জিজ্ঞেস করলুম,–করাড়ি রোটি কী দশরথ?
দশরথ বলল,–ইয়ে সব গুহার অন্দরে ভালুকের ডেরা আছে। ভালুক মৌচাক ভেঙে মধু খায়। ঔর জঙ্গলের ফলভি খায়। খেয়ে সেইসব চিজ উগরে দেয়। যখন শুখা হয়, তখন তা রোটি হয়ে যায়। আদমিলোগভি ওহি রোটি পছন্দ করে। হামিভি একদফা খায়া স্যার! বহুত মিঠা।
তা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু ভেতরে ভালুক থাকলে যে বিপদ!
দশরথ হাসল। ভালুক অন্দরে আছে কিনা কুত্তার মালুম আছে, স্যার! ভালুক থাকলে কুত্তা অন্দরে ঘুসবে না।
ঠিক এইসময় খোঁদল থেকে একলাফে কুকি বেরিয়ে এল। মুখে একটুকরো কালচে রঙের পাঁউরুটির মতো জিনিস। দশরথ লাফিয়ে উঠল,–দেখিয়ে, দেখিয়ে! হাম ঠিক বোলা কি না!
পিঙ্কি কুকিকে কোলে তুলে নিয়ে আলতো দুটো চাটি মারল। তারপর তার মুখ থেকে করাড়ি রোটির টুকরোটা কেড়ে ছুঁড়ে ফেলল। দশরথ সেই টুকরোটা তুলে নিয়ে বলল,–ফেকো মাত্ দিদি। ইয়ে রোটি যে খাবে, সে তাকওয়ালা পালোয়ান হয়ে যাবে।
দশরথ আমাকে অবাক করে কুকুরের এঁটো সেই বিচিত্র বস্তুটি মাথায় ঠেকাল প্রসাদের মতো। তারপর ঝেড়েমুছে পকেটে ঢোকাল। তার মুখে খুশি উপচে উঠছিল।
হাঁটতে-হাঁটতে দশরথকে বললুম,–আচ্ছা দশরথ, ওখানে একজন সাধুবাবাকে দেখলুম। কিন্তু যেই আমি ওঁকে ডেকেছি, উনি লুকিয়ে পড়লেন কোথায়। ব্যাপারটা কী?
দশরথ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আমার মুখের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,–সা?
হ্যাঁ। একজন সাধুবাবাকে সত্যি দেখেছি, দশরথ।
দশরথের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। বলল,আপনি বহত্ পুণ্যবান স্যার, তাই দেখা পেলেন। ওখানে একজন সাধুবাবা থাকেন। লেকিন কেউ তার দেখা পায় না। যারা পায়, তারা বহুত পুর্ণবান আদমি।
তুমি কখনও দেখা পাওনি?
না স্যার! শুনা কি, সাধুবাবার ওমর দোশো বরষ আছে।
বলো কী? দুশো বছর বয়স!
জি হাঁ। ভৈরবগড়ে যাকে পুছ করবেন, সে বলবে।
তাহলে দশরথ, সেই চুরাইলটা কি সাধুবাবার পোষ্য পেত্নি?
আমি হাসতে হাসতে বললুম কথাটা। দশরথ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠে দু-কানে আঙুল ঢুকিয়ে বলল, রাম রাম! এই মুলুকে যতক্ষণ আছেন ততক্ষণ উও নাম মুখে লিবেন না স্যার!
বলে সে চলার গতি বাড়িয়ে দিল। তার চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠেছিল।
কর্নেল ও যদুবাবু বাগানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। দশরথ কুকির কীর্তি বর্ণনা করল এবং ফতুয়ার পকেট থেকে ভালুকের বানানো রুটির টুকরোটাও দেখাল। যদুবাবু পিঙ্কিকে একটু বকাবকি করলেন। তারপ বললেন,–ওকে নিয়ে এই সমস্যা। যতক্ষণ স্কুলে থাকে, চিন্তা করি না। কিন্তু বাড়িতে থাকলেই কুকুর নিয়ে পোড়োখনির ওদিকে চলে যাবে। অথচ ইদানীং ভুলেও ভৈরবগড়ের লোকেরা ওদিকে পা বাড়ায় না।
কর্নেল দশরথের কাছ থেকে করাড়ি রোটির টুকরো নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। ফেরত দিয়ে বললেন,–করাড়ি রোটির কথা দক্ষিণ ভারতের জঙ্গল এলাকায় গিয়ে শুনেছিলুম। এবার স্বচক্ষে দেখলুম।
যদুবাবু বললেন,–করাড়ি কেন বলে কে জানে!
