দশরথ বাইরে থেকে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলল,–রামজির কিরিয়া বড়বাবু! হামি কভি গাঁজা পিই না।
যদুবাবু ধমক দিয়ে বললেন,–খাস না! তাই রাতে ডাকলে তোর সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না!
একটু পরে চা খেতে খেতে বললুম,–কর্নেল, নন্দবাবুর সেই পোড়োখনিটাতে গুপ্তধন থাকার ব্যাপারে আপনার কী মতামত, এখনও বলেননি কিন্তু!
কর্নেল কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন, সেই সময় বাইরে পায়ের ধুপধাপ শব্দ শোনা গেল। তারপর কেউ দৌড়ে বারান্দায় উঠল। যদুবাবু বললেন,–কে? কে? বাইরের লোকটা সশব্দে আছাড় খেল যেন। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এই সময় দশরথের চাপা আর্তনাদ শোনা গেল, হায় রাম! এত্তা খুন!
বাইরের আলোটা মিটমিটে। আমরা হন্তদন্ত বেরিয়ে দেখি, বারান্দায় রুদ্রবাবু পড়ে আছেন। তার গলার কাছে ক্ষতচিহ্ন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। যদুবাবু হুমড়ি খেয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, রুদ্র! রুদ্র! কে তোর এ দশা করল রে? তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন ছেলেমানুষের মতো।
কর্নেল রুদ্রবাবুর দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন, রুদ্রবাবু! কে আপনাকে মেরেছে?
রুদ্রবাবু অতিকষ্টে বললেন,–বিশ্বাসঘাতক! তারপর তাঁর শরীর স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে স্থির হয়ে গেল। বুঝলুম, বেচারার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই বাগানের গাছপালার
ওদিকে কোথাও সেই চুরাইলের ডাক শোনা গেল … আঁ—আঁ—আঁ–ইঁ—ইঁ–ইঁক!
একটা প্রচণ্ড বিভীষিকার রক্ত-হিম-করা আতঙ্ক আমাদের কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃসাড় করে ফেলল।
.
চার
রাতে ভালো ঘুম হয়নি। পুলিশ এসে প্রাথমিক তদন্ত করে মর্গে লাশ চালান দিয়েছিল। পুলিশের হাবভাবে বুঝেছিলাম, দায়সারা করে চোর-ডাকাতের ওপরই ব্যাপারটা চাপাতে চায়। কর্নেলকে মোটও পাত্তা দেয়নি পুলিশ। সকালে দশরথ চা এনে যখন আমার ঘুম ভাঙাল, তখন আটটা বেজে গেছে। উঠে দেখলুম, কর্নেল নেই। দশরথ বলল,–কর্নেল স্যার সুবেসে বেরিয়েছেন। কুছু বোলেননি।
কর্নেল ফিরলেন ঘন্টাখানেক পরে। জিজ্ঞেস করলে বললেন,–মর্গে গিয়েছিলুম। মর্গের ডাক্তারের মতে, পাণ্ডেজি আর মিছিরজির মতো কেউ রুদ্রবাবুর মুণ্ডু কাটার চেষ্টা করেছিল।
বললুম,–রুদ্রবাবু মৃত্যুর আগে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছেন কর্নেল। ব্যাপারটা রহস্যময় নয়?
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন,–তা তো বটেই! তবে পুলিশ বলছে, খুনী রুদ্রবাবুর পরিচিত লোক। আর খুনের উদ্দেশ্য হল ছিনতাই।
অবাক হয়ে বললুম,–ছিনতাই! উনি কি ওই মাঠে টাকাকড়ি নিয়ে বসেছিলেন?
হ্যাঁ। কারণ আজ ভোরে পুলিশ ইন্সপেক্টর পরমজিৎ সিং পোড়োখনির ওখানে কোথায় রক্তমাখা একশো টাকার নোটের বান্ডিল কুড়িয়ে পেয়েছেন। ছিনতাই করে পালাবার সময় খুনীর হাত থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে।
অত টাকা নিয়ে ওখানে কী করছিলেন রুদ্রবাবু? পেলেনই বা কোথায় অত টাকা?
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–এমনও তো হতে পারে, খুনীরই টাকা ওগুলো। অর্থাৎ রুদ্রবাবু সেই দলিলটা চুরি করে তাকেই বেচতে গিয়েছিলেন। দলিল হাতিয়ে এবং টাকা মিটিয়ে হঠাৎ খুনী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রুদ্রবাবু আহত অবস্থায় কোনোরকমে পালিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু টাকার বান্ডিলটা পড়ে যায়।
তাও হতে পারে বৈকি।
কর্নেল কিছুক্ষণ গুম হয়ে সাদা দাড়ি টানতে শুরু করলেন। বুঝলুম, সূত্র হাতড়াচ্ছেন। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–এসো জয়ন্ত, আমরা একবার পাণ্ডেজির গদি থেকে ঘুরে আসি।
রাস্তায় যেতে যেতে বললুম,–কিন্তু একটা রহস্য কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। রুদ্রবাবুর পিছন পিছন চুরাইল বা শাঁখচুন্নিটাও ছুটে এসেছিল। তার চিৎকার আমরা শুনতে পেয়েছিলুম। এখন কথা হল …
কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–আরও জট পাকিয়ে যাবে, ডার্লিং! এখন সবচেয়ে দরকারি কাজ হল মাথা ঠাণ্ডা রাখা। চুরাইল-রহস্য নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপাতত শুধু হত্যাকাণ্ডের দিকে লক্ষ্য রেখে এগোতে চাই।
ভিড়ে ভরা বাজার এলাকা ছাড়িয়ে আমরা স্টেশনে পৌঁছলুম। পাণ্ডেজির গদি স্টেশনের ওধারের। ওদিকটায় চুন-সুরকির আড়ত, কাঠগোলা, ছোট কলকারখানা। আর কিছু চা-সিগারেটের দোকান আছে। এখানে প্রকাণ্ড তরাজুতে খন্দের বস্তা বোঝাই হচ্ছে। কর্নেলকে দেখতে পেয়ে একজন ফর্সা সুশ্রী চেহারার ভদ্রলোক উঁচু তক্তপোশ থেকে নেমে এসে নমস্কার করলেন। কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিলেন, পাণ্ডেজির জামাই মোহনবাবু। মোহনবাবু পরিষ্কার বাংলা বলেন। খুব খাতির করে বসালেন। চা-সন্দেশ এসে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
কর্নেল বললেন,–মোহনজি, আপনাকে পুরনো খাতাপত্র দেখতে বলেছিলুম গতকাল। দেখেছেন কি?
মোহনজি পেছনের তাক থেকে একটা প্রকাণ্ড পুরনো খাতা নামিয়ে বললেন,–দেখেছি কনের্ল। শ্বশুরমশাই নিজে এই খাতাটা লিখতেন। এটা ওঁর মহাজনি কারবারের খাতা। এই দেখুন, এই পাঁচজন খাতকের নাম আমি খুঁজে বের করেছি। এঁরা প্রত্যেকেই মোটা টাকা ধার নিয়েছিলেন। এখনও কারুর কারুর বাকি আছে।
খাতার ভেতর থেকে একটা চিরকুট বের করে দিলেন মোহনজি। কর্নেল সেটা দেখতে থাকলেন। উঁকি মেরে দেখলুম, নামগুলো ইংরেজিতে লেখা। সাত নম্বর নামটা দেখে চমকে উঠলুম। রুদ্রনারায়ণ দেব–তিন হাজার টাকা। সুদের হার শতকরা মাসে তিরিশ টাকা। পুরোটাই বাকি।
