আমার মাথায় চমক খেলে গেল। বললুম,–কর্নেল! অনেক তান্ত্রিক সাধু প্রেতসিদ্ধ হন শুনেছি। তাদের নাকি পোষা ভূতপ্রেত থাকে। চুরাইল বা শাঁখচুন্নিটা ওই সাধুর পোষা নয় তো?
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, তাহলে এতদিনে তুমি স্বীকার করলে যে ভূতপ্রেত সত্যি আছে?
কী জানি। কিন্তু আপনিও তো ওসবে বিশ্বাস করেন না!
কর্নেল হঠাৎ গলা চড়িয়ে বললেন,–আলবাত করি। কে বলল করি না?
তারপর ডানদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তেমনি চড়া গলায় বলে উঠলেন, কী রুদ্রবাবু! এখানে কী করছেন–অন্ধকারে?
টর্চের আলো সেদিকে ফেলে দেখি,যদুবাবুর ছোটভাই রুদ্রনারায়ণ একটা পাথরের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। খেঁকিয়ে উঠলেন একেবারে,–আঃ! আলো নেবান তো মশাই!
টর্চ নিবিয়ে দিলুম। কর্নেল বললেন,আসুন! বাড়ি যাবেন না?
না।
আহা! খামোকা বাড়ির লোকের ওপর রাগ করে আর কী হবে রুদ্রবাবু? তাছাড়া এখানে অন্ধকারে বসে থাকাও তো বিপজ্জনক। একটু আগে আপনি কি চুরাইলের ডাক শোনেননি?
রুদ্রবাবু আরও খেঁকিয়ে উঠলেন,–যান মশাই! আপনাদের আর ভালোমানুষি করতে হবে না! আমাকে চুরাইল দেখাচ্ছেন! নিজেদের মাথা বাঁচান আগে–তারপর কথা বলতে আসবেন!
কর্নেল আর কথা বাড়ালেন না। বললেন,–চলো জয়ন্ত! রুদ্রবাবু ভীষণ চটে আছেন মনে হচ্ছে ।
ওঁদের বাগানের কাছাকাছি যেতেই লণ্ঠন হাতে দশরথকে দেখা গেল। আমাদের দেখে সে আশ্বস্ত হল। তার হাতে একটা বল্লমও দেখতে পাচ্ছিলুম। বলল,–বড়বাবু আপনাদের লিয়ে বহত শোচ করছেন স্যার। পিঙ্কিদিদি বলল কী, কর্নিল স্যারদের খনির অন্দরে ঘুসতে দেখেছে। ঔর আপনারা এত্তা দেরি করলেন!
বুঝলুম, দশরথের ইচ্ছে ছিল না আমাদের খুঁজতে যাওয়ার। কর্তাবাবুর চাপে পড়ে তাকে বেরুতে হয়েছে। সে যে ভীষণ ভীতু মানুষ, তাতে সন্দেহ নেই।
যদুবাবু অপেক্ষা করছিলেন ব্যস্তভাবে। বললেন,–খুব ভাবছিলুম কর্নেল! এদিকে এক কাণ্ড হয়েছে শুনুন। মায়ের আলমারি থেকে একটা পুরনো দলিল চুরি গেছে। আপনি আমার বাবার খনির দলিল দেখতে চেয়েছিলেন। ওই দলিলটাও তার মধ্যে ছিল। মা বলছেন, এ নিশ্চয় রুদ্রের কাজ। রুদ্রের সঙ্গে এ-নিয়ে আমারও একচোট হয়ে গেল। বাবু রাগ করে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেল বললেন,–রুদ্রবাবুকে মাঠে বসে থাকতে দেখে এলুম।
যদুবাবু বাঁকা মুখে বললেন,–চুরাইলের পাল্লায় পড়লেই বাছাধন টের পাবে! তারপর দশরথকে চায়ের হুকুম দিয়ে কর্নেলের মুখোমুখি বসলেন।
কর্নেল বললেন,–ও দলিল রুদ্রবাবু কী করবেন?
