আঁতকে উঠে বললুম,–সে কী! আপনি ওর ভেতর ঢুকে কী করবেন?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন,–করাড়ি রোটি খেলে মানুষ পালোয়ান হয়ে যায়, ডার্লিং!
কিন্তু ভেতরে যদি ভালুকটা থাকে?
তার সঙ্গে ভাব জমাবার মন্ত্র আমার জানা আছে। এই বলে কর্নেল কুয়োর মতো গর্তটাতে নেমে গেলেন। তারপর টর্চ বাগিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকলেন।
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছে, এক্ষুনি হয়তো দেখব কর্নেল ভালুকের আঁচড় খেয়ে রক্তারক্তি হয়ে এবং কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন। না, ভালুকের হাতে ওঁর মারা পড়ার কথা ভাবছি না। কারণ ওঁর কাছে রিভলবার আছে। কিন্তু ভালুকমশাই রুটিচোরকে একটু শিক্ষা না দিয়ে কি ছাড়বে?
তারপর আর কর্নেলের ফেরার নাম নেই। বেলা পড়ে এল। টিলাগুলোর ওধারে সূর্য অস্ত গেল। কুয়াশা ঘনিয়ে এল চারদিকে। ক্রমে আঁধার জমল। কর্নেল ফিরছেন না। অস্বস্তিতে বুক কাঁপছে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে পিঙ্কিকে খুঁজলুম। কোথাও দেখলুম না। নিশ্চয় মেয়েটা এতক্ষণ তার কুকুরটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। দুরুদুরু বুকে ভাবছি কী করব। আমার সঙ্গেও টর্চ, রিভলবার আছে। ঢুকব নাকি ভেতরে? কিন্তু ঠিক তখনই বাঁদিকে খুব কাছেই এক বিকট চিৎকার শুনতে পেলুম।
ঘুরে কিছু দেখতে পেলুম না। অন্ধকারে কেউ ওই বিদঘুঁটে আর্তনাদ করে চলেছে। কাঁপাকাঁপা একটানা চেরা গলার চিৎকার–বিপদজ্ঞাপক সাইরনের মতো। অমনি শরীর হিম হয়ে গেল। এ তো চুরাইলেরই চিৎকার! কর্নেল ঠিক এমনি একটা বর্ণনা দিয়েছিলেন।
আড়ষ্ট হাতে টর্চের বোতাম টিপলুম। একঝলক আলো ছড়িয়ে গেল। তারপর দেখতে পেলুম পোতখনির পেত্নিটাকে। কালো কুচকুচে গড়ন। মানুষের মতো কিংবা আদতে মানুষের মতো নয়ই, আমার চোখের ভুল হতেও পারে। কী হিংস্র তার মুখ আর নিষ্পলক নীলচে দুটো চোখ! তার পায়ের পাতা সত্যি উলটো ঘোরানো কিনা দেখার চেষ্টা করতেই সে আবার চেঁচিয়ে উঠল –আঁ আঁ আঁ আঁ … ইঁ ইঁ ইঁ ইঁক! এমন অমানুষিক চিৎকার কোনো প্রাণীর নয়, তা আমি হলফ করে বলতে পারি।
টর্চের আলোয় তাকে এগিয়ে আসতে দেখার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে রিভলবার বের করলুম। তার দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দিলুম। রিভলবারটা অটোমেটিক। কিন্তু আশ্চর্য গুলি বেরুল না। ঘাবড়ে গিয়ে আবার ট্রিগারে চাপ দিলুম। এবারও গুলি বেরুল না। অমনি মনে পড়ল, অটোমেটিক বলে রিভলবারে গুলি ভরে রাখিনি। কারণ দৈবাৎ গুলি ছুটে যাবার ভয় থাকে।
ততক্ষণে চুরাইলটা কাছাকাছি এসে পড়েছে। পকেট থেকে গুলি বের করতে গিয়ে তাড়াতাড়িতে টর্চটা হাত থেকে পড়ে গেল এবং নিবে গেল। এবার মনে হল অন্ধকারে ডুবে গেছি। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে গুলিগুলো ভরে ট্রিগারে চাপ দিলুম। এবার রিভলবারটা গর্জে উঠল। পর পর দুটো গুলি ছোড়ার পর চুরাইলের চিৎকার থেমে গেল। মারা পড়েছে ভেবে সাহসী হয়ে পা বাড়াচ্ছি, কেউ শিস দিল কোথাও। সেই সময় আমার পিছনে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুম,–জয়ন্ত! জয়ন্ত!