কর্নেল বললেন,–তামিল ভাষায় ভালুককে বলে করাড়ি!
দশরথ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে উসখুস করছিল। চাপা গলায় যদুবাবুর উদ্দেশে বলল, বড়বাবু, এই কলকাতার স্যারকে খনির সাধুবাবা দর্শন দিয়েছেন।
যদুবাবু চমকে উঠে বললেন,–তাই নাকি জয়ন্তবাবু?
বললুম,–হ্যাঁ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য লাল কাপড় পরা জটাধারী এক সাধুবাবাকে দেখেছি।
যদুবাবু কর্নেলকে বললেন, আপনি কথাটা আমল দিচ্ছিলেন না কর্নেল। তাহলে দেখুন, যা রটে তা সত্যি বটে।
কর্নেল একটু হাসলেন। আমল দিইনি, তা নয়। বলছিলুম,–বিশ্বাস করা যায় এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী কাউকে পেলে ভালো হয়। যাই হোক, জয়ন্ত যখন দেখেছে, তখন গুজবটা সত্য প্রমাণিত হল।
কর্নেলের বুকে বাইনোকুলার ঝুলছিল। কথাটা বলার পর বাইনোকুলারটা চোখে রেখে পোড়োখনি এলাকার দিকে কী যেন দেখতে থাকলেন। যদুবাবু খুব আগ্রহে চাপা গলায় বলে, উঠলেন,–কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি কর্নেল?
কর্নেল বললেন,–লাল ঘুঘু।
লাল ঘুঘু মানে? যদুবাবুর গলায় নৈরাশ্য ফুটে উঠল। আমি ভাবলুম বুঝি সাধুবাবাকে দেখতে পেয়েছেন!
কর্নেল বললেন,–এই লাল ঘুঘুপাখির ঝক সচরাচর দেখা যায় না। এরা ঊষর মরু অঞ্চলের বাসিন্দা। শীতের শেষদিকে চলে আসে উর্বর এলাকায়। বর্ষা পর্যন্ত কাটিয়ে আবার ফিরে যায়। বলে কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে এক-পা এক-পা করে হাঁটতে শুরু করলেন। বুঝলুম এবেলার মতো উধাও হতে চলেছেন। যদুবাবু একটু হেসে বললেন,–যার যা হবি! আসুন, জয়ন্তবাবু। আমরা ঘরে বসে গল্পগুজব করি ততক্ষণ।
যে ঘরে উঠেছি, সেই ঘরে গিয়ে বসলুম দুজনে। দশরথ চা আনতে গেল। পিঙ্কি তার কুকুর নিয়ে বাগানে খেলে বেড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছিলুম। যদুবাবু বললেন,–জয়ন্তবাবু, আপনি তো খবরের কাগজের লোক। এমন ঘটনা কখনও ঘটতে দেখে?
কী ঘটনা বলুন তো?
ভূতপ্রেতের হাতে মানুষ খুন! যদুবাবুর কণ্ঠস্বরে আতঙ্ক ফুটে উঠল। পুলিশ বলছে স্রেফ ডাকাতি। কিন্তু বলুন তো মশাই, ডাকাত কি মানুষের মুণ্ডু কেটে রক্ত খায়?
তা খায় না বটে।
যদুবাবু জানালার বাইরেটা দেখিয়ে বললেন,–আজ রবিবার। গত বুধবার রাত একটায় ওইখানে স্পষ্ট দেখেছি চুরাইল দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি পরা কালো চেহারা। হাতে শাঁখা পরা, চোখ দুটো নীল। টর্চের আলোয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও তাকে স্পষ্ট দেখে নিয়েছি। মুখের চেহারা দেখলে রক্ত হিম হয়ে যাবে, মশাই! এই দেখুন না, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!
