কর্নেল বললেন, হ্যান্ডনোটগুলো পেয়েছেন মোহনজি?
মোহনবাবু বললেন,–হ্যাঁ। ছখানা পেয়েছি। একখানা পাইনি। মনে পড়ছে, ওই হ্যান্ডনোটখানার জন্য শ্বশুরমশাই মিছরজিকে খুব বকাবকি করছিলেন। মিছরজিকে উনি খুব বিশ্বাস
করতেন তো! আলমারির চাবি অনেক সময় মিছিরজির কাছেও থাকত।
কর্নেলের চোখ দুটো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। বললেন,–কবে বকাবকি করছিলেন মনে আছে?
এই তো–যে-রাতে শ্বশুরমশাই খুন হলেন, তার আগের দিন।
মিছিরজি খুন হল তার পরের রাতে। তাই না?
হ্যাঁ। মোহনবাবু একটু অবাক হলেন যেন। বললেন, আপনি কি মনে করছেন হ্যান্ডনোট হারানোর সঙ্গে ওঁদের খুন হওয়ার সম্পর্ক আছে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মোহনবাবুকে উত্তেজিত দেখাল। কিন্তু আমিও যে সে-রাতে চুরাইলের ডাক শুনেছিলাম, কর্নেল! কাল রাতে যদুবাবুর ভাইয়ের বেলাতেও শুনলুম নাকি চুরাইল ডেকেছিল!
হ্যাঁ। ডেকেছিল। আমিও শুনেছি।
মোহনবাবু আরও উত্তেজিতভাবে চাপা গলায় বললেন,–তাছাড়া শ্বশুরমশাইয়ের ডেডবডিতে যেমন, তেমনি মিছিরজির ডেডবডিতেও একফোঁটা রক্ত ছিল না। মর্গের রিপোর্টেও সেকথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি স্থানীয় বুড়োবুড়িদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, চুরাইল নাকি মানুষের মুণ্ডু ছিঁড়ে গলা থেকে রক্ত চুষে খায়। রুদ্রবাবুর বেলায় অবশ্য মুণ্ডু ছিঁড়ে রক্তচোষার সুযোগ পায়নি শুনেছি। তবে গলায় নখ বসিয়ে মুণ্ডু ছিঁড়তে চেষ্টা করেছিল। তাই কিনা বলুন?
কর্নেল আস্তে বললেন,–ও নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এবার বলুন, এই তালিকার কোন্ খাতকের হ্যান্ডনোট পাওয়া যায়নি।
মোহনবাবু তালিকার একটা নামে ডটপেনের চিহ্ন দিয়ে বললেন,–এঁর। কিন্তু সমস্যা হল, ইনি পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন বছর দশেক আগে। সুদে-আসলে এখন দাঁড়িয়েছে … মাই গুডনেস! হিসেবে ভুল হয়নি তো?
কর্নেল দেখে নিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন,–না। মাসেই যদি শতকরা তিরিশ টাকা সুদ হয়, তাহলে একমাসে পাঁচ হাজার টাকার সুদ হবে পনেরোশ টাকা। বছরে আঠারো হাজার টাকা। দশ বছরে দাঁড়াবে একলক্ষ আশি হাজার টাকা। সুদসহ ১,৮৫,০০০ টাকা। সহজ হিসেব।
মোহনবাবু হতাশ মুখে হাসলেন। কিন্তু খাতক ভদ্রলোকই তো সেই থেকে নিরুদ্দেশ।
আমার মাথায় গতরাতে যদুবাবুর কাছে শোনা একটা নাম ঝিলিক দিল। বলে ফেললুম,–সেই খনিমালিক নন্দনবাবুর পিসতুতো না মাসতুতো দাদা পান্নাবাবু নন তো?
মোহনবাবু বললেন,–ঠিক, ঠিক। পান্নালাল ওঝা। আমি তাঁকে কখনও দেখিনি। কারণ আমার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক আগে। তাছাড়া থাকতুম ধানবাদে। গতবছর শ্বশুরমশাইয়ের অনুরোধে ওঁর ব্যবসার দেখাশুনা করতে এসেছি।
ওপাশে একজন বৃদ্ধ কর্মচারী খাতা লিখতে-লিখতে আমাদের কথা শুনছিলেন। বললেন, –পান্নাবাবুর কনট্রাকটারি কারবার ছিল। লেবার সাপ্লাই করতেন। সেবার কারবারে লস খেয়ে বিপদে পড়েছিলেন। পাণ্ডেজি সেদিন ওঁকে পাঁচ হাজার টাকা না দিলে লেবাররা ওঁকে মেরে ফেলত। মজুরি মেটাতে পারছিলেন না।
কর্নেল বললেন,–পান্নাবাবুর চেহারা কেমন ছিল?
