আমি কিছু বলার আগেই যদুবাবু বলে উঠলেন,–পোড়োখনির ঠিকানা দলিলেই ছিল। দেখা যাচ্ছে, পাণ্ডেজিও জানতে পেরেছিলেন, নন্দবাবুর ওই পোড়োখনির ভেতর বহুমূল্য কিছু জিনিস আছে। ভারি আশ্চর্য তো!
কর্নেল বললেন,–মিছিরজিকে দিয়ে পান্নাবাবুই হ্যান্ডনোটটা চুরি করিয়েছিলেন বোঝা যায়। ওটা না থাকলে পাণ্ডেজি বা তার জামাই কেউই পান্নাবাবুর কাছে আইনত টাকা দাবি করতে পারছেন না। পান্নালাল ওঝা অতি ধূর্ত লোক দেখা যাচ্ছে।
মোহনজি বললেন, কিন্তু মিছিরজিকে কেন খুন করবেন পান্নাবাবু!
যে উদ্দেশ্যে রুদ্রবাবুকে খুন করেছেন, সেই উদ্দেশ্যেই অর্থাৎ জিনিস হাতিয়ে নিয়েছেন যে টাকা দিয়ে, সেই টাকা আবার পান্নাবাবুর পকেটে ফিরে আসতে পারে–যদি ওঁদের তিনি খুন করেন। নির্বোধ মিছিরজি টাকার লোভে পান্নাবাবুকে হ্যান্ডনোট ফেরত দিতে গেলেন। টাকাও পেলেন। কিন্তু তাকে খুন করে সেই টাকাগুলো কেড়ে নিলেন পান্নাবাবু। রুদ্রবাবুর বেলাতেও একই ব্যাপার।
বলে কর্নেল একটু হাসলেন। যদুবাবু, আপনাদের হারানো দলিল আমার হাতে ফিরে এসেছে।
যদুবাবু লাফিয়ে উঠলেন। বলেন কী! কোথায় পেলেন?
সময়ে জানতে পারবেন। তবে একটা কথা, আপনার মেয়ে পিঙ্কির কি স্কুলের ছুটি আজ?
না তো। বাড়িতে অমন একটা ঘটনা ঘটল, তাই ওকে স্কুল যেতে দিইনি। কেন?
পিঙ্কি যেন একা কোনোভাবে বাড়ির বাইরে না যেতে পারে। খুব সাবধান। বিকেলে আমি একবার অবশ্য ওকে নিয়ে বেরুব। কিন্তু একা যেন ও না বেরোয়।
যদুবাবু উদ্বিগ্নমুখে বললেন, ঠিক আছে, কিন্তু কেন?
কর্নেল হাসলেন। বললুম তো। সময়ে সবই জানতে পারবেন।
মোহনজি বললেন,–সবই ধাঁধা থেকে গেল, কর্নেল। আপনি বলছেন, পান্নাবাবুই খুনী। কিন্তু ওরকম বীভৎসভাবে খুন–মুণ্ডু কাটা এবং রক্তহীন বডি। আর এই ভয়ঙ্কর চিৎকার।
যদুবাবু বললেন,–ঠিক ঠিক। চুরাইলের ব্যাপারটা তাহলে কী?
কর্নেল হাই তুলে বললেন,আশা করি, আজ রাতেই চুরাইলের রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে।
যদুবাবু ও মোহনজি বেরিয়ে গেলেন। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে বারোটা বাজে প্রায়। কর্নেল আরামকেদারায় চিত হয়ে চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন।
একটু পরে বললুম,–আচ্ছা কর্নেল, নন্দবাবুর পোড়োখনির ঠিকানা তো পাওয়া গেছে। ওর ভেতর যদি সত্যি গুপ্তধন থাকে, তাহলে যদুবাবুই তো তার মালিক হবেন?