যদুবাবু চাপা গলায় বললেন, আপনাকে বলেছিলুম, ওই দলিলটা আনরেজিস্টার্ড। নন্দলাল ওঝা নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন বাবার খনিব্যবসার পার্টনার। নন্দবাবু নিজের একার নামে একটা পোড়োখনি কিনেছিলেন আরেকজনের কাছে। কেন কিনেছিলেন জানি না। পরে যখন সব খনি অ্যাবান্ডান্ড হয়ে গেল, বাবার মাথায় কেন কে জানে ঝোঁক চাপল, নন্দবাবুর কেনা, সেই প্রাচীন অ্যাবান্ডান্ড খনিটা কিনতে চাইলেন। নন্দবাবু কিছুতেই বেচতে রাজি নন। বাবাও ছাড়বেন না। অবশেষে পঞ্চাশ হাজার টাকা দাম হাঁকলেন নন্দবাবু। বাবা তাই দিলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে আজও রহস্য। যাই হোক, পরদিন রেজেস্ট্রি হওয়ার কথা। রাতে হঠাৎ নন্দবাবু ভেদবমি হয়ে মারা গেলেন। দলিল আর রেজেস্ট্রি করা হল না। কিন্তু এ দলিল চুরি যে রুদ্রই করেছে, তাতে ভুল নেই। সে বরাবর মায়ের ওই দলিলটা চাইত। বলত, তার দরকার আছে। কী দরকার সেই জানে। আমার সঙ্গে তো ভালো করে কথাবার্তাই বলে না।
নন্দবাবুর ছেলেপুলে আছে কি?
নন্দবাবু ছিলেন উড়নচণ্ডী স্বভাবের লোক। বেশি বয়সে বিয়ে করেছিলেন। ওঁর মৃত্যুর পর সেই ভদ্রমহিলা কলকাতায় দাদার কাছে চলে যান। যতদূর জানি, তার কোনো ছেলেপুলে নেই।
নন্দবাবুর আর কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না ভৈরবগড়ে?
এক পিসতুতো না মাসতুতো দাদা ছিলেন। তিনি তো বছর আষ্টেক আগে নিরুদ্দেশ।
কী নাম ছিল ভদ্রলোকের?
যদুবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন,–পান্নাবাবু।
কর্নেল বললেন,–সেই পোড়োখনিটা কোথায় আপনি কি জানেন?
যদুবাবু মাথা দোলালেন,–না। বাবার এক উদ্ভট খেয়াল ছাড়া আর কী বলব? নিজেদের সব খনি অ্যাবন্ডা হয়ে গেল। আবার একটা অ্যাবান্ডা খনি কিনে বসলেন পঞ্চাশ হাজার টাকায়। কী । অদ্ভুত ব্যাপার,?
খনিটা কোথায়, দলিলটা দেখতে পেলে জানা যেত। কর্নেল চিন্তিতভাবে বললেন। সমস্যা হল যে দলিলটা আনরেজিস্টার্ড। কাজেই রেজেস্ট্রি অফিসে তার কপি মিলবে না।
এতক্ষণে বললুম,–পোড়োখনির ভেতর কোনো দামি জিনিস–ধরুন গুপ্তধন লুকোনো ছিল না তো?
যদুবাবু নড়ে বসলেন। ঠিক, ঠিক। কী আশ্চর্য! এ-কথাটা তো আমার মাথায় আসেনি! আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন জয়ন্তবাবু! ইশ, কেন যে দলিল থেকে ওই পোড়োখনির সীমানা-চৌহদ্দি টুকে রাখিনি!
দশরথ চা এনে দিল। তারপর গাল চুলকে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বলল,–করাড়ি রোটি মিলা হ্যায় স্যার?
কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে সত্যি সত্যি একটুকরো করাড়ি রোটি বের করে ওকে দিলেন। দশরথ সেটা ভক্তিভরে দুহাতে নিয়ে মাথায় ঠেকাল। তারপর খুশি হয়ে বেরিয়ে গেল । যদুবাবু বললেন, এখানকার লোকের এই এক অদ্ভুত বিশ্বাস! ওই কুৎসিত পদার্থটা খেলে নাকি বুড়োরাও যুবকের শক্তি ফিরে পায়। তবে দশরথ করাড়ি রোটি খেলে কী হবে? গাঁজা খায় যে! গাঁজা ওটার সব গুণ নষ্ট করে দেবে।