বৃদ্ধ কর্মচারীটি বাঙালি। বললেন,–রোগা, ঢ্যাঙা মতো। রঙটা বেশ ফর্সা। চোখ দুটো ছিল খয়রা–যাকে বলে বেড়ালচোখো।
কর্নেল মোহনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন,–পাণ্ডেজি টাকা আদায়ের জন্য মামলা করেননি?
সেই বাঙালি কর্মচারী ভদ্রলোক বললেন,–জামাইবাবু জানেন না। মামলা করেছিলেন পাণ্ডেজি। দেওয়ানি মামলা, তাতে অন্যপক্ষ গরহাজির। শেষে পাণ্ডেজি প্রতারণার মামলা করেছিলেন। পান্নাবাবুর নামে হুলিয়া জারি হয়েছিল। কিন্তু ওঁকে পুলিশ খুঁজে পায়নি।
মোহনবাবু বললেন,–আশ্চর্য, শ্বশুরমশাই এ-কথাটা তো বলেননি! কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–চলি মোহনজি! দরকার হলে আবার আসব।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে কর্নেল বললেন,–এসো তো জয়ন্ত, আমরা রেললাইন ধরে পোড়োখনি এলাকায় যাই। দিনদুপুরে আশা করি চুরাইলটার আবির্ভাব ঘটবে না।
পোড়োখনির উত্তর-পূর্বে জঙ্গল আর টিলার ভেতর দিয়ে রেললাইনটা ঘুরে গেছে ধানবাদের দিকে। কিছুক্ষণ পরে আমরা রেললাইন থেকে নেমে একটা টিলার পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকলুম। এদিকটায় অজস্র খানাখন্দ, বড়-বড় পাথর, লালমাটির ঢিবি আর ঝোঁপঝাড়। এক জায়গায় গিয়ে কর্নেল হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। বললাম,–কী?
কর্নেলকে উত্তেজিত মনে হল। চাপা গলায় বললেন,–আরে! সাধুবাবা যে!
চমকে উঠে বললুম–কই, কই?
কর্নেল আচমকা হ্যাঁচকা টানে আমাকে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও বসলেন। ফিসফিস করে বললেন,–এসো, আমরা গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যাই। সাবধান, যেন সাধুবাবা দেখতে না পায়।
সাধুবাবাকে আমি দেখতে পাইনি। কর্নেলের পেছনে-পেছনে ছোটবড় পাথর, ঝোঁপঝাড় আর ঢিবির আড়ালে অন্ধের মতো প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলুম। প্রকাণ্ড একটা পাথর দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাথরটার একপাশে ঘন ঝোঁপঝাড়। সেখানে হাঁটু দুমড়ে বসে। কর্নেল ঝোঁপের ভেতর উঁকি দিলেন। দেখাদেখি আমিও উঁকি দিলুম। একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল।
লাল-কাপড়-পরা সেই সাধুবাবা যেন পিঙ্কির কুকুর কুকির সঙ্গে লুকোচুরি খেলছেন। কিন্তু ধারেকাছে কোথাও পিঙ্কি নেই।
পিঙ্কি নেই। অথচ কুকি আছে। ব্যাপারটা আমার গোলমেলে মনে হল। কিন্তু ওকি সত্যি লুকোচুরি খেলা? কুকি পাথরের আড়ালে লুকোতেই সাধুবাবা একটুকরো পাথর তুলে ছুঁড়ে মারলেন। কুকি আবার আরেকটা পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল। সাধুবাবার মুখের চেহারা দেখে চমকে উঠলুম। রাগে খেপে গেছেন যেন। আবার পাথর কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারলেন। অল্পের জন্য কুকি বেঁচে গেল। এবার সে আমাদের দিকে দৌড়তে শুরু করল। সাধুবাবা তাড়া করে আসতেই একটা খাদে আছাড় খেয়ে পড়লেন। খাদটা গভীর বলে মনে হল। ততক্ষণে কুকি যেন আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েছে। সে সোজা এসে ঝোপে ঢুকল। কর্নেল মৃদু শিস দিলেন। কুকি থমকে দাঁড়াল। এতক্ষণে দেখলুম, তার মুখে একটা ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ রয়েছে। কর্নেল আবার শিস দিলে সে কাছে চলে এল। কর্নেল তাকে কোলে তুলে নিয়ে তার মুখের হ্যান্ডব্যাগটা ছাড়িয়ে নিলেন। বললেন,–শিগগির জয়ন্ত! সাধুবাবাকে এখনই ধরে ফেলতে হবে।