কর্নেল চোখ বুজে ছিলেন। চোখ খুলে বললেন,–না জয়ন্ত! তুমি ভাবছ, ওখানে সোনাদানা হিরে-জহরত লুকনো আছে। সাধুবাবা ওরফে পান্নাবাবুর হ্যান্ডব্যাগে বিদেশের এক কোম্পানির লেখা একটা চিঠি আছে। একপলক চোখ বুলিয়েই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। পান্নাবাবু গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল করে বেড়াচ্ছিলেন। না–সোনাদানা লুকনো নেই। ওটা আসলে একটা ইউরেনিয়ামের খনি। পান্নাবাবু ওই বিদেশি কোম্পানিকে গোপনে ইউরেনিয়াম বেচতে চেয়েছিলেন। কোম্পানি তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে চেয়েছে। তাই পান্নাবাবু হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
অবাক হয়ে বললুম–তাহলে আইনত সরকার এর মালিক হবেন, তাই না?
হ্যাঁ। খনিটা ছিল ব্রিটিশ আমলের কোন্ সায়েবের। নিছক অভ্রের খনি। অভ্র তোলা শেষ হলে দৈবাৎ ইউরেনিয়ামের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল নীচের স্তরে। কিন্তু সেই সায়েবকে কোনো কারণে দেশে ফিরতে হয়। যাবার সময় নন্দবাবুকে বেচে দিয়েছিলেন। কর্নেল তাঁর প্রকাণ্ড ব্যাগের দিকে আঙুল তুলে ফের বললেন,–ওই ব্যাগে একটা বই আছে। পড়ে দেখো। ওতে নন্দবাবুর কথা নেই। কিন্তু এদেশের খনির ইতিহাস আছে। প্রচুর তথ্য আছে। ভৈরবগড়ের খনির কথাও আছে। ব্রিটিশ আমলে খনিবিজ্ঞানীরা ভৈরবগড় অঞ্চলে ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা স্বীকার করেছিলেন।
ব্যাগ থেকে বইটা বের করে পাতা উলটে বললুম,–এসব পড়ার ধৈর্য আমার নেই। কিন্তু আপনার ব্যাগের ভেতর প্যাকেট-করা প্রকাণ্ড বস্তুটি কী?
কর্নেল হাসলেন। কুমোরটুলির ভাস্কর দেবেন পালের আশ্চর্য ভাস্কর্য।
আপনার সেই কাটামুণ্ডু! সঙ্গে নিয়ে এসেছেন দেখছি! ব্যাপার কী?
কর্নেল চোখ বুজে বললেন,আজ রাতে ম্যাজিক দেখাব, ডার্লিং! কাটামুণ্ডু কথা বলবে।
.
ছয়
দুপুরে আমার চিরদিন বাঙালির প্রিয় ভাতঘুমের অভ্যাস। গতকাল ভাতঘুমের সুযোগ পাইনি। আজ আমাকে সে লম্বা করিয়ে ছাড়ল। দশরথের ডাকে উঠে দেখি, পাঁচটা বাজে! চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলুম, কর্নেল কোথায় গেলেন?
দশরথ বলল,–কর্নিল স্যার পিঙ্কিদিদিকি সাথ ঘুমতে গেছেন।
মনে পড়ল, সাধুবাবার গুহা দেখাতে নিয়ে যাবার কথা ছিল পিঙ্কির। চা খেয়ে বাগানের শেষপ্রান্তে গিয়ে পোড়োখনি এলাকার দিকে কর্নেল ও পিঙ্কিকে খুঁজলুম। কিছুক্ষণ পরে দুজনকে দেখতে পেলুম। কুকি কর্নেলের কাঁধে চেপেছে। পিঙ্কি হাত নেড়ে কথা বলতে বলতে আসছে। কর্নেল তার কাঁধে একটা হাত রেখে হেঁটে আসছেন।
মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে মুখোমুখি হলুম ওঁদের। কর্নেল বললেন, তুমি ঘুমোচ্ছ বলে ডাকিনি ডার্লিং! আশা করি, তোমার রাতের ঘুমটা পুষিয়ে গেছে।
বললুম,–সাধুবাবার আস্তানায় ঢুকেছিলেন নাকি?
কুকিকে পাঠিয়েছিলুম ওঁর হ্যান্ডব্যাগ ফেরত দিতে।
সে কী!
হ্যাঁ। দলিল, হ্যান্ডনোট, যা কিছু ছিল, সব ফেরত দিয়েছি।
পিঙ্কি কুকিকে নিয়ে বাগানে খেলতে ব্যস্ত হয়েছে। সেইসময় যদুবাবু বেরিয়ে এসে ওকে টানতে-টানতে বাড়ি নিয়ে গেলেন।
