় মারল,আর যদি কখনও গুহায় ঢুকিস, তোকে মেরে ফেলব বলে দিচ্ছি!
কর্নেল তাকে ওপরে তুলে ধরলেন। আমি টেনে নিলুম। তারপর কর্নেলকে উঠতে সাহায্য করলুম। কর্নেল পিঙ্কির কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমাকে সাধুবাবা কেন বেঁধে রেখেছিল, পিঙ্কি?
পিঙ্কি বলল,–কুকি সাধুবাবার ব্যাগ নিয়ে এসেছিল গুহার ভেতর থেকে। সাধুবাবা ওর পেছন-পেছন এসে আমাকে বলল, পিঙ্কি, তোর কুকুর আমার ব্যাগ চুরি করেছে। পিঙ্কি হাসতে লাগল। আমি বললুম, সাধুবাবা! তুমি পারো তো ওর কাছে চেয়ে নাও। তখন সাধুবাবা রেগে গেল। গিয়ে চোখ কটমট করে বলল–তোকে চুরাইল দিয়ে খাওয়াব। তারপর আমার মুখ বেঁধে দিল।
তুমি বাধা দাওনি?
পিঙ্কি খিলখিল করে হাসল। কেন? সাধুবাবার সঙ্গে আমার খুব ভাব যে! রোজ দেখা হয়। কত গল্প বলে। আমার সঙ্গে তো জোক করেছে সাধুবাবা!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–জোক্ নয়, পিঙ্কি! সাধুবাবা তোমাকে সত্যি চুরাইলের সমানে ঠেলে দিত। আর কখনো সাধুবাবার কাছে এসো না।
পিঙ্কি মুখে অবিশ্বাস ফুটিয়ে বলল,–যাঃ!
কর্নেল বললেন,–সাধুবাবা কোন গুহায় থাকেন তুমি জানো?
পিঙ্কি মাথা দুলিয়ে বলল,–হুঁ। বলে সে চেঁচিয়ে ডাকল, সাধুবাবা! সাধুবাবা! কোথায় তুমি?
অমনি আমাদের সামনে একটা পাথর এসে পড়ল। কর্নেল বললেন,–শিগগির এখান থেকে কেটে পড়াই ভালো, জয়ন্ত। পিঙ্কি, চলো! সাধুবাবা পাথর ছুঁড়তে শুরু করেছে।
পিঙ্কিকে টানতে টানতে কর্নেল দৌড়লেন। কুকি তার কোল থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য ছটফট করছিল। কিন্তু পিঙ্কি কুকিকে ছাড়ল না। এদিকে দুমদাম করে পাথর এসে পড়ছে ঢিবির আড়াল থেকে। ফাঁকা মোটামুটি সমতল একটা জায়গায় পৌঁছে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে এবার পিঙ্কিদের বাড়ির পথ ধরলুম। কর্নেল বললেন,–পিঙ্কি, ওবেলা তোমাকে নিয়ে আসব। তখন সাধুবাবার গুহাটা দেখিয়ে দেবে। এখন সাধুবাবা বড় চটে গেছে। পিঙ্কি মাথা দুলিয়ে সায় দিল …
.
পাঁচ
সাধুবাবার হ্যান্ডব্যাগটার দশা জরাজীর্ণ। খুলতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। প্রথমে বেরুল নন্দবাবুর সেই পোড়োখনি বিক্রির আন রেজিস্টার্ড দলিল। দলিলে রক্তের ছোপ লেগে আছে। কাল রাতে, রুদ্রবাবুর কাছ থেকে এটা নেওয়া হয়েছিল।
তারপর বেরুল পাণ্ডেজির হারানো হ্যান্ডনোট। পান্নালাল ওঝার সই করা। পাঁচ হাজার টাকা কর্জ নিচ্ছেন পান্নাবাবু শতকরা মাসিক তিরিশ টাকা সুদে। আর বেরুল কিছু কাগজপত্র। বললুম, –তাহলে পোড়োখনির সাধুবাবাই দেখছি পান্নালাল ওঝা।
কর্নেল বললেন,–আবার কে? দেনা আর প্রতারণার মামলায় ফেরার হয়ে পান্নালাল পোড়োখনির ভেতর কোনো গুহায় আত্মগোপন করেছিল,আমার ধারণা …
কথায় বাধা পড়ল। যদুবাবা আর মোহনজি এলেন। মোহনজি ঘরে ঢুকে বললেন, –শ্বশুরমশাইয়ের একটা নোটবইয়ের ভেতর এই চিঠিটা হঠাৎ পেয়ে গেলুম। চিঠিটা পড়ে মনে হল, এটা একটা ক্ল হতে পারে। দেখুন তো কর্নেল।
কর্নেল চিঠিটা পড়ে বললেন,–হা, ঠিক। এমনটি অনুমান করেছিলুম। চিঠিতে পান্নাবাবু । ইংরেজিতে লিখেছেন, ৫ মার্চ রাত বারোটা নাগাদ স্টেশনে পাণ্ডেজি গেলে পান্নাবাবু তাঁকে দলিলটা দেবেন।
যদুবাবু চমকে উঠে বললেন,–কীসের দিলল?
নন্দবাবুর দলিল। অথচ আমরা জানি, তখনও দলিল আপনার মায়ের আলমারিতে ছিল। মাত্র গতকাল সেটা রুদ্রবাবু চুরি করেছিলেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, পাণ্ডেজিকে মিথ্যা লোভ দেখিয়ে অত রাতে বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন পান্নাবাবু। উদ্দেশ্য হল, তাকে খুন করা।
মোহনজি মৃদু স্বরে বললেন,–কীসের দলিল?
কর্নেল বললেন,–যদুবাবুর কাছে শুনবেন। তবে বোঝা যাচ্ছে, পাণ্ডেজিরও দলিলটার ওপর লোভ ছিল। প্রচণ্ড লোভই বলব। নইলে অত রাতে বাড়ি ছেড়ে যাবেন কেন? তাছাড়া দলিলের বদলে নিশ্চয় পান্নাবাবু কিছু দাবি করেছিলেন। কী দাবি হতে পারে সেটা? নিশ্চয় কর্জ শোধ। এক লক্ষ পঁচাশি হাজার টাকার বদলে ওই দলিলটা খুব দামি মনে হয়েছিল পাণ্ডেজিব কাছে। কেন, বুঝতে পারছ কি জয়ন্ত?
