চুরাইলের পায়ের পাতা নাকি উলটো দিকে থাকে?
হুঁ। ঠিক তাই। টর্চের আলো ছিল খুব জোরালো। পা-দুটোও দেখে নিয়েছি না?
যে দুজন লোক চুরাইলের হাতে মার পড়েছে, তারা কে?
যদুবাবু হতাশভাবে একটু হাসলেন। তাদের বাড়িতে তো নিয়ে গিয়েছিলুম কর্নেলকে। একজনের নাম মাধব পাণ্ডে। বাজারের সেরা ব্যবসাদার ছিলেন পাণ্ডেজি। মহাজনি কারবারও ছিল। সুদে টাকা ধার দিতেন অভাবী লোককে। দ্বিতীয়জন হলেন রামনাথ মিশ্র। লোকে বলত মিছিরজি। উনি ছিলেন বড় ভালোমানুষ। পাণ্ডেজিরই কর্মচারী উনি।
ওঁরা খুন হয়েছেন কীভাবে?
বোঝা যাচ্ছে না, কেন পাণ্ডেজি অত রাতে বেরিয়েছিলেন। ঘরের দরজা খোলা ছিল। ভোরবেলা স্টেশনের কাছে মুণ্ডুকাটা লাশ পাওয়া যায়। তবে রাতে বাড়ির লোকে তো বটেই, পাশের বাড়ির লোকেরাও চুরাইলের ডাক শুনেছিল। মিছিরজি খুন হন তার পরের রাতে। মিছিরজিও স্টেশনের কাছে একটা বস্তিতে থাকতেন। তাঁরও ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো ছিল পেছনের জঙ্গলে তার মুণ্ডুকাটা লাশ পাওয়া গেছে। তাছাড়া সে-রাতেও ওই বস্তির লোকেরা চুরাইলের ডাক শুনেছিল।
কর্নেল কী বলছেন?
কিছু বলেননি এখনও। ঘটনা সম্পর্কে খোঁজখবর নিলেন। লাশ পড়ে থাকা জায়গাটাও দেখলেন। তারপর বললেন,–চলুন ফেরা যাক।
বুঝলুম যদুবাবু খুব হতাশ হয়ে গেছেন কর্নেলের হাবভাব দেখে।
.
তিন
লাল ঘুঘুর পেছনে সারা দুপুর ঘোরাঘুরি করে কর্নেল ফিরে এলেন বেলা গড়িয়ে। আমার খাওয়াদাওয়া সারা। অবেলায় কর্নেল খেতে বসলেন। বললুম, এরকম অনিয়ম করলে কিন্তু বেঘোরে মারা পড়বেন। আপনি কি ভাবছেন এখনও বুড়ো হননি?
কর্নেল সহাস্যে বললেন,–বৎস, সাদা দাড়ি মোটেও বার্ধক্যের লক্ষণ নয়। তোমার মতো অনেক যুবকেরও চুলদাড়ি সাদা হয়ে যেতে দেখেছি। ভেবো না; জীবনে দু-একটা দিন দেরি করে খেলে স্বাস্থ্যমশাই তত বেশি চটেন না। যাই হোক, তুমি তৈরি হয়ে নাও। বেরুব।
যদুবাবুর অনিদ্রার রোগ আছে। রাতে ঘুম হয় না বলে দিনে ঘুমোবার চেষ্টা করেন। দশরথ খাবার এনেছিল। যদুবাবুর মা করুণাময়ী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার তদারক করে চলে গেছেন। খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–আচ্ছা দশরথ, তোমাদের ছোটবাবু কোথায় গেলেন? আজ ছুটির দিনে তো তার বাড়ি থাকার কথা!
দশরথ বলল,– ছোটবাবুর খোবর ছোটবাবুরই মালুম আছে স্যার! উহি ওই রোকম আছেন।
কী রকম?
দশরথ এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপা গলায় বলল,–রাতমে বড়বাবুর সঙ্গে বহুত কাজিয়া কোরেছিলেন। সুবেমে চাও-উও পিয়ে চলে গেলেন তো আভিতক আসলেন না। মাইজির সঙ্গেভি কাজিয়া কোরেন ছোটবাবু!
কেন বল তো?
