ডঃ গড়গড়ি বললেন—সেটা খুবই সম্ভব। তবে আমাদের হাতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা চাই। সেই প্রমাণ সংগ্রহ করতেই আমি এত আগ্রহী। নইলে যে বীভৎস ঘটনা চোখের সামনে দেখেছি তারপর কস্মিনকালে এই ভূতুড়ে দ্বীপে কি আর পা বাড়াতে চাইতুম জয়ন্তবাবু? যাক গে, আসুন না। আমরা কাছাকাছি আরও কিছুটা খোঁজাখুঁজি করে দেখি—যদি দৈবাৎ কোনও শিলালিপি কিংবা কোনও মূর্তি বা পুতুল কুড়িয়ে পাই।
এ আমার আগ্রহ বেড়ে গেছে। তাই পাথরের চাতাল থেকে নেমে গেলুম ওঁর সঙ্গে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে চাপা গলায় ডঃ গড়গড়ি বলেন—চারদিকে নজর রাখবেন মশাই। রাইফেলে গুলি পোরা আছে তো?
বললুম—আছে। আপনার উদ্বেগের কারণ নেই ডঃ গড়গড়ি!
—হুঁ। রাইফেল সব সময় তাক করে রাখবেন। বলে উনি ঝোপের ধারে একটা পাথরের ওপর যেই পা রাখলেন, অমনি পা পিছলে গড়াতে গড়াতে নিচের দিকে চললেন। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে একটা বলের মতো গড়িয়ে নামছেন। দেখে আমি আর হাসি থামাতে পারলুম না।
কিন্তু সর্বনাশ; কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মধ্যেই গড়গড়ি পাহাড়ের ঢালু বেয়ে ঝোপের আড়ালে কোথায় যেন তলিয়ে গেলেন।
আমিও লাফ দিয়ে সেই পাথরে পড়লুম। তারপর চেঁচিয়ে উঠলুম ডঃ গড়গড়ি! ডঃ গড়গড়ি!
মনে হল, অনেক নিচে থেকে যেন ক্ষীণ স্বরে সাড়া এল। কিংবা আমার কানের ভুল হতেও পারে। ভাবলুম, নিশ্চয় উনি এভাবে পড়ে গিয়ে ভাল রকমের জখম হয়েছেন। অজ্ঞান হয়েই গেছেন হয়তো। তাই যত দ্রুত পারা যায়, নামতে শুরু করলুম।
এবার বোঝা গেল, পাথরগুলো খুব পিছল এবং ওপাশে সেই ঝরনা থাকায় ফার্ন জাতীয় গাছগাছড়া আর শ্যাওলা গজিয়ে আছে। তার ফাঁকে ফাঁকে যত রাজ্যের গাছপালা ও ঝোপঝাড় মাথা তুলেছে। তাই নিচের দিকে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
নামতে নামতে ফের চেঁচিয়ে ডাকলুম—ডঃ গড়গড়িকে দেখতে পেলুম না। যেখানে পৌঁছেছি, সেখানে মোটামুটি সমতল জায়গা এবং সেই নারকেল বনটা শুরু হয়েছে। তার ফাঁক দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। আবছা তার গর্জন কানে আসছে। প্রচণ্ড জোরে হাওয়া বইছে তার ফলে নারকেল পড়ছে। ক্রমাগত বোম্ পটকার মতো আওয়াজ হচ্ছে। এখানে দাঁড়ানোও নিরাপদ নয় আমার পক্ষে। কখন মাথার ওপর নারকেল পড়ে কুপোকাত হয়ে যাব ঠিক নেই।
আমি ফের ওপরে উঠে দুপাশে চোখ বুলিয়ে ডঃ গড়গড়িকে খুঁজতে থাকলুম। কিন্তু আশ্চর্য, ভদ্রলোক যেন বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
আমার বুক কেঁপে উঠল এতক্ষণে। মনে হলো, দ্বীপের গাছপালা ঝোপজঙ্গল পাথরের আড়াল থেকে কে বা কারা যেন চুপি চুপি আমাকে দেখছে। কাপা-কাঁপা হাতে রাইফেলটা শক্ত করে বাগিয়ে আবার চেঁচিয়ে ডাকলুম—উঃ গড়গড়ি!