চেঁচিয়ে বললুম,–টর্চ জ্বালুন শিগগির। পেত্নিটাকে আমি গুলি করে মেরেছি।
কর্নেলের হাসি শোনা গেল। পেত্নিকে কখনও গুলি করে মারা যায় না ডার্লিং!
আঃ! টর্চ জ্বালুন না কেন?
তোমার টর্চ কী হল?
কোথায় পড়ে গেছে।
আমার টর্চটা কেউ খনিগুহার ভেতর কেড়ে নিয়েছে।
কর্নেল কাছে এসে দাঁড়ালেন। বললুম,–সে কী! কেড়ে নিয়েছে মানে?
কর্নেল চুরুট ধরালেন লাইটার জ্বেলে। তারপর বললেন,–খনিটা ছিল ডলোমাইটের। ভেতরটা বেশ চওড়া। এপাশে-ওপাশেও অনেক খোঁদল আছে। করাড়ি রোটি খুঁজছি, হঠাৎ কে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দিল। টর্চটা ছিটকে পড়ে নিবে গেল। উঠে আর খুঁজেই পেলুম না। লাইটারের আলোয় কোনোরকমে বেরিয়ে এলুম। এসে দেখি, চুরাইলের সঙ্গে তোমার যুদ্ধ চলছে।
আমিও সিগারেট ধরালাম। তারপর লাইটারের আলোয় কয়েক পা এগিয়ে টর্চটা খুঁজে পেলুম। টর্চের আলোয় নিরাশ হয়ে দেখলুম কোথাও গুলিবিদ্ধ চুরাইল পড়ে নেই। একফোঁটা রক্তও নেই। ভূতপেত্নিদের হয়তো রক্ত থাকার কথা নয়। গুলি তাদের গায়ে লাগার কথা নয়। তবে আওয়াজে তারা ভয় পেতেও পারে। বললুম,–ব্যাপারাটা কী হতে পারে বলুন তো কর্নেল?
কোন্ ব্যাপারটা?
চুরাইল?
কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন,–নিছক পেত্নি ছাড়া কিছু নয়, সে তো বুঝতেই পারছ।
কিন্তু আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে, ভূতপেত্নি বলে সত্যি কিছু থাকতে পারে।
স্বচক্ষে দেখেও? কর্নেল হঠাৎ গলাটা নামিয়ে বললেন,–যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের এ-তল্লাটে ঘোরাঘুরি করাতে চুরাইলের ভীষণ আপত্তি আছে। তাই সে ভয় দেখাতে এসেছিল।
চারদিকে ভয়ে-ভয়ে আলো ফেলে আমরা হাঁটছিলুম। হাতে রিভলবারও তৈরি। কর্নেলের কথার জবাবে কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
কর্নেল টর্চের আলোয় একটুকরো লাল রঙের ছেঁড়া কাপড় দেখিয়ে বললেন, আমাকে ধাক্কা মারতেই আমিও তাকে ধরার চেষ্টা করেছিলুম। তার পরনের কাপড়ের এই টুকরোটা আমার হাতে থেকে গেছে। তুমি বলেছিলে, সাধুবাবার পরনে লাল কাপড় দেখেছ। কাজেই সে সেই সাধু ছাড়া আর কে হতে পারে? সম্ভবত অন্য কোনো সুড়ঙ্গ দিয়ে ওখানে যাওয়া যায়। সে আমাকে ফলো করেছিল অন্যদিক থেকে।