দশরথ হাসল। রুপেয়াকে লিয়ে। হরঘড়ি রুপেয়া চাইলে কেত্তো রুপেয় দেবেন বড়বাবু? মাইজিই বা কোথা রুপেয় পাবেন বলুন স্যার?
রুদ্রবাবু তো চাকরি করেন। মাইনের টাকাতেও কুলোয় না নাকি?
দশরথ মুখ বেজার করে বলল,–ছোড়িয়ে দিন স্যার! ছোটবাবু জুয়াড়ি হোয়ে গেছেন।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন,–তাই বল! জুয়া খেললে মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি আর থাকে না। কই, এসো জয়ন্ত। আমরা বেরোই।
যদুবাবুর ভাই রুদ্রবাবুর সঙ্গে সকালে আমাদের সৌজন্যমূলক পরিচয় হয়নি। তবে ওঁকে দেখেছিলুম। রোগা গড়নের যুবক। রাগী চেহারা। গায়ে লাল রঙের গেঞ্জি, পরনে ছিল নেভি-ব্লু প্যান্ট। হাতে স্টিলের বালা। গলায় সরু চেনও দেখেছিলুম।
পোড়োখনি এলাকার দিকে পা বাড়িয়ে কর্নেল বললেন,–যদি রাত্রি পর্যন্ত এদিকে কাটাই, আমার বিশ্বাস চুরাইলের দর্শন পাব। কিন্তু তুমি ভয় পাবে না তো জয়ন্ত?
অবাক হয়ে বললুম,–আপনি কি চুরাইল দেখতেই বেরুলেন? কর্নেল আস্তে বললেন,–বলা যায় না, যদি দৈবাৎ তার দেখা পেয়ে যাই গতবারের মতো।
মার্চ মাসের এমন সুন্দর বিকেলে চুরাইলের ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। সত্যি বলতে কী, ভূতপ্রেতে আমার কস্মিনকালে বিশ্বাস নেই, যদিও ভূতের ভয় আমার আছে। কিন্তু কর্নেল গতবছর স্বচক্ষে পাোড়োখনির পেত্নিটাকে দেখেছেন বলছিলেন। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যায় না।
কর্নেল মাঝেমাঝে বাইনোকুলার তুলে এদিকে-ওদিকে কী দেখছেন। এখনও দিনের আলো আছে। কাজেই নিশ্চয় লালঘুঘুর ঝক দেখছেন। একখানে হঠাৎ থেমে বললেন,–জয়ন্ত, করাড়ি রোটি কোন গুহায় ছিল চিনতে পারবে কী?
বললুম,–মনে হচ্ছে, বাঁদিকে যেতে হবে। ওই যে ঝোঁপগুলো দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত তার কাছাকাছি।
কয়েক পা এগিয়ে যেতেই দেখলুম, পিঙ্কি হাতে একটা প্রকাণ্ড রঙিন বল নিয়ে একটা ঢিবির ওপর উঠে দাঁড়াল। তারপর বলটা ছুঁড়ে দিল। তখন ওর কুকুরটাকেও দেখতে পেলুম। অবাক হয়ে গেলুম ওর সাহস দেখে। কুকি বলটাকে কামড়ে ধরে ওর কাছে বয়ে আনার চেষ্টা করছে। বলটা বারবার মুখ থেকে পড়ে যাচ্ছে। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন,–মেয়েটি সত্যি খুব সাহসী।
ডাকলুম, পিঙ্কি! পিঙ্কি!
পিঙ্কি একবার ঘুরে দেখল। তারপর একহাতে বল, অন্যহাতে কুকুরটাকে তুলে নিয়ে দৌড়তে শুরু করল। একটু পরে দুজনেই কোথাও উধাও হয়ে গেল। বললুম,–মেয়েটির জন্য আমার ভাবনা হচ্ছে, কর্নেল! কখন না কোন্ বিপদে পড়ে!
কর্নেল সেকথায় কান না দিয়ে বললেন,–করাড়ি রোটির গুহাটা খুঁজে বের করো, জয়ন্ত!
খুঁজে পেতে দেরি হল না। কর্নেল পকেট থেকে টর্চ বের করে বললেন,–তুমি এখানে বসে অপেক্ষা করো জয়ন্ত। আমি ভেতরটা দেখে আসি।