আমার ডাক পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে মিলিয়ে গেল। কোনও সাড়া এল না। তখন ক্যাম্পের দিকে উঠতে শুরু করলুম।
উঠে এসে পাথরের চওড়া চাতালে দাঁড়িয়ে হাঁফ সামলাচ্ছি, হঠাৎ চোখে পড়ল এক বিদঘুটে দৃশ্য।
প্রথমে ভাবলুম খরগোশের পাল। তারপর মনে হল, বেড়াল। কিন্তু বেড়ালের মুখ এমন লম্বাটে হবে কেন? হঠাৎ মনে পড়ে গেল, এই দ্বীপে প্রকাণ্ড ইঁদুরের কথা শুনেছি। এরা সেই রাক্ষুসে ইঁদুরই বটে।
ইঁদুরগুলো ঠিক মানুষের ভঙ্গিতে তাঁবুর ভেতর থেকে টিনের কৌটো পিঠে নিয়ে বেরিয়ে আসছে এবং একটা ফাটল দিয়ে অদৃশ্য হচ্ছে। দুধের কৌটো, জেলির কৌটো, রান্না করা মাংসের কৌটো আর পাউরুটির পকেট—সব একত্রে লুঠ হয়ে যাচ্ছে।
দৌড়ে গিয়ে তাদের মধ্যে পড়তেই বেয়াদপ ইঁদুরগুলো চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরে হাঁটু অবধি লাফ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করতে থাকল আর কামড় দিল।
ভাগ্যিস পায়ে হান্টিং বুট ছিল। হাঁটু অবধি শক্ত চামড়ার বর্ম এবং প্যান্টের কাপড়টাও বেশ শক্ত। দাঁত বসল না। কিন্তু ওদের বেয়াদপিতে মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমি লাথি ছুড়তে থাকলুম। লাফালাফি করে বেজায় চেঁচামেচিও শুরু করলুম। কিন্তু তাতে ওরা আরও খাপ্পা হয়ে আমার পা আঁকড়ে গায়ে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল।
এমন পাজি হতচ্ছাড়া ইঁদুর তো দেখা যায় না ভূ-ভারতে। এরা আমাকে নাকাল করে ছাড়বে দেখছি। বড় জন্তু হলে রাইফেল ছোড়া যায়। অগত্যা পাথরে গড়াগড়ি দিয়ে ওদের কাবু করার জেষ্টা করলুম। রাইফেল পড়ে রইল। চোখ বুজে রইলুম। পাছে ওরা চোখের ভেতর নখ বসিয়ে দেয়।
তারপর কী ঘটল কে জানে, চোখ বুজে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ টের পেলুম ইঁদুরগুলো চলে যাচ্ছে। আপনি চোখ খুলে তাকালুম। সামনে ফাটলের মুখে সম্ভবত ইদুরটি কাঁধে একটা প্যাকেট নিয়ে লাফ দেওয়ার তাক করছে—কিন্তু প্যাকেটটা ফাটলের তুলনায় বড় বলে আটকে যাচ্ছে।
ইচ্ছে হল, বলি—ওরে নির্বোধ! ওরে হতচ্ছাড়া গবেট! ওটা খাবার নয়, ওটা চুরুটের প্যাকেট। ওই চুরুটের মালিক কে জানিস? প্রখ্যাত বুড়ো ঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার! অতএব, যদি প্রাণে বাঁচতে চাস, ওটা রেখে যা। ওরে মূখ! তুই কোথায় ওটা লুকিয়ে রাখবি? লুকিয়েও পার পাবি? বুড়ো গোয়েন্দপ্রবর পাতাল হাতড়ে ঠিকই উদ্ধার করে তোকে হাতকড়া পরিয়ে ছাড়বেন! সাবধান! সাবধান!
ইঁদুরটা কি আমার মনের কথা টের পেল? চুরুটের বাক্সটা রেখে ফাটল গলিয়ে চলে গেল। আমি উপুড় হয়ে আছি। এবার উঠে বসার জন্য যেই ঘুরেছি কোমরে একটা ভারী জিনিস পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, একটা বেঁটে খাদানেকো মোটাসোটা লোক আমার কোমরে একটা ঠ্যাং চাপিয়ে আমার রাইফেলটা তুলে নিল।
